বিদায় সৌম্য, প্রিয় ‘ফ্যামিলি মেম্বার’!

বিদায় সৌম্য, প্রিয় ‘ফ্যামিলি মেম্বার’! - the Bengali Times
কানাডার পুলিশের তরফ থেকে তো কোনো কিছুই জানা যায় নি তাঁরা কঠোরভাবে ইনফরমেশনের গোপনীয়তা রক্ষা করছে তদন্তের শর্তে

হেডিংটা আমার দেওয়া নয়। কে দিয়েছে তবে? সেটাই বলছি। তার আগে বলে নিচ্ছি , আপনার অলরেডি শুনেছেন যে, শ্বাশত সৌম্য বলে বাংলাদেশের একজন মেধাবী ইঞ্জিনিয়ারের গত সোমবারে রহস্য জনকভাবে মৃ*ত্যু হয়েছে। তাঁর বডি পাওয়া গেছে কানাডার ব্রিটিশ কলম্বিয়ার একটা লেকের জলে।

প্রথম দিকে ওনার সম্পর্কে তেমন কিছুই জানা যায় নি। কানাডার পুলিশের তরফ থেকে তো কোনো কিছুই জানা যায় নি। তাঁরা কঠোরভাবে ইনফরমেশনের গোপনীয়তা রক্ষা করছে তদন্তের শর্তে।

- Advertisement -

তবে গতকাল সৌম্যকে নিয়ে উক্ত হেডিং দিয়ে একটা বিশাল বড়ো স্মৃতিচারণ মূলক লেখা দিয়েছেন  কিশোর আলোর সাবেক নির্বাহী সম্পাদক সিমু নাসের।

লেখাটা হুবহু  কপি পেস্ট করলাম নিচে;

“সৌম্যর সাথে আমার যখন পরিচয় তখন সে তার নিজের পরিচয় নিয়ে ভালোই ভ্যাজালে আছে। সে ব্র্যাকের নাকি বুয়েটের ফ্যাকাল্টি এইটা সে ক্লিয়ার করতে পারে নাই। মনে হয় সে তখন ট্রানজিশনের ভেতর ছিলো। আবার কয়েকদিন পর এমআইটিতে যাবে পিএইচডি করতে সেইটাও মনে হয় চেপে গেছিল।

ঢাকায় আমার বাসার রাত্রিকালীন আড্ডায় সে এসেছিলো কয়েকবার। প্রতিবারই একদম যথাসময়ে হাজির সে। খুবই শান্ত ও ভদ্র একটা বাচ্চা। নিজের জ্ঞান জাহির করার কোনো তাড়না নাই। ফলে সে সমেত আরও কয়েকজন মিলে দারুণ কিছু আড্ডা দিয়েছিলাম আমরা। এরপর সে আমাকে তার ‘ফ্যামিলি মেম্বার’ করে নিল।

সৌম্যর সাথে আমার যখন পরিচয় তখন সে তার নিজের পরিচয় নিয়ে ভালোই ভ্যাজালে আছে। সে ব্র্যাকের নাকি বুয়েটের ফ্যাকাল্টি এইটা সে ক্লিয়ার করতে পারে নাই। মনে হয় সে তখন ট্রানজিশনের ভেতর ছিলো। আবার কয়েকদিন পর এমআইটিতে যাবে পিএইচডি করতে সেইটাও মনে হয় চেপে গেছিল।

ঢাকায় আমার বাসার রাত্রিকালীন আড্ডায় সে এসেছিলো কয়েকবার। প্রতিবারই একদম যথাসময়ে হাজির সে। খুবই শান্ত ও ভদ্র একটা বাচ্চা। নিজের জ্ঞান জাহির করার কোনো তাড়না নাই। ফলে সে সমেত আরও কয়েকজন মিলে দারুণ কিছু আড্ডা দিয়েছিলাম আমরা। এরপর সে আমাকে তার ‘ফ্যামিলি মেম্বার’ করে নিল।

