
কানাডার লিবারেল সরকারের সাম্প্রতিক একাধিক বড় অঙ্কের ব্যয়ের ঘোষণা ঘিরে শুরু হয়েছে নতুন বিতর্ক। চলতি গ্রীষ্মে সরকার যে পরিমাণ অর্থ ব্যয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তার বিস্তারিত হিসাব এবং অর্থ কোথায়, কীভাবে ও কতদিন ধরে খরচ হবে সেই তথ্য যথেষ্ট স্পষ্ট নয় বলে দাবি করছেন অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকদের একাংশ। তাঁদের আশঙ্কা, নিয়মিত বাজেট প্রক্রিয়ার বাইরে এভাবে একের পর এক বড় ঘোষণা দেওয়া হলে সরকারের প্রকৃত আর্থিক অবস্থান সম্পর্কে সাধারণ মানুষের কাছে পরিষ্কার ধারণা তৈরি করা কঠিন হয়ে পড়তে পারে। তবে সরকারের পক্ষ থেকে এর পাল্টা যুক্তি হল, বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে অস্থিরতা, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং পরিবর্তিত ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির মোকাবিলায় সরকারকে অপেক্ষা না করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হচ্ছে। সেই কারণেই নতুন ব্যয়ের প্রতিশ্রুতিগুলোকে সবসময় প্রচলিত বাজেট চক্রের সঙ্গে মিলিয়ে ঘোষণা করা সম্ভব নয় বলে লিবারেল সরকারের অবস্থান।
এই বিতর্কের মধ্যেই ডেজারডিন্সের উপপ্রধান অর্থনীতিবিদ র্যান্ডাল বার্টলেট ১৬ জুলাই একটি বিশ্লেষণধর্মী নোট প্রকাশ করেন। গত এপ্রিলের অর্থনৈতিক হালনাগাদ প্রতিবেদনের পর ফেডারেল সরকার যেসব নতুন ব্যয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, সেগুলোকে একত্র করে তিনি এই হিসাব তৈরি করেছেন। বার্টলেটের হিসাব অনুযায়ী, এপ্রিলের সর্বশেষ আর্থিক ও অর্থনৈতিক হালনাগাদের পর অটোয়া আগামী এক দশকে ৪ হাজার কোটি ডলারেরও বেশি নতুন ব্যয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তাঁর এই হিসাব প্রকাশের সময় পর্যন্ত সরকারের আরও কয়েকটি ঘোষণা সম্পূর্ণভাবে বিশ্লেষণের আওতায় আসেনি। ফলে প্রকৃত অঙ্ক আরও বাড়তে পারে বলেও ইঙ্গিত রয়েছে। এখানেই মূল প্রশ্নটি তুলছেন বিশ্লেষকরা। সরকারের ঘোষণা যত বাড়ছে, ততই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে সেই অর্থের প্রকৃত আর্থিক প্রভাব বোঝা। শুধু একটি প্রকল্পে কত কোটি ডলার বরাদ্দ করা হচ্ছে তা জানলেই পুরো ছবিটি স্পষ্ট হয় না। বরং সেই অর্থ কোন অর্থবছরে খরচ হবে, কত বছর ধরে চলবে এবং শেষ পর্যন্ত সরকারের নিজস্ব কোষাগার থেকে কতটা অর্থ বেরোবে সেটিও জানা প্রয়োজন।
বার্টলেটের বিশ্লেষণে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে ব্যয়ের কাঠামো নিয়ে স্বচ্ছতার প্রশ্ন। তাঁর মতে, সাম্প্রতিক ঘোষণাগুলোর ক্ষেত্রে অনেক সময় ব্যয়ের সময়সীমা পুরোপুরি পরিষ্কার নয়। একই সঙ্গে ঘোষিত অর্থের কতটা সরাসরি ফেডারেল সরকারের ব্যয় এবং কতটা প্রদেশ, ক্রাউন কর্পোরেশন বা বেসরকারি খাতের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হবে, সেটিও সবসময় স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হচ্ছে না। এই বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ একটি প্রকল্পের মোট ঘোষিত মূল্য আর ফেডারেল সরকারের প্রকৃত আর্থিক দায় দুটি এক জিনিস নয়। কোনও প্রকল্পে কেন্দ্রীয় সরকার, প্রাদেশিক সরকার এবং বেসরকারি সংস্থা যৌথভাবে অর্থ দিলে মোট প্রকল্প ব্যয়ের পুরোটাই ফেডারেল সরকারের ঘাড়ে পড়ে না। ফলে ঘোষণার সময় মোট অর্থের অঙ্ক সামনে এলেও সরকারের প্রকৃত দায় বুঝতে হলে অর্থের উৎস এবং ভাগাভাগির কাঠামো জানা জরুরি। বার্টলেটের মতে, এই অস্পষ্টতাই ফেডারেল সরকারের ব্যয়ের প্রতিশ্রুতি নিয়ে যৌক্তিক উদ্বেগ তৈরি করছে। তাঁর বক্তব্যের মূল সুর হল সরকার বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয়ের ঘোষণা করছে, কিন্তু সেই ঘোষণাগুলোর দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক প্রভাব সম্পর্কে নাগরিকদের সামনে পর্যাপ্ত তথ্য সবসময় থাকছে না।
