
বিজেপি সমর্থক পরিবারে জন্ম, কিন্তু নিজের রাজনৈতিক পথ হিসেবে বেছে নিয়েছেন বামপন্থা। থিয়েটারের মঞ্চ থেকে রাজপথে—শিক্ষা, চাকরি, ভোটাধিকার কিংবা গণতন্ত্রের প্রশ্নে বারবার সামনে আসছেন ২৯ বছরের নেহা বোরা। কখনো পুলিশের ব্যারিকেডে উঠে স্লোগান, কখনো ২৩ দিনের অনশন, আবার কখনো গ্রেপ্তার হয়েও আন্দোলন থেকে পিছু না হটার দৃশ্য তাকে এনে দিয়েছে জাতীয় পরিচিতি।
দিল্লির রাজপথে তখন উত্তেজনা তুঙ্গে। সামনে পুলিশের ব্যারিকেড, তার গায়ে কাঁটাতার। আর সেই ব্যারিকেডের ওপর উঠে দাঁড়িয়ে এক তরুণী দিচ্ছেন স্লোগান। চোখেমুখে দৃঢ়তা, কণ্ঠে প্রতিবাদের আগুন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে সেই দৃশ্য।
কখনো তাকে দেখা যায় পুলিশের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের ধস্তাধস্তির মধ্যে। কখনো মাইকের সামনে দাঁড়িয়ে সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র বক্তব্য দিতে। আবার কখনো খোলা আকাশের নিচে দিনের পর দিন অনশন করতে।
গত কয়েক মাসে ভারতের ছাত্র-যুব আন্দোলনের অন্যতম পরিচিত মুখ হয়ে উঠেছেন নেহা বোরা।
২৯ বছর বয়সী এই তরুণী জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি গবেষক। পাশাপাশি তিনি বামপন্থি ছাত্র সংগঠন অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের (এআইএসএ) জাতীয় সভাপতি।
তবে শুধু ছাত্রনেতা হিসেবে নয়, ভারতের বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনে সামনের সারিতে থাকার কারণেই এখন তাকে নিয়ে আলোচনা তুঙ্গে।
২৩ দিনের অনশন, তবু নড়েননি
নেহার জাতীয় পর্যায়ে পরিচিতি দ্রুত বাড়ে দিল্লির যন্তর মন্তরের ছাত্র-যুব আন্দোলনের সময়।
‘নিট’ পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁস ও অনিয়মের অভিযোগের প্রতিবাদে শুরু হওয়া আন্দোলনে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবি ওঠে। সেই আন্দোলনে অনির্দিষ্টকালের অনশনে বসেন নেহা।
টানা ২৩ দিন খোলা আকাশের নিচে অনশন করেন তিনি।
একপর্যায়ে তার রক্তে শর্করার মাত্রা বিপজ্জনকভাবে কমে যায়। চিকিৎসকেরা দ্রুত হাসপাতালে যাওয়ার পরামর্শ দিলেও আন্দোলন ছাড়তে রাজি হননি নেহা।
তার অনড় অবস্থান ও জ্বালাময়ী বক্তৃতার ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। জাতীয় সংবাদমাধ্যমেও নিয়মিত উঠে আসতে থাকে তার নাম।
রাহুল গান্ধীর পাশের সেই তরুণী
আন্দোলনের মধ্যেই নেহার পরিচিতি আরও বড় পরিসরে পৌঁছে যায়।
২০২৬ সালের ২৫ জুলাই শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানাতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে কংগ্রেস নেতা ও লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধীর পাশে দেখা যায় তাকে।
রাহুলের সঙ্গে বৈঠকের পর নেহা স্পষ্ট করে জানান, শিক্ষাব্যবস্থার সংকট ও শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি থেকে তারা সরে যাবেন না।
একই মঞ্চে রাহুল গান্ধী ও নেহা বোরার উপস্থিতি তাকে জাতীয় রাজনীতির আলোচনায় আরও সামনে নিয়ে আসে।
গায়ে কালি ছোড়া হলো, তবু থামেননি
দিল্লির পর ঝাড়খণ্ডেও আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ান নেহা।
পরীক্ষা ও নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগে চলা আন্দোলনের সময় রাঁচিতে তার গায়ে কালি ছুড়ে মারা হয়।
কিন্তু কালিমাখা শরীর নিয়েই ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ জানান তিনি। তার বক্তব্য ছিল, কালি ছুড়ে ভয় দেখিয়ে আন্দোলন থামানো যাবে না।
এরপর বিহারেও আন্দোলনে অংশ নিয়ে গ্রেপ্তার হওয়া শিক্ষার্থীদের মুক্তির দাবিতে সরব হন নেহা।
নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধেও রাজপথে
সেপ্টেম্বরের শেষ ও অক্টোবরের শুরুতে ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে বিরোধীদের আন্দোলনেও সামনের সারিতে ছিলেন নেহা।
