
উত্তর আমেরিকার ব্যাটারি সরবরাহ শৃঙ্খলের কেন্দ্র হয়ে ওঠার স্বপ্ন দেখছে কুইবেক। সেই স্বপ্নকে ঘিরেই গড়ে উঠছিল বেকাঙ্কুর শিল্পকেন্দ্র। কিন্তু বৈদ্যুতিক গাড়ির বৈশ্বিক বাজারে মন্দা দেখা দেওয়ায় সেখানে বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে। স্থগিত হয়ে গেছে ব্যাটারি উৎপাদনের দুইটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের পরিকল্পনা, যা সরাসরি প্রভাব ফেলছে কুইবেকের উচ্চাকাঙ্ক্ষী ইভি (EV) ইকোসিস্টেমে।
কুইবেকের অর্থমন্ত্রী ক্রিস্টিন ফ্রেশেট বৃহস্পতিবার নিশ্চিত করেছেন যে, বেকাঙ্কুরে সিটি ব্যাটারি কারখানার সম্প্রসারণ প্রকল্প আপাতত স্থগিত করা হয়েছে। পাশাপাশি যে সহকারী কারখানা থেকে কাঁচামাল সরবরাহ করার কথা ছিল, সেই পরিকল্পনাও বাতিল করা হয়েছে।
তিনি বলেন, “ব্যাটারি সরবরাহ শৃঙ্খলে বৈশ্বিক শ্লথতার স্পষ্ট প্রভাব এটি। আমাদের প্রকল্পের ওপর এর প্রভাব পড়ছে, কারণ এই শিল্পই আমাদের ভবিষ্যৎ বিনিয়োগের হৃদপিণ্ড। তবে মন্থরতা মানে থেমে যাওয়া নয়।”
অর্থমন্ত্রীর এই মন্তব্য স্পষ্ট করে যে কুইবেক সরকারের কাছে বিষয়টি শুধু অর্থনৈতিক নয়, বরং কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
জেনারেল মোটরস (GM) কানাডার একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন যে, কোম্পানি তাদের ক্যাথোড অ্যাক্টিভ ম্যাটেরিয়াল (CAM) উৎপাদন প্রকল্পের দ্বিতীয় ধাপ স্থগিত করেছে। ‘আল্টিয়াম ক্যাম’ নামে পরিচিত এই প্রকল্পটি জিএম ও দক্ষিণ কোরিয়ার পস্কোর অংশীদারিত্বে গড়ে উঠছে।
প্রথম ধাপের কারখানা নির্মাণ ইতোমধ্যে চলছে এবং ৬০০ মিলিয়ন ডলারের এ প্ল্যান্টের ২০২৬ সালে উৎপাদন শুরু করার কথা। কিন্তু দ্বিতীয় ধাপে ক্যাথোড উপাদানের উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধির পরিকল্পনা এবং সেসব তৈরির মূল কাঁচামালের উৎপাদন লাইনের সম্প্রসারণ পুরোপুরি স্থগিত হয়েছে। জিএমের মুখপাত্র মেরি বিনেট বলেন, “চলমান বাজার পরিস্থিতির পরিবর্তনের কারণে আমরা দ্বিতীয় ধাপের কাজ পিছিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।”
এই সিদ্ধান্ত সরাসরি আঘাত করেছে ব্রাজিলিয়ান খনি জায়ান্ট ভেল এসএ-কে। কোম্পানিটি বেকাঙ্কুরে একটি বড় নিকেল সালফেট কারখানা নির্মাণের পরিকল্পনা করেছিল, যার প্রধান ক্রেতা হওয়ার কথা ছিল জিএমের আল্টিয়াম প্রকল্প। জিএমের দ্বিতীয় ধাপ স্থগিত হওয়ায় ভেল তাদের পুরো প্রকল্পই বাতিল করেছে।
ভেল বেস মেটালস এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, “জিএমের কুইবেক প্ল্যান্টে আপাতত নিকেল সালফেটের প্রয়োজন নেই। তবে জিএমের উত্তর আমেরিকান সরবরাহ শৃঙ্খলে কানাডিয়ান নিকেল সরবরাহে আমাদের অংশীদারিত্ব অব্যাহত থাকবে।”
বিশ্বব্যাপী ইভি বিক্রির গতি কিছুটা কমে যাওয়ায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগ পরিকল্পনা পুনর্বিবেচনা করছে। ব্যাটারি উৎপাদন খরচ, কাঁচামালের মূল্য, সুদের হার বৃদ্ধি এবং বাজারে ইভির গ্রহণযোগ্যতায় সাময়িক মন্থরতা সব মিলিয়ে বিনিয়োগকারীরা এখন আরও সতর্ক।
কুইবেক দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছে যে তারা উত্তর আমেরিকার ব্যাটারি সাপ্লাই চেইনের কেন্দ্রস্থল হবে। তাদের প্রাকৃতিক সম্পদ, বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী বিধান এবং সরকারি প্রণোদনা এ স্বপ্নকে বাস্তবমুখী করেছিল। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি দেখাচ্ছে, বাজারের সামান্য পরিবর্তনই বড় প্রকল্পগুলোকে ঝুঁকিতে ফেলতে পারে।
অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন, স্বল্পমেয়াদে কিছু ধাক্কা থাকলেও দীর্ঘমেয়াদে ব্যাটারি শিল্প এগিয়ে যাবে। জিএমের প্রথম ধাপের কাজ চলছে এটাই তাদের কাছে আশার জায়গা। বেকাঙ্কুর এখনো কুইবেকের ইভি ভবিষ্যতের কেন্দ্র বলেই মনে করছেন তিনি।