কানাডার আর্থিক ব্যবস্থায় বাজেট সাধারণত সরকারের আয়, ব্যয়, ঘাটতি এবং ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক পরিকল্পনার একটি সামগ্রিক চিত্র তুলে ধরে। সেই জায়গা থেকেই বিশ্লেষকদের প্রশ্ন, যদি বাজেটের বাইরে একের পর এক বড় আর্থিক প্রতিশ্রুতি ঘোষণা করা হয়, তাহলে সরকারের সামগ্রিক ব্যয়ের ছবি বোঝার জন্য নাগরিকদের অপেক্ষা করতে হবে পরবর্তী বাজেট বা আর্থিক হালনাগাদের জন্য। বার্টলেটের বক্তব্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক ঘোষণাগুলোর ক্ষেত্রে এমন পরিস্থিতিই তৈরি হয়েছে। তাঁর মতে, শরতের বাজেট প্রকাশের আগে কানাডীয় নাগরিকদের পক্ষে বোঝা কঠিন ছিল সরকারের সাম্প্রতিক ঘোষণাগুলোর সম্মিলিত আর্থিক অর্থ আসলে কী। অর্থাৎ, কোনও একটি ঘোষণাকে আলাদা করে দেখলে সেটি হয়তো সরকারের নির্দিষ্ট নীতিগত লক্ষ্য পূরণের উদ্যোগ। কিন্তু একই সময়ের মধ্যে এমন একাধিক ঘোষণা জমা হলে সেগুলোর সম্মিলিত প্রভাব সরকারের ভবিষ্যৎ ঘাটতি, ঋণ এবং ব্যয়ের ওপর কতটা পড়বে, সেটিই হয়ে ওঠে বড় প্রশ্ন।
অন্যদিকে লিবারেল সরকারের অবস্থান সম্পূর্ণ ভিন্ন। সরকারের যুক্তি, বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক সময়ের মতো নয়। বৈশ্বিক অর্থনীতিতে দ্রুত পরিবর্তন, বাণিজ্যিক অনিশ্চয়তা এবং আন্তর্জাতিক বাজারের চাপের মধ্যে কানাডাকে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান ধরে রাখতে হলে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন। এই যুক্তির ভিত্তিতেই সরকার বলছে, প্রতিটি নতুন উদ্যোগের জন্য পরবর্তী নিয়মিত বাজেট পর্যন্ত অপেক্ষা করা বাস্তবসম্মত নয়। অর্থনৈতিক পরিস্থিতি দ্রুত বদলালে সরকারের প্রতিক্রিয়াও দ্রুত হওয়া দরকার। এই অবস্থান থেকে দেখলে, সাম্প্রতিক ব্যয়ের ঘোষণাগুলোকে শুধু বাজেটের বাইরে ব্যয় হিসেবে দেখলে পুরো পরিস্থিতি ধরা পড়ে না। সরকারের কাছে এগুলো অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলা, বিনিয়োগ উৎসাহিত করা এবং বিভিন্ন খাতে দ্রুত সহায়তা দেওয়ার হাতিয়ারও হতে পারে। তবে সমালোচকদের প্রশ্ন হল, দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রয়োজন থাকলেও তার অর্থ এই নয় যে সরকারের আর্থিক প্রতিশ্রুতির বিস্তারিত হিসাব প্রকাশের প্রয়োজন নেই। বরং বড় অঙ্কের অর্থের ক্ষেত্রে দ্রুত ঘোষণার পাশাপাশি স্পষ্ট আর্থিক তথ্য প্রকাশ করাটাই আরও গুরুত্বপূর্ণ।
এই বিতর্কের মধ্যে অর্থমন্ত্রী ফ্রাসোয়াঁ-ফিলিপ শ্যাম্পেইনের মুখপাত্র জন ফ্রাগোস বার্টলেটের হিসাব নিয়ে সরাসরি কোনও অবস্থান জানাননি। বিশেষ করে বার্টলেট যে ৪ হাজার কোটি ডলারের বেশি নতুন ব্যয়ের প্রতিশ্রুতির হিসাব দিয়েছেন, সেই অঙ্কটি সঠিক কি না এ বিষয়ে গণমাধ্যমের প্রশ্নের জবাবেও নির্দিষ্ট কোনও মন্তব্য পাওয়া যায়নি। ফলে আপাতত বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে দুটি বিষয় সরকারের ঘোষিত ব্যয়ের প্রকৃত পরিমাণ এবং সেই ব্যয়ের আর্থিক কাঠামোর স্বচ্ছতা।
লিবারেল সরকারের সাম্প্রতিক ব্যয়ের ঘোষণা এখন শুধু কোনও নির্দিষ্ট প্রকল্প বা নীতির প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে সরকারের আর্থিক ব্যবস্থাপনা এবং জনগণের কাছে সেই ব্যবস্থাপনার স্বচ্ছতার প্রশ্ন। শরতের বাজেট তাই এই বিতর্কের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। সেখানে সরকার যদি প্রতিশ্রুত ব্যয়ের পূর্ণাঙ্গ হিসাব, সময়সীমা, ফেডারেল সরকারের প্রকৃত আর্থিক দায় এবং সম্ভাব্য ঘাটতির ওপর প্রভাব স্পষ্টভাবে তুলে ধরে, তাহলে অনেক প্রশ্নের উত্তর মিলতে পারে। আর যদি ঘোষিত বিপুল ব্যয়ের পূর্ণাঙ্গ আর্থিক চিত্র সেখানে স্পষ্ট না হয়, তাহলে সরকারের ব্যয় পরিকল্পনা নিয়ে সমালোচনা আরও তীব্র হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। মূল প্রশ্নটি শেষ পর্যন্ত একটাই যে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার সময়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন ঠিকই, কিন্তু সেই দ্রুততার সঙ্গে আর্থিক স্বচ্ছতাও কি একই গতিতে নিশ্চিত করতে পারছে অটোয়া?

