
মা, ফেসবুকে দেখলাম, তুমি কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছবির ওপর জুতো পায়ে দাঁড়িয়ে হাসিমুখে একটি পোস্ট দিয়েছ। জানি না, পোস্টে ব্যবহৃত তোমার ছবিটি কৃত্রিম সংযোজন, নাকি আসল।
গুরুজন, আলোকিত মানুষ ও বিশ্ববরেণ্য সম্মানিত ব্যক্তিদের একনজর দেখার জন্য হৃদয়ের আকুতি একটি স্বাভাবিক প্রবৃত্তি। তাঁদের কাছে পাওয়া না গেলে সৃষ্টিশীল কর্মের মধ্য থেকে খুঁজে আনতে হয় স্রষ্টা বা শিল্পীকে। আশা করি, একদিন সেই চেষ্টা তুমিও করবে।
কোনো সম্মানিত ব্যক্তির ছবির ওপর দাঁড়িয়ে খুশিমনে প্রতিবাদ করা হয়তো ইদানীংকালের একটি প্রথা, যা কেউ না কেউ বাংলাদেশে চালু করেছে। তোমার এই প্রতিবাদের পন্থা যদি চলমান থাকে, তবে একদিন তোমাকে যারা অপছন্দ করে না, তারাও তোমার মাতা-পিতা কিংবা তোমার নিজস্ব ছবির ওপর দাঁড়িয়ে পোস্ট দিতে পারে। পারে না? তুমি তখন প্রচণ্ডভাবে মনে আঘাত পাবে। সেটাই স্বাভাবিক। সন্তান কিংবা কাছের মানুষ হয়ে বলবে, তোমরা জানো না, আমার মা-বাবা আমার এবং পরিবারের কাছে কতটা সম্মানিত?
এটাই আমার বক্তব্য। সামান্য ছোট্ট একটি শব্দ—‘জানা’।
তুমি রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে কতটুকু জানো, তা জানি না। ভাষা, শিল্প, সাহিত্য, সমাজ, সংস্কৃতি, শিক্ষা ইত্যাদি ক্ষেত্রে তাঁর যে বিশাল আকাশ, তার কোন কোণে তোমার নজর পড়েছে, সেটা জানা অন্যের পক্ষে ততটুকুই সম্ভব, যতটুকু তুমি প্রকাশ করবে। এই যেমন, জুতো পায়ে রবীন্দ্রনাথের ছবিকে মাড়ানো।
ধারণা করতে পারি, তুমি হয়তো তাঁর অবদানের এক ভাগ, তিন ভাগ কিংবা পাঁচ ভাগ সম্পর্কে জানো। যাঁরা রবীন্দ্রনাথকে মোটামুটি জানতে পেরেছেন, তাঁদের সংখ্যাও হয়তো খুব বেশি নয়। যতটুকু বুঝেছি, তা হলো, একজন রবীন্দ্রনাথকে শতভাগ জানা স্বাভাবিক অর্থে সম্ভব নয়। তিনি এতোটাই অসীম।
একটা ভাত টিপে হাঁড়ির সব ভাত ফুটল কি ফুটল না, সেটাকে ‘জানা’ বলে মনে করি না। আমার কাছে সেটা হলো ‘ধারণা’। রবীন্দ্রনাথের বৌদ্ধিক ও সৃজনশীল বিশালতাও এবং সামগ্রিক সৃষ্টিকর্ম যদি চোখ দিয়ে স্পর্শ করে মনের গভীরে কিংবা স্মৃতিতে ধরে রাখার প্রয়াস নাও, তবে তোমার বাকি জীবন হয়তো শেষ হয়ে যাবে। এতই বিশাল তাঁর চিন্তা, চেতনা ও সৃষ্টির পরিসর।
