
বিদেশে ছুটি কাটানোর পরিকল্পনা করার সময় সাধারণত বিমানভাড়া, হোটেল, খাবার কিংবা ঘোরাঘুরির খরচ নিয়েই বেশি হিসাব-নিকাশ করেন পর্যটকেরা। কিন্তু ভ্রমণ শেষ করে দেশে ফেরার পর আরও একটি খরচ অনেকের বাজেটকে বড় ধাক্কা দিতে পারে সেলফোনের বিল। প্যারিসের রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে ফোনে কথা বলা, রোমে বসে কয়েকটি ছবি আপলোড করা কিংবা মেলবোর্নে পৌঁছে মোবাইল ডেটা ব্যবহার বিদেশে এই সাধারণ কাজগুলিই বাড়িয়ে দিতে পারে মোবাইলের রোমিং খরচ। বিশেষ করে কানাডিয়ান পর্যটকদের ক্ষেত্রে বিদেশে গিয়ে নিজেদের নিয়মিত মোবাইল সংযোগ ব্যবহার করার আগে খরচ সম্পর্কে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
বিদেশে ভ্রমণের সময় নিজের কানাডিয়ান মোবাইল সংযোগ সচল রাখার সবচেয়ে সহজ উপায় হতে পারে রোমিং। কিন্তু সুবিধাজনক এই ব্যবস্থার জন্য গুনতে হতে পারে উল্লেখযোগ্য অর্থ। বিশেষজ্ঞদের মতে, দৈনিক রোমিং চার্জের ক্ষেত্রে কয়েক দিনের ভ্রমণও দ্রুত ব্যয়বহুল হয়ে উঠতে পারে। ধরা যাক, কোনও পর্যটক এক সপ্তাহের জন্য বিদেশে গেলেন। প্রতিদিন রোমিংয়ের জন্য আলাদা চার্জ দিতে হলে সাত দিনের মোট খরচ দাঁড়াতে পারে এমন একটি অঙ্কে, যা পুরো ভ্রমণ বাজেটের ওপরই অতিরিক্ত চাপ তৈরি করবে। অথচ আগেভাগে বিকল্প ব্যবস্থা নিলে একই পরিষেবা তুলনামূলক কম খরচে পাওয়া সম্ভব। এই কারণেই বিদেশে যাওয়ার আগে নিজের মোবাইল প্ল্যানটি খতিয়ে দেখা জরুরি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
কানাডার বড় টেলিকম অপারেটরগুলোও এখন বিদেশে দীর্ঘ সময় থাকার কথা মাথায় রেখে বিভিন্ন ধরনের রোমিং প্যাকেজ দিচ্ছে। প্রতিদিনের ভিত্তিতে নির্দিষ্ট রোমিং চার্জ নেওয়ার পরিবর্তে অনেক ক্ষেত্রে মাসিক রোমিং সুবিধা বেছে নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র বা মেক্সিকোর মতো জনপ্রিয় গন্তব্যে কিছু প্ল্যানে তুলনামূলক কম অতিরিক্ত খরচে মোবাইল পরিষেবা চালু রাখা সম্ভব। বিশেষজ্ঞদের মতে, যাঁরা কয়েক দিন বা তার বেশি সময় বিদেশে থাকবেন, তাঁদের ক্ষেত্রে এই ধরনের প্যাকেজ দৈনিক রোমিংয়ের তুলনায় বেশি সাশ্রয়ী হতে পারে। প্ল্যানহাব-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও নাদির মার্কোসের মতে, বিদেশে যাওয়ার আগে সামান্য প্রস্তুতি নিলেই রোমিংয়ের অপ্রত্যাশিত খরচ অনেকটাই কমানো সম্ভব। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, দৈনিক রোমিং ফি অনেক সময় অত্যন্ত ব্যয়বহুল হয়ে দাঁড়ায়। তাই ভ্রমণের আগে বিকল্প প্ল্যান খুঁজে দেখা গুরুত্বপূর্ণ।
মার্কোসের মতে, বড় অপারেটরগুলোর কিছু মাসিক রোমিং প্ল্যানে যুক্তরাষ্ট্র বা মেক্সিকোতে পরিষেবা ব্যবহারের জন্য মাসে প্রায় ৫ থেকে ১০ ডলার অতিরিক্ত খরচ হতে পারে। ফলে কয়েক দিনের ভ্রমণ হলেও দৈনিক রোমিংয়ের পরিবর্তে এই ধরনের প্ল্যানে চলে যাওয়া অনেক সময় অর্থ সাশ্রয়ের পথ হতে পারে। তবে শুধু খরচের হিসাব করলেই হবে না। নিজের বর্তমান মোবাইল প্ল্যানের শর্ত, বিদেশে কতদিন থাকবেন এবং কোথায় যাচ্ছেন এই তিনটি বিষয়ও বিবেচনা করতে হবে। কারণ সব রোমিং প্যাকেজ সব দেশে একই সুবিধা দেয় না।
