
ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার আগে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারের প্রতিশ্রুতি নিয়েছিল কানাডা। প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি সেই সংস্কারগুলোর কথা উল্লেখ করেই গত বছর ফিলিস্তিনকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়ার ঘোষণা করেছিলেন। এক বছর পর এখন প্রশ্ন উঠছে প্রতিশ্রুত সংস্কারের বাস্তব অগ্রগতি কতটা?
কানাডা বর্তমানে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের সংস্কার ও সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা করছে। অটোয়ার বক্তব্য, ভবিষ্যতে গাজায় বেসামরিক শাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষকে সক্ষম করে তোলাই এই উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য। কার্নি জানিয়েছিলেন, ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস তাঁর কাছে শাসনব্যবস্থায় মৌলিক সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। একই সঙ্গে কানাডা স্পষ্ট করেছে, ভবিষ্যতের ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থায় হামাসের কোনও ভূমিকা থাকা উচিত নয়।
কানাডায় নিযুক্ত ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রদূত ফেদা আবদেলহাদী গত আগস্টে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জানান, ফিলিস্তিনি সমাজে গণতন্ত্র সম্প্রসারণ এবং প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করার লক্ষ্যে সংস্কারের কাজ চলছে। তবে তাঁর বক্তব্য, চলমান সংঘাত ও দখলদারিত্বের পরিস্থিতিতে সেই সংস্কারের পরিসরও সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে।
ফিলিস্তিনি প্রতিনিধিদল কানাডিয়ান প্রেসকে ফিলিস্তিনি অর্থ মন্ত্রণালয়ের জুলাইয়ে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন দিয়েছে। সেখানে দাবি করা হয়েছে, ১৮ মাসের সময়সীমায় প্রতিশ্রুত ৩৩টি আইনি ও সামাজিক সংস্কারের মধ্যে ৩০টি বাস্তবায়ন করা হয়েছে। আইনশাসন জোরদার করা এবং বিনিয়োগ-সংক্রান্ত আইন শক্তিশালী করার মতো বিষয়ও ওই তালিকায় রয়েছে। তবে এসব সংস্কারের বাস্তব প্রয়োগ এবং সেগুলোর কার্যকারিতা নিয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য সীমিত। ফলে ‘৩০টি সংস্কার সম্পন্ন’ এই দাবিকে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের নিজস্ব মূল্যায়ন হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
কার্নির শর্তগুলোর অন্যতম ছিল গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া জোরদার করা। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ ২০২৬ সালে সাধারণ নির্বাচন আয়োজনের অঙ্গীকার করেছে এবং হামাস সেই নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে না। ফিলিস্তিনে সর্বশেষ সাধারণ নির্বাচন হয়েছিল ২০০৬ সালে। পরের বছর হামাস গাজার নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর ফিলিস্তিনি রাজনীতিতে পশ্চিম তীর ও গাজার মধ্যে কার্যত রাজনৈতিক বিভাজন তৈরি হয়।
তবে নির্বাচন আয়োজনের বিষয়টি এখনও জটিল। গত বছর ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছিল, গাজার যুদ্ধ পুরোপুরি শেষ হওয়ার অন্তত এক বছর পর নির্বাচন আয়োজন করা সম্ভব হতে পারে। তার জন্য রাজনৈতিক প্রার্থীদের ইসরায়েলি হেফাজতে না থাকা এবং পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমে ভোট দেওয়ার সুযোগ নিশ্চিত হওয়ার মতো শর্তও তারা সামনে রেখেছিল। ফলে ২০২৬ সালের নির্বাচন নিয়ে প্রতিশ্রুতি থাকলেও নির্দিষ্ট ভোটের তারিখ এখনও সামনে আসেনি।
কানাডার স্বীকৃতির সঙ্গে যুক্ত আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল ইসরায়েলি কারাগারে বন্দি বা নিহত ফিলিস্তিনিদের পরিবারকে দেওয়া ভাতা ব্যবস্থার সংস্কার। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে মাহমুদ আব্বাস ঘোষণা করেছিলেন, বন্দি বা নিহত ফিলিস্তিনিদের পরিবারকে পুরনো পদ্ধতিতে ভাতা দেওয়ার ব্যবস্থা পরিবর্তন করা হবে। এর বদলে ‘তামকিন’ নামে একটি একক সামাজিক সহায়তা ব্যবস্থায় পরিবারের আর্থিক প্রয়োজনকে মূল মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করার কথা বলা হয়। কানাডার পক্ষ থেকে এই পরিবর্তনকে সংস্কারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখা হয়েছে।
