
২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর। নিউইয়র্কের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার ও যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য স্থানে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর বদলে গিয়েছিল গোটা বিশ্বের পরিস্থিতি। সেই দিনটির ২৫ বছর পূর্তিতে আবারও সামনে এসেছে কানাডার মানুষের সহমর্মিতা ও সহযোগিতার গল্প। ২০২৬ সালের ১১ সেপ্টেম্বর ৯/১১ হামলার ২৫তম বার্ষিকী পালিত হয়েছে। হামলায় প্রায় ৩ হাজার মানুষ নিহত হন, যাঁদের মধ্যে ২৪ জন ছিলেন কানাডীয় নাগরিক।
সেই ভয়াবহ দিনের স্মৃতি এখনও স্পষ্ট কানাডায় দায়িত্ব পালনরত মার্কিন কূটনীতিক ব্যাক্সটার হান্টের কাছে। বর্তমানে টরন্টোতে মার্কিন কনসাল জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। ৯/১১-এর পরদিন অটোয়ায় মার্কিন দূতাবাসে কাজে গিয়ে ভবনের বাইরে ফুলের স্তূপ দেখে কানাডীয়দের সমর্থনে অভিভূত হওয়ার কথা স্মরণ করেছেন হান্ট। তাঁর কথায়, সেটি ছিল এমন একটি দিন, যা কখনও ভোলার নয়। তবে সেই শোকের মধ্যেও কানাডার সাধারণ মানুষের কাছ থেকে পাওয়া সহমর্মিতা তাঁর মনে গভীর ছাপ ফেলেছিল।
৯/১১ হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি কানাডার মানুষের সংহতি বিভিন্নভাবে প্রকাশ পেয়েছিল। কানাডার সরকারি তথ্য অনুযায়ী, হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রগামী বহু আন্তর্জাতিক ফ্লাইট কানাডার বিভিন্ন বিমানবন্দরে ঘুরিয়ে দেওয়া হয়। দেশটির বিভিন্ন সম্প্রদায় আটকে পড়া যাত্রীদের খাবার, আশ্রয় ও প্রয়োজনীয় সহায়তা দেয়।
নিউফাউন্ডল্যান্ড অ্যান্ড ল্যাব্রাডরের ছোট শহর গান্ডার হয়ে ওঠে সেই মানবিকতার অন্যতম প্রতীক। যুক্তরাষ্ট্রের আকাশসীমা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর ৩৮টি বিমানকে গান্ডারে অবতরণ করানো হয়। সেখানে প্রায় ৬ হাজার ৬৫০ জনের বেশি যাত্রী ও ক্রু কয়েক দিন অবস্থান করেন। স্থানীয় মানুষ নিজেদের বাড়ি, স্কুল ও অন্যান্য জায়গায় তাঁদের থাকার ব্যবস্থা করেন এবং খাবারসহ নানা ধরনের সহায়তা দেন। কানাডার পরিবহন মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গান্ডারসহ কানাডার বিভিন্ন বিমানবন্দরে মোট ২৩৮টি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট ঘুরিয়ে দেওয়া হয়েছিল।
গান্ডারের ঘটনা হান্টের স্মৃতিতেও বিশেষ জায়গা করে নিয়েছে। তাঁর মতে, সেদিন সম্পূর্ণ অচেনা মানুষদের জন্য কানাডার মানুষ যে সহানুভূতি দেখিয়েছিলেন, তা ছিল অসাধারণ। গান্ডারের জনসংখ্যা তখন ছিল ১০ হাজারেরও কম। অথচ মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সেখানে হাজার হাজার অতিরিক্ত মানুষের থাকার ব্যবস্থা করতে হয়েছিল। স্থানীয় বাসিন্দারা যাত্রীদের নিজেদের বাড়িতে আশ্রয় দিয়েছিলেন, তাঁদের খাবার দিয়েছিলেন এবং উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তার সেই সময়ে পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। কানাডা সরকারও পরবর্তী সময়ে গান্ডারের এই ভূমিকার স্বীকৃতি দিয়েছে।
শুধু গান্ডারেই নয়, কানাডার অন্যান্য শহর ও সম্প্রদায়ও আটকে পড়া যাত্রীদের সহায়তায় এগিয়ে এসেছিল। ২০২৬ সালে ২৫তম বার্ষিকী উপলক্ষে কানাডার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ৯/১১-এর পর ৩৩ হাজারের বেশি যাত্রী কানাডার বিভিন্ন সম্প্রদায়ে আশ্রয় পেয়েছিলেন। হান্টের স্মৃতিতে তাই ৯/১১ শুধু সন্ত্রাসী হামলা ও প্রাণহানির ঘটনা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বিপদের সময়ে দুই দেশের মানুষের পাশে দাঁড়ানোর স্মৃতিও।
৯/১১-এর ঘটনায় নিহতদের মধ্যে ২৪ জন কানাডীয় নাগরিক ছিলেন। কানাডা সরকার বিভিন্ন সময়ের স্মরণবার্তায় তাঁদের নাম ও পরিবারের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছে। ২৫ বছর পরও সেই ক্ষত পুরোপুরি মুছে যায়নি। তবে ভয়াবহ সেই দিনের স্মৃতির পাশাপাশি কানাডার মানুষের মানবিকতার ঘটনাগুলোও ফিরে আসছে আলোচনায়। গান্ডারের ছোট শহর থেকে শুরু করে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সাধারণ মানুষের যে সহযোগিতা সেদিন হাজারো বিপর্যস্ত যাত্রীর কাছে পৌঁছেছিল, ৯/১১-এর ইতিহাসে সেটিও হয়ে আছে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

