
অন্টারিওতে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার ক্রমবর্ধমান সংকট মোকাবিলায় বড় পদক্ষেপ নিতে চলেছে প্রাদেশিক সরকার। পারিবারিক চিকিৎসক বা ফ্যামিলি ফিজিশিয়ানের ঘাটতি পূরণে ইয়র্ক ইউনিভার্সিটির নতুন স্কুল অব মেডিসিনকে ৫ কোটি ৫৮ লাখ ডলার অর্থ সহায়তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে ডাগ ফোর্ড সরকার। এই মেডিকেল স্কুলটি বিশেষভাবে পারিবারিক ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার জন্য চিকিৎসক তৈরির ওপর গুরুত্ব দেবে। ইয়র্ক ইউনিভার্সিটির স্কুল অব মেডিসিনকে ঘিরে এই উদ্যোগকে অন্টারিওর স্বাস্থ্যব্যবস্থার দীর্ঘদিনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যার সম্ভাব্য সমাধান হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ প্রদেশটিতে বিপুল সংখ্যক মানুষ এখনও নিয়মিত পারিবারিক চিকিৎসক বা প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীর সঙ্গে যুক্ত হতে পারেননি।
অন্টারিও মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের গত ডিসেম্বরের একটি হিসাব অনুযায়ী, প্রদেশের প্রায় ২৫ লাখ মানুষের নিয়মিত প্রাথমিক চিকিৎসাসেবা পাওয়ার সুযোগ নেই। অর্থাৎ প্রয়োজনের সময় সাধারণ স্বাস্থ্য সমস্যা, দীর্ঘমেয়াদি রোগের পর্যবেক্ষণ কিংবা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার আগে প্রাথমিক পরামর্শ নেওয়ার মতো নির্দিষ্ট চিকিৎসক বা স্বাস্থ্যসেবা টিম তাদের নেই। চিকিৎসকদের অবসর গ্রহণ, চিকিৎসা পেশা থেকে বেরিয়ে যাওয়া এবং জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে পর্যাপ্ত সংখ্যক নতুন চিকিৎসক তৈরি না হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। বিশেষ করে পারিবারিক চিকিৎসার ক্ষেত্রে এই ঘাটতি সরাসরি সাধারণ মানুষের ওপর প্রভাব ফেলছে। একজন পারিবারিক চিকিৎসক শুধু অসুস্থতার সময় চিকিৎসা দেন না; দীর্ঘমেয়াদি রোগের নজরদারি, প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবা, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং প্রয়োজন হলে রোগীকে বিশেষজ্ঞের কাছে পাঠানোর ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ফলে এই স্তরে চিকিৎসকের ঘাটতি থাকলে গোটা স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর চাপ বাড়ে।
ইয়র্ক ইউনিভার্সিটির প্রস্তাবিত স্কুল অব মেডিসিনের অবস্থান হবে কটেলুচ্চি ভন হসপিটাল নেবারহুডের এলাকায়। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৮ সালে সেখানে প্রথমবারের মতো শিক্ষার্থীদের স্বাগত জানানোর লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। নতুন মেডিকেল স্কুলটি কেবল চিকিৎসক তৈরির আরেকটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে উঠবে না। এর মূল লক্ষ্যগুলোর একটি হবে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার প্রয়োজনকে সামনে রেখে ভবিষ্যতের চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া। প্রাদেশিক সরকারের অর্থায়ন এই স্কুলের একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো এগিয়ে নিতে সাহায্য করবে। এর মধ্যে রয়েছে মেডিকেল স্কুলের অ্যাক্রেডিটেশন প্রক্রিয়া, কারিকুলাম তৈরি ও উন্নয়ন, ফ্যাকাল্টি নিয়োগ এবং প্রশিক্ষণ, মেডিকেল লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা এবং প্রাথমিক পরিচালন ব্যয়। অর্থাৎ এই ৫ কোটি ৫৮ লাখ ডলারের বিনিয়োগ শুধু ভবন বা অবকাঠামো তৈরির জন্য নয়। একটি পূর্ণাঙ্গ মেডিকেল শিক্ষা ব্যবস্থা দাঁড় করানোর প্রাথমিক খরচেরও বড় অংশ এতে মেটানো হবে।