বিদেশে গিয়ে মোবাইল খরচ কমানোর আর একটি উপায় হল ই-সিম ব্যবহার করা। বর্তমানে অনেক দেশেই স্থানীয় বা আন্তর্জাতিক ই-সিম পরিষেবা পাওয়া যায়। ভ্রমণকারীরা নিজেদের ফোনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ই-সিম কিনে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ডেটা পরিষেবা ব্যবহার করতে পারেন। এর ফলে কানাডিয়ান সিমে আন্তর্জাতিক রোমিং চালু রাখার প্রয়োজন অনেক ক্ষেত্রে কমে যায়। বিশেষ করে যাঁদের মূল প্রয়োজন ইন্টারনেট যেমন গুগল ম্যাপস ব্যবহার, মেসেজিং অ্যাপ, অনলাইন বুকিং কিংবা সামাজিক মাধ্যমে যোগাযোগ তাঁদের জন্য ই-সিম একটি কার্যকর বিকল্প হতে পারে। তবে এখানেও কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। সব ফোনে ই-সিম সুবিধা থাকে না এবং প্রতিটি ই-সিম প্যাকেজে কল বা এসএমএস পরিষেবা একইভাবে অন্তর্ভুক্ত থাকে না। ফলে কেনার আগে পরিষেবার ধরন এবং ফোনের সামঞ্জস্য পরীক্ষা করা জরুরি।
বিদেশে যাওয়ার আগে মোবাইল বিল নিয়ে অপ্রত্যাশিত সমস্যায় পড়তে না চাইলে কয়েকটি বিষয় আগে থেকেই দেখে নেওয়া উচিত। প্রথমত, নিজের বর্তমান মোবাইল প্ল্যানে আন্তর্জাতিক রোমিং অন্তর্ভুক্ত আছে কি না, তা যাচাই করা দরকার। দ্বিতীয়ত, গন্তব্য দেশের জন্য দৈনিক রোমিং চার্জ কত এবং মাসিক বা দীর্ঘমেয়াদি কোনও প্যাকেজ রয়েছে কি না, সেটিও তুলনা করা উচিত। তৃতীয়ত, নিজের প্রয়োজন বুঝে সিদ্ধান্ত নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। শুধু ফোনে কথা বলার প্রয়োজন হলে এক ধরনের প্ল্যান কার্যকর হতে পারে, আবার প্রচুর মোবাইল ডেটা ব্যবহার করলে ই-সিম বা স্থানীয় ডেটা প্ল্যান বেশি সাশ্রয়ী হতে পারে। এ ক্ষেত্রে প্ল্যানহাব-এর মতো তুলনামূলক প্ল্যাটফর্মও বিভিন্ন টেলিকম পরিষেবার দাম ও সুবিধা যাচাই করতে সাহায্য করতে পারে।
বিদেশে গিয়ে ফোনে রিং বাজলে স্বাভাবিকভাবেই অনেকে কলটি ধরে ফেলেন। কিন্তু সেই কলের প্রকৃত খরচ কত হতে পারে, তা না জেনে ফোন ব্যবহার করা ঝুঁকিপূর্ণ। একইভাবে মোবাইল ডেটা চালু রেখে ছবি, ভিডিও বা অ্যাপের ব্যাকগ্রাউন্ড ডেটা ব্যবহার হলেও অজান্তেই বাড়তে পারে বিল। তাই বিশেষজ্ঞদের মূল পরামর্শ বিদেশে যাওয়ার আগে রোমিংয়ের খরচ সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা নিন এবং সম্ভব হলে দৈনিক রোমিংয়ের বিকল্প খুঁজুন। কারণ ছুটি কাটিয়ে দেশে ফিরে প্যারিস, রোম কিংবা মেলবোর্নের সুন্দর স্মৃতির সঙ্গে যদি অস্বাভাবিক মোবাইল বিলও হাতে আসে, তা হলে সেই আনন্দ অনেকটাই মাটি হয়ে যেতে পারে। সামান্য পরিকল্পনা এবং সঠিক মোবাইল প্ল্যান বেছে নেওয়াই তাই বিদেশ ভ্রমণের খরচ নিয়ন্ত্রণে রাখার অন্যতম সহজ উপায়।