ভোটার তালিকার বিশেষ সংশোধন প্রক্রিয়ায় বৈধ ভোটারদের নাম বাদ দেওয়ার অভিযোগ তুলে আন্দোলনে নামে বিরোধী দল ও বিভিন্ন নাগরিক সংগঠন। সেই বিক্ষোভে যোগ দেন নেহা ও তার সংগঠনের কর্মীরা।
২ অক্টোবর তাকে যোগেন্দ্র যাদবসহ কয়েকশ বিক্ষোভকারীর সঙ্গে আটক করে পুলিশ।
৪ অক্টোবরও ব্যারিকেড ভেঙে যন্তর মন্তরের দিকে যাওয়ার সময় তাকে আটক করা হয়। পরে দিল্লি থেকে দূরের নারেলা এলাকায় নিয়ে গিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়।
কিন্তু গ্রেপ্তারও তাকে থামাতে পারেনি।
থিয়েটারের মঞ্চ থেকে রাজপথে
নেহার রাজনীতিতে আসার গল্পটিও বেশ আলাদা।
দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় ‘সাংওয়ারি’ নামের একটি থিয়েটার দলের সঙ্গে যুক্ত হন তিনি। পথনাটক করতে গিয়ে সমাজের নানা স্তরের মানুষের বাস্তব জীবন ও সমস্যার সঙ্গে পরিচিত হন।
সেই অভিজ্ঞতাই ধীরে ধীরে তাকে রাজনীতির দিকে টেনে নেয়।
জেএনইউতে ভর্তি হওয়ার পর বামপন্থি ছাত্র সংগঠন এআইএসএর সঙ্গে যুক্ত হন। শিক্ষা খাতে বেসরকারিকরণ, ফি বৃদ্ধি, আবাসন সংকট ও নারীদের নিরাপত্তার মতো বিভিন্ন ইস্যুতে আন্দোলনে সক্রিয় হয়ে ওঠেন।
ধীরে ধীরে সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্বে উঠে আসেন তিনি।
পরিবার বিজেপির, পথ বামপন্থার
নেহার রাজনৈতিক যাত্রার সবচেয়ে আলোচিত দিকগুলোর একটি হলো তার পারিবারিক পরিচয়।
উত্তরাখণ্ডের খাটিমায় জন্ম নেওয়া নেহার বাবা ছিলেন ভারতীয় সেনাবাহিনীর সদস্য। বাবার বদলির চাকরির কারণে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে শৈশব কেটেছে তার।
উচ্চশিক্ষার জন্য দিল্লিতে আসার পর বদলে যেতে থাকে তার রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি।
নেহার পরিবার দীর্ঘদিনের বিজেপি সমর্থক। কিন্তু তিনি বেছে নেন বামপন্থি রাজনীতি।
এ নিয়ে পরিবারের সঙ্গে মতপার্থক্যও তৈরি হয়। অনেক সময় বাড়ির পরিবেশ উত্তপ্ত হয়ে উঠত বলে জানিয়েছেন নেহা।
তবে নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো মানসিক ও আর্থিক স্বাধীনতা অর্জন করায় শেষ পর্যন্ত নিজের রাজনৈতিক পথেই এগিয়ে যান তিনি।
গডসে নয়, ভগৎ সিং
নেহার আন্দোলন শুধু চাকরি কিংবা শিক্ষার দাবিতে সীমাবদ্ধ নয়। ভারতের ধর্মনিরপেক্ষতা ও গণতন্ত্র রক্ষার প্রশ্নও তার বক্তব্যের বড় অংশজুড়ে রয়েছে।
হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি, বিজেপি ও আরএসএসের কঠোর সমালোচক নেহা মনে করেন, ধর্মীয় বিভাজনের রাজনীতি ব্যবহার করে তরুণদের শিক্ষা, চাকরি ও ভবিষ্যতের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু থেকে মানুষের দৃষ্টি সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
যন্তর মন্তরের আন্দোলনে ব্যবহৃত একটি পোস্টারের কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেছিলেন—গডসে আর ভগৎ সিংয়ের আদর্শের পার্থক্যই তাদের রাজনৈতিক অবস্থানের পার্থক্য।
তার আন্দোলনের প্রভাব পড়েছে পরিবারেও। নেহার ভাষ্য অনুযায়ী, পুলিশের লাঠিপেটা ও আন্দোলনকারীদের ওপর দমন-পীড়ন দেখার পর তার বিজেপি সমর্থক মাও আন্দোলনকারীদের প্রশংসা করতে বাধ্য হয়েছেন।
‘তুলনা নয়, সংহতি’
নেহার জনপ্রিয়তা এখন রাজপথ ছাড়িয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ছড়িয়ে পড়েছে।
তাকে আরেক যুব আন্দোলনকর্মী অভিজিৎ দীপকের সঙ্গে তুলনা করে কে বেশি মেধাবী—এমন বিতর্কও শুরু হয়। কিন্তু নেহা সেই বিতর্কে যেতে চাননি।
তার সাফ কথা—‘তুলনা নয়, সংহতি। আমরা একসঙ্গে লড়ি।’
এই একটি বাক্যেই যেন ধরা পড়ে নেহার রাজনৈতিক দর্শন।
থিয়েটারের মঞ্চ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস, সেখান থেকে দিল্লির রাজপথ—নেহা বোরা এখন ভারতের ছাত্র-যুব আন্দোলনের অন্যতম আলোচিত মুখ।
তার বয়স ৩০-এর কাছাকাছি। রাজনৈতিক জীবনের পথও খুব দীর্ঘ নয়। কিন্তু কয়েক মাসের আন্দোলনেই যে দৃশ্যমানতা তিনি তৈরি করেছেন, তাতে ভারতের ভবিষ্যৎ যুব রাজনীতিতে নেহা বোরা কতটা বড় ভূমিকা নেবেন—সেদিকে এখন নজর অনেকের।

