
কক্সবাজারে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরাসরি সম্প্রচারে এসে প্রেমিক ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ তুলে বিচার চাওয়ার একদিন পর সুমাইয়া আক্তার ওরফে ইশরাত নামে এক নারীর মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। মৃত্যুর আগে থানায় লিখিত অভিযোগও করেছিলেন তিনি। সেখানে প্রেমিকের বিরুদ্ধে বিয়ের আশ্বাস, নির্যাতন, ভয়ভীতি প্রদর্শন ও অনাগত সন্তান নষ্ট করার জন্য চাপ দেওয়ার অভিযোগ করেছিলেন সুমাইয়া।
রোববার দুপুরে কক্সবাজার সদর মডেল থানা পুলিশ তার মরদেহ উদ্ধার করে। নিহত সুমাইয়া চৌফলদণ্ডীর সিকদার পাড়া এলাকার মৃত মোক্তার আহম্মদের মেয়ে।
সুমাইয়ার করা লিখিত অভিযোগ অনুযায়ী, প্রায় এক বছর আগে সাইফুল ইসলাম হৃদয়ের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। একপর্যায়ে তাদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। পরে বিয়ের আশ্বাস দিয়ে চলতি বছরের ১০ জানুয়ারি থেকে সাইফুল তাকে কক্সবাজার পৌরসভার গোলদীঘির পাড় এলাকার একটি ভাড়া বাসায় রাখেন। সেখানে তারা স্বামী-স্ত্রীর মতো বসবাস করতেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করেন সুমাইয়া।
এরপর সুমাইয়া অন্তঃসত্ত্বা হলে তাদের সম্পর্কে টানাপোড়েন শুরু হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি। অনাগত সন্তান নষ্ট করার জন্য সাইফুল চাপ দিতে থাকেন এবং এতে রাজি না হওয়ায় তাকে মারধর ও ভয়ভীতি দেখানো হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
অভিযোগে আরও বলা হয়, গত ২৮ জুলাই বিকেলে কলাতলী এলাকার একটি হোটেলে নিয়ে গিয়েও অনাগত সন্তান নষ্ট করার উদ্দেশ্যে তাকে শারীরিকভাবে নির্যাতন করা হয়। সন্তান নষ্ট করতে অস্বীকৃতি জানালে তাকে হুমকি দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ করেন সুমাইয়া।
নিজের নিরাপত্তা নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করে সাইফুলের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার আবেদন করেছিলেন তিনি। থানায় লিখিত অভিযোগ দেওয়ার পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরাসরি সম্প্রচারে এসে নিজের ওপর কথিত নির্যাতন ও মানসিক যন্ত্রণার কথা তুলে ধরেন সুমাইয়া। মৃত্যুর আগে স্থানীয় একটি অনলাইন সংবাদমাধ্যমকেও তিনি মারধর, হুমকি ও ভয়ভীতির অভিযোগের কথা জানিয়েছিলেন।
স্বজনদের অভিযোগ
সুমাইয়ার স্বজনদের দাবি, শুধু প্রেমিকের কাছ থেকে স্বীকৃতি পাওয়ার চেষ্টা নয়, অনাগত সন্তানের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতেও বিভিন্নজনের কাছে গিয়েছিলেন তিনি। এমনকি সাইফুলের বাড়িতেও গিয়েছিলেন সুমাইয়া। সেখানে তাকে অপমান ও মারধর করা হয়েছে বলে পরিবারের সদস্যরা অভিযোগ করেছেন।
সুমাইয়ার বড় বোনের ভাষ্য, বিয়ের স্বীকৃতি ও অনাগত সন্তানের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে শেষ পর্যন্ত লড়াই করে গেছেন তার বোন। কিন্তু কোনো সমাধান না পাওয়ায় তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন।
সুমাইয়ার মৃত্যুর পর সাইফুল ইসলাম হৃদয় আত্মগোপনে রয়েছেন বলে জানা গেছে। তার সহযোগী হিসেবে অভিযোগে যাদের নাম এসেছে, তাদের মধ্যে কলাতলীর সোহেল ও বাহারছড়ার আরিফও ঘটনার পর থেকে গা ঢাকা দিয়েছেন বলে স্বজনদের দাবি।
সুমাইয়ার পরিবারের পক্ষ থেকে ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত এবং জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানানো হয়েছে।
তদন্তে বের হবে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ
সুমাইয়ার মৃত্যুর প্রকৃত কারণ কী, তার করা অভিযোগগুলোর সত্যতা কতটা এবং তার মৃত্যুর পেছনে অন্য কারও সম্পৃক্ততা ছিল কি না—তা তদন্তের পরই স্পষ্ট হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
কক্সবাজার সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলী বলেন, সুমাইয়ার রেখে যাওয়া লিখিত অভিযোগ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া বক্তব্য, স্বজনদের অভিযোগ এবং মৃত্যুর ঘটনাকে গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। প্রতারণা কিংবা আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে বলেও জানান তিনি।
পুলিশের তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত সুমাইয়ার মৃত্যুকে ঘিরে ওঠা কোনো অভিযোগকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে বিবেচনা করা যাচ্ছে না। তদন্তের ফলেই ঘটনার প্রকৃত কারণ ও দায়ীদের বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যাবে।

