
কানাডা থেকে আলাদা হয়ে গেলে কুইবেক, আলবার্টা ও সাস্কেচুয়ান প্রদেশ আরও বেশি স্বচ্ছল হতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন টেসলার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ইলন মাস্ক। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া একাধিক পোস্টে তিনি প্রদেশগুলোর বিচ্ছিন্ন হওয়ার পক্ষে মত দেন। তাঁর এই মন্তব্য কানাডার অখণ্ডতা, প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন এবং স্বাধীনতার প্রশ্নকে ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
অনলাইন ভবিষ্যদ্বাণীভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম পলিমার্কেটে প্রকাশিত একটি পোস্টের সূত্র ধরে মাস্কের মন্তব্য সামনে আসে। ওই পোস্টে কুইবেকের প্রিমিয়ার ও স্বাধীনতাপন্থী পার্টি কুইবেকোয়ার নেতা পল সেইন্ট-পিয়েরে প্লামোন্ডনের বক্তব্য তুলে ধরা হয়। সেখানে প্লামোন্ডন বলেছেন, কুইবেকের স্বাধীনতার স্বপ্ন একদিন বাস্তবে রূপ নেবে। এর জবাবে মাস্ক সংক্ষিপ্ত মন্তব্যে বলেন, ‘ভালো। কুইবেকের আলাদা হওয়া উচিত।’ এর কিছুক্ষণ পর আরেকটি পোস্টে তিনি আলবার্টা ও সাস্কেচুয়ানেরও কানাডা থেকে আলাদা হওয়ার পক্ষে মত দেন। তবে প্রদেশগুলো কীভাবে বিচ্ছিন্ন হলে অর্থনৈতিকভাবে আরও স্বচ্ছল হবে, সে বিষয়ে মাস্ক তাঁর পোস্টে বিস্তারিত কোনো ব্যাখ্যা দেননি। তাঁর মন্তব্যের পক্ষে কোনো অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ বা পরিসংখ্যানও সেখানে তুলে ধরা হয়নি।
কানাডার প্রদেশগুলোর মধ্যে কুইবেকের স্বাধীনতা নিয়ে বিতর্ক দীর্ঘদিনের। ফরাসিভাষী সংখ্যাগরিষ্ঠ এই প্রদেশের স্বাধীনতাপন্থী রাজনৈতিক আন্দোলন অতীতেও একাধিকবার গণভোটের মাধ্যমে জনগণের মতামত যাচাই করেছে। ১৯৮০ ও ১৯৯৫ সালের দুটি গণভোটেই স্বাধীনতার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যাত হয়। ১৯৯৫ সালের গণভোটে ব্যবধান ছিল অত্যন্ত সামান্য। পার্টি কুইবেকোয়া দীর্ঘদিন ধরে কুইবেকের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার পক্ষে অবস্থান নিয়ে আসছে। দলটির নেতা পল সেইন্ট-পিয়েরে প্লামোন্ডনও স্বাধীনতার প্রশ্নকে তাঁর রাজনৈতিক কর্মসূচির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে তুলে ধরেছেন।
অন্যদিকে, আলবার্টা ও সাস্কেচুয়ানে কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে প্রাদেশিক ক্ষমতা, জ্বালানি নীতি, কর এবং অর্থনৈতিক স্বার্থ নিয়ে বিভিন্ন সময়ে অসন্তোষ প্রকাশ পেয়েছে। বিশেষ করে জ্বালানি উৎপাদন ও প্রাকৃতিক সম্পদনির্ভর অর্থনীতির কারণে এই দুই প্রদেশের সঙ্গে অটোয়ার নীতিগত মতপার্থক্য প্রায়ই আলোচনায় আসে। তবে কোনো প্রদেশের স্বাধীনতা নিয়ে রাজনৈতিক অসন্তোষ থাকা এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থান নেওয়া এক বিষয় নয়। মাস্কের মন্তব্যও ওই তিন প্রদেশের জনগণের সম্মিলিত মতামতের প্রতিফলন নয়।
দক্ষিণ আফ্রিকার প্রিটোরিয়ায় জন্ম নেওয়া ইলন মাস্কের সঙ্গে কানাডার সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। তিনি কানাডীয় নাগরিকও। তাঁর মা মে মাস্কের জন্ম সাস্কেচুয়ানের রেজিনায়। ১৯৮৯ সালে ১৭ বছর বয়সে মাস্ক কানাডায় আসেন। জীবনের শুরুর দিকে তিনি সাস্কেচুয়ানের একটি পারিবারিক খামার এবং ভ্যানকুভারের একটি কাঠ প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানায় কাজ করেন। পরে অন্টারিওতে গিয়ে কিংস্টনের কুইনস ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনা করেন। পরবর্তী সময়ে প্রযুক্তি ও ব্যবসার জগতে নিজের অবস্থান তৈরি করেন মাস্ক। বর্তমানে তিনি টেসলার প্রধান নির্বাহী এবং স্পেসএক্সের নেতৃত্বস্থানীয় ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত। বিশ্বের অন্যতম ধনী এই উদ্যোক্তার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিষয়ে মন্তব্যও প্রায়ই আন্তর্জাতিক আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে।
মাস্কের কানাডীয় নাগরিকত্বও অতীতে রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে এসেছে। গত বছর তাঁর নাগরিকত্ব বাতিলের আহ্বান জানিয়ে একটি অনলাইন পিটিশন চালু করা হয়। পিটিশনে অভিযোগ করা হয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি দক্ষতাবিষয়ক দপ্তর ডিপার্টমেন্ট অব গভর্নমেন্ট ইফিশিয়েন্সির তৎকালীন প্রধান হিসেবে মাস্কের কর্মকাণ্ড কানাডার গণতন্ত্রে হস্তক্ষেপের ঝুঁকি তৈরি করছে। পিটিশনটি কানাডার হাউস অব কমন্সের অনলাইন পিটিশন ব্যবস্থায় ব্যাপক সাড়া ফেলে এবং বিপুলসংখ্যক স্বাক্ষর সংগ্রহ করে। তবে পিটিশনে উত্থাপিত অভিযোগকে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। নাগরিকত্ব বাতিলের দাবি তোলা এবং আইনগতভাবে নাগরিকত্ব বাতিল হওয়া সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।
কুইবেক, আলবার্টা ও সাস্কেচুয়ানের স্বাধীনতার পক্ষে মাস্কের বক্তব্য এমন এক সময়ে এল, যখন কানাডায় প্রাদেশিক স্বার্থ, কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতা এবং জাতীয় ঐক্য নিয়ে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। তবে তাঁর মন্তব্যের ফলে ওই প্রদেশগুলোর স্বাধীনতার আন্দোলনে কী ধরনের প্রভাব পড়বে, তা এখনই বলা কঠিন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একজন প্রভাবশালী ব্যবসায়ীর মতামত রাজনৈতিক আলোচনায় গুরুত্ব পেলেও তা কোনো প্রদেশের সাংবিধানিক অবস্থান বা জনগণের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে না।
কানাডা থেকে কোনো প্রদেশের বিচ্ছিন্ন হওয়ার প্রশ্নে রাজনৈতিক সমর্থনের পাশাপাশি সাংবিধানিক প্রক্রিয়া, গণতান্ত্রিক বৈধতা এবং অর্থনৈতিক বাস্তবতার মতো বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ। ফলে মাস্কের মন্তব্য নতুন করে বিতর্ক তৈরি করলেও তিন প্রদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট জনগণ, রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার ওপর।

