টিকিট ও টোকেন উঠিয়ে দেওয়া নিয়ে সমালোচনার মুখে টিটিসি

টিকিট ও টোকেন উঠিয়ে দেওয়া নিয়ে সমালোচনার মুখে টিটিসি - the Bengali Times
পেমেন্ট টিকিট ও টোকেন ধাপে ধাপে বাতিল করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত ঘিরে টরন্টো ট্রানজিট কমিশন টিটিসি এর ভূমিকা নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল তা এবার আরও গভীর হল

পেমেন্ট টিকিট ও টোকেন ধাপে ধাপে বাতিল করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত ঘিরে টরন্টো ট্রানজিট কমিশন (টিটিসি)-এর ভূমিকা নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল, তা এবার আরও গভীর হল। এই বিতর্কিত সিদ্ধান্ত কীভাবে নেওয়া হয়েছিল, কারা এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং যাত্রীদের অব্যবহৃত ভাড়ার অর্থ ফেরত না দেওয়ার সিদ্ধান্তের পেছনে যুক্তিই বা কী ছিল এসব প্রশ্নের পূর্ণাঙ্গ তদন্তের পর সিটির ন্যায়পালের দেওয়া প্রতিবেদন গ্রহণের পক্ষে বৃহস্পতিবার ভোট দিয়েছে সিটি কাউন্সিল। ৬৫ পৃষ্ঠার ওই প্রতিবেদনে ন্যায়পাল কোয়মি আডো টিটিসির সিদ্ধান্ত গ্রহণের পুরো প্রক্রিয়া খতিয়ে দেখেছেন। প্রতিবেদনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণগুলোর একটি হল পেমেন্ট টিকিট ও টোকেন বাতিল করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্তটি আসলে ঠিক কে নিয়েছিলেন, তা হয়তো কোনোদিনই স্পষ্টভাবে জানা যাবে না। অর্থাৎ সিদ্ধান্তটির দায় নির্দিষ্ট করে কোনো ব্যক্তি বা কর্তৃপক্ষের ওপর চাপানোর মতো পর্যাপ্ত স্বচ্ছ নথি বা ব্যাখ্যা তদন্তে পাওয়া যায়নি। আর এই প্রশাসনিক অস্পষ্টতার সরাসরি আর্থিক প্রভাব পড়েছে যাত্রীদের ওপর। ন্যায়পালের মতে, টিটিসির সিদ্ধান্তের কারণে কিছু যাত্রী তাদের টিকিট ও টোকেনে জমা থাকা শত শত ডলার ব্যবহার করার সুযোগ হারিয়েছেন। শুধু ব্যক্তিগত যাত্রীই নন, অন্তত একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠান প্রায় ২২ হাজার ডলারের অব্যবহৃত ভাড়ার অর্থ হারিয়েছে, যা শেষ পর্যন্ত কার্যত অকার্যকর হয়ে গেছে।

২০২৪ সালের ২৪ অক্টোবর টিটিসি যখন পেমেন্ট টিকিট ও টোকেন বাতিলের বিষয়ে প্রাথমিক ঘোষণা দেয়, তার পর থেকেই ন্যায়পালের দফতরে একের পর এক অভিযোগ আসতে শুরু করে। ঘোষণায় পুরনো ভাড়া ব্যবস্থার অবসানের কথা জানানো হলেও, অব্যবহৃত টিকিট বা টোকেনের বিনিময়ে অর্থ ফেরত, ক্রেডিট কিংবা অন্য কোনও বিকল্প দেওয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়নি। প্রথমে যে সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছিল, পরে টিটিসি তা আরও ছয় মাস বাড়িয়ে দেয়। কিন্তু সময় বাড়ানোর পরও অভিযোগ থামেনি। অনেক যাত্রী প্রশ্ন তোলেন তারা যে অর্থ দিয়ে টিকিট বা টোকেন কিনেছিলেন, সেই অর্থের বিনিময়ে পরিষেবা পাওয়ার সুযোগ না থাকলে তাঁদের টাকা ফেরত দেওয়া হবে না কেন? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই ন্যায়পালের দফতর টিটিসির সঙ্গে যোগাযোগ করে। বিশেষ করে রিফান্ড, ক্রেডিট বা বিনিময়ের ব্যবস্থা কেন করা হয়নি, তার ব্যাখ্যা চাওয়া হয়। কিন্তু তদন্তে দেখা যায়, টিটিসি এই বিষয়ে সন্তোষজনক ও স্পষ্ট উত্তর দিতে পারেনি।

- Advertisement -

ন্যায়পালের তদন্তে সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন উঠেছে সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বচ্ছতা নিয়ে। টিটিসির কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল রিফান্ড না দেওয়ার সিদ্ধান্ত কে নিয়েছিলেন এবং সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা কর্তৃপক্ষের যথাযথ ক্ষমতা ছিল কি না। কিন্তু ন্যায়পালের দফতর এমন কোনও স্পষ্ট উত্তর পায়নি, যা থেকে সিদ্ধান্তটির চূড়ান্ত দায় নির্দিষ্ট করা সম্ভব। ফলে প্রতিবেদনের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের নেপথ্যে ঠিক কে ছিলেন, তা হয়তো ভবিষ্যতেও নিশ্চিতভাবে জানা সম্ভব হবে না। এই জায়গাটিই পুরো বিতর্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক। কারণ কোনও সরকারি বা জনপরিষেবা প্রদানকারী সংস্থা যখন সাধারণ মানুষের অর্থের সঙ্গে যুক্ত কোনও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয়, তখন সেই সিদ্ধান্তের প্রক্রিয়া, দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি এবং অনুমোদনের স্তর স্পষ্ট থাকা প্রত্যাশিত। ন্যায়পালের প্রতিবেদনে টিটিসির সেই প্রক্রিয়াতেই ঘাটতির বিষয়টি সামনে এসেছে।

