
গ্রীষ্মের মরশুমে টরন্টোবাসীর জন্য নতুন করে সতর্কবার্তা জারি করেছে টরন্টো পাবলিক হেলথ। ২০২৬ সালে শহরে ওয়েস্ট নাইল ভাইরাসের সংক্রমণ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। মানবদেহে সংক্রমণ শনাক্ত হওয়ার পর বাসিন্দাদের মশার কামড় থেকে নিজেদের সুরক্ষিত রাখার পরামর্শ দিয়েছে স্বাস্থ্য দফতর। ওয়েস্ট নাইল ভাইরাস মূলত আক্রান্ত মশার কামড়ের মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করে। টরন্টোতে প্রতি বছর গ্রীষ্মকালে মশার উপস্থিতি এবং ভাইরাসের সংক্রমণ নিয়ে নজরদারি চালানো হয়। টরন্টো পাবলিক হেলথ জানিয়েছে, জুনের মাঝামাঝি থেকে সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি পর্যন্ত নিয়মিত মশা সংগ্রহ করে সেগুলির মধ্যে ওয়েস্ট নাইল ভাইরাসের উপস্থিতি পরীক্ষা করা হয়। শহরজুড়ে প্রতি সপ্তাহে ২২টি ফাঁদ বসিয়ে মশা সংগ্রহ করা হয়। ২০২৬ সালের ১৭ জুলাই টরন্টো পাবলিক হেলথ জানিয়েছিল, শহরে প্রথমবারের মতো একটি মশার নমুনায় ওয়েস্ট নাইল ভাইরাসের উপস্থিতি নিশ্চিত হয়েছে। অর্থাৎ, ভাইরাসটি যে টরন্টোর মশার মধ্যে সক্রিয় রয়েছে, তার প্রমাণ ইতিমধ্যেই মিলেছে।
স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের মতে, ওয়েস্ট নাইল ভাইরাসে আক্রান্ত হলেই যে প্রত্যেকের গুরুতর অসুস্থতা হবে, এমন নয়। বহু সংক্রমিত ব্যক্তির কোনও উপসর্গই দেখা যায় না। আবার কারও ক্ষেত্রে জ্বর, মাথাব্যথা, শরীরে ব্যথা, বমিবমি ভাব, বমি কিংবা ত্বকে র্যাশের মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে সংক্রমণ গুরুতর স্নায়বিক অসুস্থতার কারণও হতে পারে। বিশেষ করে বয়স্ক মানুষ এবং যাঁদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল, তাঁদের ক্ষেত্রে গুরুতর অসুস্থতার ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি। আক্রান্ত মশার কামড়ের পর সাধারণত দুই থেকে ১৪ দিনের মধ্যে উপসর্গ দেখা দিতে পারে। তাই গ্রীষ্মকালে মশার কামড়ের পাশাপাশি জ্বর, মাথাব্যথা, বমি বা বমিবমি ভাব, শরীরে ব্যথা, ত্বকে র্যাশ, ঘাড় শক্ত হয়ে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিলে বিষয়টি অবহেলা না করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
ওয়েস্ট নাইল ভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায় হল মশার কামড় এড়ানো। বিশেষ করে ভোর ও সন্ধ্যার সময় মশার উপদ্রব বেশি থাকায় ওই সময় বাইরে থাকলে অতিরিক্ত সতর্ক হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। বাইরে বেরোলে হালকা রঙের পোশাক, লম্বা হাতার জামা এবং লম্বা প্যান্ট পরার পরামর্শ দিয়েছে স্বাস্থ্য দফতর। পাশাপাশি হেলথ কানাডা অনুমোদিত ইনসেক্ট রিপেলেন্ট ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে যে কোনও রিপেলেন্ট ব্যবহারের আগে প্যাকেটের নির্দেশিকা মেনে চলতে হবে। শুধু শরীর ঢেকে রাখলেই হবে না, মশার বংশবিস্তার বন্ধ করাও গুরুত্বপূর্ণ। বাড়ির আশপাশে জমে থাকা পানি মশার প্রজননের জায়গা হয়ে উঠতে পারে। তাই বালতি, ফুলের টব, খেলনা, পাত্র, পুলের কভার কিংবা এমন কোনও জিনিসে পানি জমে থাকলে তা নিয়মিত খালি করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। গাটার বা ড্রেনেজ ব্যবস্থাতেও যাতে পানি জমে না থাকে, সেদিকে নজর রাখা প্রয়োজন। একইসঙ্গে বাড়ির দরজা ও জানালায় লাগানো মশা প্রতিরোধী স্ক্রিন বা জাল ঠিকঠাক রয়েছে কিনা, তাও পরীক্ষা করতে বলা হয়েছে।
টরন্টো শহর কর্তৃপক্ষ শুধু বাসিন্দাদের ব্যক্তিগত সতর্কতার উপর নির্ভর করছে না। মশার সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে শহরের বিভিন্ন এলাকায় লার্ভিসাইড ব্যবহার করা হচ্ছে। টরন্টো পাবলিক হেলথ-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মশা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির দ্বিতীয় ধাপ জুলাইয়ের দ্বিতীয় সপ্তাহের কাছাকাছি শুরু হয়ে আগস্টের মাঝামাঝি পর্যন্ত চলার কথা রয়েছে। এই কর্মসূচির লক্ষ্য বিশেষ করে কিউলেক্স প্রজাতির মশার সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করা, কারণ এই অঞ্চলে ওয়েস্ট নাইল ভাইরাস ছড়ানোর ক্ষেত্রে এই মশাগুলি গুরুত্বপূর্ণ বাহক।
স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের বার্তার মূল কথা, ওয়েস্ট নাইল ভাইরাসের উপস্থিতি নিয়ে অযথা আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। টরন্টোতে সংক্রমণের সামগ্রিক ঝুঁকি কম হলেও মশার কামড় এড়ানোই ঝুঁকি কমানোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপায়। তবে গ্রীষ্মের মরশুমে মশার সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সংক্রমণের সম্ভাবনাও তৈরি হয়। তাই বাইরে বেরোনোর সময় শরীর ঢেকে রাখা, প্রয়োজনমতো রিপেলেন্ট ব্যবহার করা, ভোর ও সন্ধ্যায় বাড়তি সতর্ক থাকা এবং বাড়ির আশপাশে জমা পানি সরিয়ে ফেলা এই কয়েকটি সহজ অভ্যাসই সংক্রমণের ঝুঁকি অনেকটাই কমাতে পারে।
টরন্টোতে ওয়েস্ট নাইল ভাইরাসের উপস্থিতি নতুন কোনও ঘটনা নয়। ২০২৪ সালে শহরে ১৪টি নিশ্চিত মানব সংক্রমণের খবর পাওয়া গিয়েছিল এবং ২০২৫ সালে সেপ্টেম্বরের শুরু পর্যন্ত ২৬টি মানব সংক্রমণ রিপোর্ট হয়েছিল। ফলে ২০২৬ সালের গ্রীষ্মেও নিয়মিত নজরদারি এবং ব্যক্তিগত সতর্কতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