ফিলিস্তিনি শিক্ষাব্যবস্থার পাঠ্যক্রমও দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক বিতর্কের বিষয়। ইসরায়েলভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ইম্প্যাক্ট-এসইর ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যক্রম নিয়ে প্রকাশিত বিশ্লেষণে দাবি করা হয়েছে, অনেক পাঠ্যপুস্তক ও শিক্ষকের নির্দেশিকায় সহিংসতা, জিহাদ ও শহিদত্বকে ইতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে এবং ইহুদিবিদ্বেষ ও ইসরায়েল-বিরোধী বিষয়বস্তুও রয়েছে। সংস্থাটি ২৯০টি পাঠ্যপুস্তক ও ৭১টি শিক্ষক নির্দেশিকা পর্যালোচনা করেছে।
ইম্প্যাক্ট-এসইর প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ২০২৫-২৬ সালের নতুন সংস্করণগুলোতে আগের বছরগুলোর তুলনায় মৌলিক পরিবর্তন খুব সীমিত। তবে এই মূল্যায়নটি ওই সংস্থার নিজস্ব গবেষণা ও মানদণ্ডের ভিত্তিতে করা হয়েছে এটি কানাডা সরকারের স্বাধীন তদন্ত নয়। অন্যদিকে, ইসরায়েলি শিক্ষাব্যবস্থার পাঠ্যপুস্তক নিয়েও অতীতে সমালোচনা হয়েছে। ফলে শিক্ষাক্ষেত্রে একতরফা পরিবর্তনের প্রশ্নের পাশাপাশি দুই পক্ষের পাঠ্যক্রমে পারস্পরিক বিরোধিতা ও সংঘাতের উপস্থাপনাও দীর্ঘদিনের বিতর্কের অংশ।
কানাডার ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি এবং সংস্কার নিয়ে অটোয়ার অবস্থানের সমালোচনা করেছে ইসরায়েল। কানাডায় নিযুক্ত ইসরায়েলি রাষ্ট্রদূত ইদ্দো মোয়েডের বক্তব্য, ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ দুর্নীতিগ্রস্ত এবং ইসরায়েলের পাশাপাশি শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের ব্যাপারে তারা যথেষ্ট আন্তরিক নয়।
নির্বাচনের নির্দিষ্ট সময়সূচি না থাকার বিষয়টিও তিনি তুলে ধরেছেন। তাঁর দাবি, ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ তাদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি পূরণ করছে না। এই অবস্থান অবশ্য ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের বক্তব্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ফিলিস্তিনি পক্ষ বলছে, সংস্কারের কাজ চলছে, কিন্তু যুদ্ধ, মানবিক সংকট এবং দখলদারিত্বের বাস্তবতা সেই প্রক্রিয়াকে কঠিন করে তুলছে।
ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের সংস্কারের পাশাপাশি গাজা ও পশ্চিম তীরের সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়েও কানাডা প্রকাশ্যে অবস্থান জানিয়েছে। অটোয়া বলেছে, তারা দুই-রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান এগিয়ে নিতে এবং গাজায় ভবিষ্যতে ফিলিস্তিনি বেসামরিক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠায় কাজ করছে। একই সঙ্গে পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণ ও বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা নিয়েও কানাডা উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
অটোয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মানবাধিকার গবেষক জেরেমি উইল্ডম্যানের মতে, শুধু ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের সংস্কারের ওপর জোর না দিয়ে ফিলিস্তিনিদের ওপর চলমান সহিংসতা, পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনকারীদের কর্মকাণ্ড এবং শাসনব্যবস্থা কার্যকর রাখার পরিবেশ তৈরির বিষয়েও কানাডার নজর দেওয়া প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে, ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেওয়ার সময় কানাডা যে সংস্কারগুলোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছিল, তার কিছু ক্ষেত্রে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ অগ্রগতির দাবি করছে। আবার নির্বাচন, শিক্ষাব্যবস্থা, ভাতা কাঠামো এবং ভবিষ্যৎ শাসনব্যবস্থার মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নে এখনও বিতর্ক ও অনিশ্চয়তা রয়েছে। ফলে কার্নি সরকারের কাছে এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রতিশ্রুত সংস্কারকে কীভাবে বাস্তব ও পরিমাপযোগ্য পরিবর্তনে রূপ দেওয়া যায়।