স্পটিফাইয়ের প্রিমিয়াম সার্ভিসে পেমেন্ট নিয়ে বেশ ঝামেলায় ছিলাম তখন। প্রতিমাসে কী জানি একটা ভেজাল লাগে। সৌম্য তখন স্পটিফাইয়ের ফ্যামিলি মেম্বারশিপ নিয়েছিল। আমার পেমেন্ট ঝামেলা জানতে পেরে আমাকেও সে ‘ফ্যামিলি মেম্বার’ হিসেবে অ্যাড করে নিলো সেখানে। সে ক্রেডিট কার্ড ম্যানেজ করে আমি তাকে মাস শেষে বিকাশ করি। অনেকমাস এভাবে চলার পর তার কার্ডেও কী জানি ঝামেলা হলো। এদিকে একই বাসায় থাকি না বলে আমার মেম্বারশিপেও স্পটিফাই ব্যাপক ঝামেলা শুরু করলো। সেগুনবাগিচার একটা ঠিকনা ব্যবহার করতাম আমরা সবাই মিলে। কিন্তু স্পটিফাই বুঝে ফেললো আমি সেগুনবাগিচা এলাকায় থাকি না। আমি সেই ঝামেলা নিতে না পেরে অ্যাপল মিউজিকে শিফট করলাম। কিন্তু সৌম্যর সাথে যোগাযোগ বন্ধ হলো না।

আমার সাথে এরপর আরও কয়েকবার দেখা হওয়ার কথা ছিলো কিন্তু ব্যাটেবলে মিলছিলো না। একবার আমি কথা দিয়েও দেখা করতে পারলাম না তার ‘বিদায় বাংলাদেশ’ খাওয়াদাওয়াতে। সে পিএইচডি করতে চলে আসবে এমেরিকায়। সে উপলক্ষ্যে পার্টি। কিন্তু আমার তখনই কী একটা কাজে ঢাকার বাইরে যেতে হলো তাই শেষ দেখাও হলো না।

ফেসবুকে তার জীবনচক্র চলছিলো আর দশটা মানুষের মতোই। দেখতাম। বিয়ে নিয়ে বলেছিলাম, অন্তত প্রথম বিয়েটা কর। করলো, ডিভোর্সও হলো, পিএইচডিও তার শেষের পথে। এখন সে কোথায় জয়েন করবে সেটা নিয়েই মনে হয় ভাবছিলো। সর্বশেষ স্ট্যাটাসে দেখেছিলাম, এমেরিকার সিস্টেম নিয়ে সে ব্যাপক ক্ষুব্ধ। সে আর এমেরিকায় ফিরতে চায় না। ক্যানাডার কোনো বিশ্ববিদ্যালয়েই জয়েন করতে চায়। সেটা দেখে আমি দিয়াকে কালকেই বলছিলাম, দেখ ট্রাম্পের কারনে ব্রিলিয়ান্ট ছেলেমেয়েরা এমেরিকা ছাড়ছে, ক্যানাডার উচিত এই সুযোগ নেওয়া।

আজ সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি সৌম্য নাই। ক্যানাডাতে সে এসেছিলো এখানকার একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেশনে কথা বলতে। ভ্যাঙ্কুবারের কোনো এক লেকের পাড়ে তার মৃতদেহ পাওয়া গেছে। এখনও পর্যন্ত ধারণা করা হচ্ছে অসুস্থতাজনিত মৃত্যু। কিন্তু এত ভদ্র, ব্রিলিয়ান্ট বাচ্চারা কেন এত দ্রুত চলে যাবে পৃথিবী ছেড়ে। আমি নিশ্চিত ছিলাম, সৌম্য অচিরেই পৃথিবীতে শোরগোল তোলার মতো কিছু একটা করে ফেলবে। কিন্তু সে তার পরিচিত সবাইকে অবিশ্বাস্য শোরগোলের মধ্যে রেখে নিজেই চলে গেল। এর কোনো মানে হয়—বাষ্পীভূত চোখে দূরে তাকিয়ে থাকা ছাড়া।

বিদায় সৌম্য, প্রিয় ভদ্র বাচ্চা—বিদায় প্রিয় ‘ফ্যামিলি মেম্বার’!”

লেখক- সিমু নাসের

কিশোর আলোর সাবেক নির্বাহী সম্পাদক

শ্বাশত সৌম্যের মতো মেধাবী ছাত্ররা সারা বিশ্বে দেশের গৌরব ছড়িয়ে দেয়। আমরা সকলেই তাঁর আত্মার শান্তি কামনা করছি।

আল্লাহ আপনাদের সুস্থ রাখুন।

 

টরন্টো, কানাডা

- Advertisement -

Related Articles

Latest Articles