ইয়র্ক ইউনিভার্সিটির নতুন মেডিকেল স্কুলকে ঘিরে সরকারের বৃহত্তর স্বাস্থ্যনীতির সঙ্গেও এই উদ্যোগের যোগ রয়েছে। ডাগ ফোর্ড সরকার ২০২৯ সালের মধ্যে অন্টারিওর প্রত্যেক বাসিন্দাকে একজন পারিবারিক চিকিৎসক অথবা প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী একটি টিমের সঙ্গে যুক্ত করার লক্ষ্য নিয়েছে। এই উদ্দেশ্যে সরকার ৩৪ লাখ ডলার অর্থ সহায়তার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে। কলেজেস, ইউনিভার্সিটিজ অ্যান্ড রিসার্চ এক্সেলেন্স অ্যান্ড সিকিউরিটি বিষয়ক মন্ত্রী নোলান কুইনের বক্তব্যেও নতুন মেডিকেল স্কুলটির গুরুত্ব স্পষ্ট হয়েছে। তাঁর মতে, অন্টারিওতে পর্যাপ্ত সংখ্যক পারিবারিক চিকিৎসক নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে ইয়র্ক ইউনিভার্সিটির মেডিকেল স্কুল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। তবে এই লক্ষ্য পূরণ কতটা বাস্তবসম্মত হবে, তা অনেকটাই নির্ভর করবে শুধু মেডিকেল কলেজে আসন বাড়ানোর ওপর নয় প্রশিক্ষিত চিকিৎসকদের কোথায় এবং কীভাবে কাজের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে, তার ওপরও।
অন্টারিওর স্বাস্থ্যমন্ত্রী সিলভিয়া জোন্স জানিয়েছেন, মেডিকেল স্কুলটি পুরোপুরি চালু হলে সেখানে কয়েকশ নতুন পারিবারিক চিকিৎসকের প্রশিক্ষণ আসন তৈরি হবে। সরকারের প্রত্যাশা, এর ফলে আগামী দশকে অন্টারিওতে পারিবারিক চিকিৎসকদের জন্য একটি শক্তিশালী ও নির্ভরযোগ্য ‘পাইপলাইন’ তৈরি হবে। এখানে মূল বিষয়টি হল সময়। নতুন মেডিকেল স্কুল তৈরি করলেই রাতারাতি চিকিৎসকের ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব নয়। একজন চিকিৎসক তৈরি হতে একাধিক বছর সময় লাগে। তাই ২০২৮ সালে শিক্ষার্থীরা ভর্তি হওয়ার পর তাঁদের প্রশিক্ষণ শেষ করে কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করতে আরও কয়েক বছর লাগবে। ফলে এই বিনিয়োগের সুফল সবচেয়ে বেশি দেখা যেতে পারে আগামী দশকে। বর্তমান সংকট মোকাবিলার পাশাপাশি ভবিষ্যতে চিকিৎসকের ঘাটতি যাতে আবার তীব্র আকার না নেয়, সেটিই এই প্রকল্পের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য।
প্রস্তাবিত মেডিকেল স্কুলে শুরুতে ৮০টি আন্ডারগ্র্যাজুয়েট এবং ১০২টি পোস্টগ্র্যাজুয়েট আসন রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। অর্থাৎ প্রথম পর্যায়ে মোট ১৮২টি প্রশিক্ষণ আসন দিয়ে যাত্রা শুরু করার পরিকল্পনা করা হয়েছে। পরবর্তীতে আসন সংখ্যা আরও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। আন্ডারগ্র্যাজুয়েট আসন ২৯৩ এবং পোস্টগ্র্যাজুয়েট আসনও ২৯৩-এ উন্নীত করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে ভবিষ্যতে প্রতি বছর বিপুল সংখ্যক নতুন চিকিৎসক প্রশিক্ষণের সুযোগ পাবেন। বিশেষ করে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকে কেন্দ্র করে এই প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা তৈরি হওয়ায় অন্টারিওর ফ্যামিলি মেডিসিন ব্যবস্থায় দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব পড়তে পারে।