প্রাথমিক পর্যায়ে টিটিসির কাছ থেকে প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা না পাওয়ার পর ন্যায়পাল কোয়মি আডো ২০২৫ সালের ৬ আগস্ট আনুষ্ঠানিকভাবে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শুরু করেন। তদন্তের সময় বর্তমান ও সাবেক টিটিসি কর্মী, সংস্থার নির্বাহী ও বোর্ড সদস্যদের সঙ্গে কথা বলা হয়। একই সঙ্গে অভিযোগকারী যাত্রীদের বক্তব্যও নেওয়া হয়। অর্থাৎ শুধু টিটিসির অভ্যন্তরীণ নথির ওপর নির্ভর না করে সিদ্ধান্ত গ্রহণের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন পক্ষের বক্তব্য সংগ্রহ করা হয়েছিল। তবে ন্যায়পালের তদন্তের পরিধি ছিল নির্দিষ্ট। টিকিট ও টোকেন বাতিল করার মূল নীতিগত সিদ্ধান্তটি সঠিক ছিল কি না, কিংবা রিফান্ড বা বিনিময়ের ব্যবস্থা আদৌ চালু করা উচিত ছিল কি না এই নীতিগত প্রশ্নের বিচার তদন্তের অংশ ছিল না। বরং মূলত সিদ্ধান্তটি কীভাবে নেওয়া হয়েছিল এবং সেই প্রক্রিয়ায় যথেষ্ট স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি ছিল কি না, সেটিই খতিয়ে দেখা হয়।

দীর্ঘ তদন্তের শেষে ন্যায়পাল টিটিসি বোর্ড ও কর্মীদের জন্য মোট আটটি সুপারিশ করেন। সুপারিশগুলোর মূল লক্ষ্য ছিল ভবিষ্যতে এ ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে আরও বেশি স্বচ্ছতা, দায়িত্ব নির্ধারণ এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা। টিটিসি বোর্ডের চেয়ারম্যান এবং সিটি কাউন্সিলর জামাল মেয়ার্স ন্যায়পালের প্রতিবেদনের জন্য তাঁকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। শুধু প্রতিবেদন গ্রহণ করাই নয়, ন্যায়পালের দেওয়া আটটি সুপারিশই গ্রহণ করেছে টিটিসি বোর্ড। সেই সঙ্গে সুপারিশগুলো বাস্তবায়নের জন্য প্রতিবেদনে যে সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে, সেটিও মেনে নেওয়া হয়েছে।

পুরনো পেমেন্ট টিকিট ও টোকেন বাতিলের প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এখন হয়তো আর ফিরিয়ে নেওয়া হবে না। কিন্তু এই ঘটনায় যে প্রশ্নটি সামনে এসেছে, তা শুধু পুরনো ভাড়া ব্যবস্থার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। জনগণের অর্থে পরিচালিত একটি গুরুত্বপূর্ণ ট্রানজিট সংস্থা কোনও পরিষেবা বা ভাড়া ব্যবস্থা বন্ধ করলে, সেই ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত অব্যবহৃত অর্থ কীভাবে নিষ্পত্তি হবে তা আগে থেকেই স্পষ্ট থাকা প্রয়োজন। বিশেষ করে যখন ব্যক্তিগত যাত্রীর পাশাপাশি প্রতিষ্ঠান ও অলাভজনক সংস্থারও উল্লেখযোগ্য অর্থ আটকে থাকে।

ন্যায়পালের প্রতিবেদনে উঠে আসা তথ্য বলছে, এখানে সমস্যা শুধু টাকা ফেরত না দেওয়ার সিদ্ধান্তে নয়; বরং সেই সিদ্ধান্ত কীভাবে নেওয়া হয়েছিল, কে দায়ী ছিলেন এবং কেন যাত্রীদের জন্য রিফান্ড বা অন্য কোনও বিকল্প রাখা হয়নি এসব প্রশ্নের যথেষ্ট স্বচ্ছ উত্তর না থাকার মধ্যেও রয়েছে। সিটি কাউন্সিলের বৃহস্পতিবারের ভোটের পর এখন নজর থাকবে টিটিসি কীভাবে ন্যায়পালের আট দফা সুপারিশ বাস্তবায়ন করে তার দিকে। কারণ এই ঘটনার সবচেয়ে বড় শিক্ষা হল জনসাধারণের অর্থ ও পরিষেবার সঙ্গে যুক্ত সিদ্ধান্তে শুধু সিদ্ধান্ত নেওয়াই যথেষ্ট নয়, সেই সিদ্ধান্তের পেছনে যুক্তি, ক্ষমতার সীমা এবং দায়বদ্ধতাও স্পষ্টভাবে নথিভুক্ত থাকা জরুরি।

সোহেলি আহমেদ সুইটি : লোকাল জার্নালিজম ইনিশিয়েটিভ রিপোর্টার

- Advertisement -

Related Articles

Latest Articles