কাজেই তোমার বয়স আন্দাজ করে বুঝতে পারছি, কলিমুল্লাহ-ছলিমুল্লাহ প্রদত্ত জ্ঞান তোমার কাছে পৌঁছেছে। এতে অবাক হচ্ছি না। কলিমুল্লাহ-ছলিমুল্লাহদের পূর্বপুরুষেরাও এ দেশের সন্তান। তাঁদেরও জন্ম হয়েছিল এই দেশে। তাঁরা যখন তীর ছোড়েন, তখন লক্ষ্য থাকে তীরের আগাটা যেন অন্যকে স্পর্শ করে, গোটা তীর নয়। কেননা, গোটা তীর বিঁধিয়ে দেওয়ার মতো শক্তি অপপ্রচারকারীদের থাকে না।
সেই অর্থে তোমাদের আঘাতটা আমরা বুঝি। বুঝি দেখেই বলছি, রবীন্দ্রনাথ প্রতিদিন দেশে-বিদেশে অগণিত ভক্ত তৈরি করে যাচ্ছেন, যাঁদের অধিকাংশই তাঁকে স্বচক্ষে দেখেননি। বিশেষ জ্ঞানকে যদি বিজ্ঞান বলা হয়, তবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে জানাও বিজ্ঞান। তাঁর ভক্ত হয়ে ওঠা একটি ক্রমবিকাশের অধ্যায়, একটি চলমান প্রক্রিয়া।
কোনো একজন বিশেষ ব্যক্তির ভক্ত হতে হলে তাঁকে নিজের সময়কালের মানুষ হতে হবে, তেমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। যাঁর কথা ও আহ্বান তোমার কানে পৌঁছায়, তাঁকে তোমার দেশের পাসপোর্টধারী হতে হবে এমন ভাবতে থাকলে প্রশ্নবাণে জর্জরিত হবে। যিনি অনেক কিছু দিয়েছেন, তাঁকে তিনি কী কী দেননি, শুধু তার ভিত্তিতে বিচার করতে থাকলে সেটা উল্টো রথে চলা ছাড়া আর কিছু নয়। তাও হয়তো মেনে নেওয়া যায়, অন্তত ব্যক্তিটির অর্ধেক কর্মফল নিক্তিতে তুলে দেখার পরে। নয়তো সমস্তটাই হালকা।
কাজেই নিয়ে এসো তোমার পড়ার টেবিলে রবীন্দ্রনাথের ‘রবি’। দেখবে, তুমি আলোকিত হয়ে যাবে। সেদিন আমি ফিরে আসব, একজন মায়ের মুখে রবীন্দ্রবাণী শুনতে।

পাতা সরানী
এই মেয়ে দুটোকে দেখি আর অবাক হয়ে যাই! শীত, বর্ষা, তুষারঝড় কোনো কিছুই তাদের দমাতে পারে না। সকাল আটটা থেকেই এরা বাইরের কাজে নেমে পড়ে। গাছগাছালিকে সবুজ ও সতেজ রাখে, ফুলের গাছ লাগিয়ে কমপ্লেক্সের চারপাশের পরিবেশকে সুন্দর করে তোলে। কাজ যেন শেষ হয় না ওদের। একবার প্রচণ্ড গরমের দিনে দেখলাম কপালের ঘাম মুছতে মুছতে ওরা নতুন গাছের চারা লাগাচ্ছে। পরনে এই ভারী পোশাক! গাড়িতে উঠতে যাব, এমন সময় দৃশ্যটি দেখে বাসার ভেতরে গিয়ে দুই বোতল ঠান্ডা পানি এনে দিলাম। বিনিময়ে তারা লাখ টাকার হাসি উপহার দিল।
আজ সকালে বাইরে যাওয়ার সময় দেখলাম, তারা পাতা সরানোর কাজে নেমেছে। বেশ কিছুক্ষণ পর ফিরে এসে দেখি, কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। এরপর পাতাগুলো বস্তাবন্দী করে নির্দিষ্ট স্থানে রেখে আসার কাজ বাকী। পাতা সরানীদের অনুমতি নিয়ে কিছু ছবি তুললাম। আমাদের চারপাশকে এতো সুন্দর ও পরিচ্ছন্ন রাখার কাজ যারা করে তাদের জীবনটাও যেন সুন্দর ও পরিচ্ছন্ন থাকে।