মেডিকেল স্কুলটি প্রতিষ্ঠার জন্য ইয়র্ক ইউনিভার্সিটি নিজেও বড় অঙ্কের অর্থ সংগ্রহ করছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের লক্ষ্য মোট ৩৫ কোটি ডলারের তহবিল গঠন করা। এই প্রকল্পে আঞ্চলিক প্রশাসনেরও উল্লেখযোগ্য অংশগ্রহণ রয়েছে। ইয়র্ক রিজিয়ন ২ কোটি ৫০ লাখ ডলার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। অন্যদিকে সিটি অব ভন প্রকল্পের জন্য জমি দিয়ে সহায়তা করেছে। প্রদেশের পক্ষ থেকেও পরিকল্পনা বাবদ ৯০ লাখ ডলার অনুদান দেওয়া হয়েছে। এর সঙ্গে নতুন করে ঘোষিত ৫ কোটি ৫৮ লাখ ডলারের অর্থায়ন যুক্ত হওয়ায় প্রকল্পটির আর্থিক ভিত্তি আরও শক্তিশালী হচ্ছে।
অন্টারিওর স্বাস্থ্যব্যবস্থায় বর্তমানে সবচেয়ে বড় প্রশ্নগুলোর একটি হল মানুষ অসুস্থ হওয়ার পর হাসপাতালে যাবে, নাকি তার আগেই প্রয়োজনীয় প্রাথমিক চিকিৎসা পাবে? পারিবারিক চিকিৎসক থাকলে অনেক সাধারণ অসুস্থতা হাসপাতাল বা জরুরি বিভাগের বাইরে সামলানো সম্ভব হয়। দীর্ঘমেয়াদি রোগীদের নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা যায় এবং প্রয়োজন অনুযায়ী দ্রুত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসার ব্যবস্থা করা যায়। এতে হাসপাতাল ও জরুরি বিভাগের ওপর চাপও কমতে পারে। এই কারণেই ইয়র্ক ইউনিভার্সিটির নতুন মেডিকেল স্কুলকে শুধু একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখলে বিষয়টির পুরো গুরুত্ব বোঝা যাবে না। এটি অন্টারিওর ভবিষ্যৎ প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কাঠামোর একটি অংশ হিসেবেও পরিকল্পিত হচ্ছে। তবে আসন বাড়ানোই শেষ কথা নয়। নতুন চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণের পর তাঁদের প্রদেশের যেসব এলাকায় পারিবারিক চিকিৎসকের সবচেয়ে বেশি ঘাটতি রয়েছে, সেখানে ধরে রাখা কতটা সম্ভব হবে, সেটিও বড় চ্যালেঞ্জ। চিকিৎসকদের কর্মপরিবেশ, পারিশ্রমিক, প্রশাসনিক চাপ এবং গ্রামীণ ও অপেক্ষাকৃত কম-সুবিধাপ্রাপ্ত এলাকায় কাজের সুযোগ সবকিছুর ওপরই ভবিষ্যতের সাফল্য নির্ভর করবে।
২০২৮ সালে প্রথম শিক্ষার্থীদের ভর্তি দিয়ে যাত্রা শুরু করার লক্ষ্য রয়েছে ইয়র্ক ইউনিভার্সিটির স্কুল অব মেডিসিনের। এরপর ধাপে ধাপে আসন বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। সরকারের ২০২৯ সালের মধ্যে প্রত্যেক অন্টারিওবাসীকে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার আওতায় আনার লক্ষ্যও এর সঙ্গে সমান্তরালে এগোবে। তবে নতুন চিকিৎসক তৈরির ফল পেতে সময় লাগবে। তাই ইয়র্ক ইউনিভার্সিটির মেডিকেল স্কুলের এই উদ্যোগকে তাৎক্ষণিক সংকটের সমাধানের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ হিসেবেই দেখতে হবে। অন্টারিওর প্রায় ২৫ লাখ মানুষের প্রাথমিক চিকিৎসাসেবার বাইরে থাকার বাস্তবতায় এই প্রকল্পের সাফল্য শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত হবে একটি বিষয় দিয়ে নতুন মেডিকেল স্কুল থেকে বেরিয়ে আসা চিকিৎসকদের কতটা কার্যকরভাবে সেই বিপুল সংখ্যক মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া যায়। সেই অর্থে ৫ কোটি ৫৮ লাখ ডলারের সরকারি বিনিয়োগ শুধু একটি মেডিকেল স্কুলকে অর্থায়ন নয়; এটি অন্টারিওর পারিবারিক চিকিৎসাব্যবস্থার ভবিষ্যৎ পুনর্গঠনের একটি বড় বাজি।

