10.3 C
Toronto
রবিবার, অক্টোবর ১৭, ২০২১

একটি শোকার্ত বিষণ্ণ কানাডা ডে

কানাডা শোকে মোহ্যমান

আজ ০১ জুলাই। কানাডা ডে। কানাডার সবচে বড় সেলিব্রেশন দিবস। এই দিনে পুরো কানাডা সেজে ওঠে লাল-শাদা রঙের আবহে। কানাডার পতাকার রঙের সঙ্গে মিলিয়ে। আমি কানাডায় থিতু হবার পর থেকে দেখে আসছি, এই দিনে রাজধানী অটোয়া হয়ে ওঠে লোকে লোকারণ্য। এমনিতে এতো মানুষের সমাগম অটোয়ায় সচরাচর দেখা যায় না। এই দিনে নানান বয়েসী নারী-পুরুষ শিশুকিশোরের পরনে থাকে লাল কিংবা শাদা কিংবা লাল-শাদার কম্বিনেশনে তৈরি পোশাক। আমি শার্লি এবং নদীও এই দিনে লাল-শাদায় নিজেকে জড়িয়ে নিতাম। নদীর খুব প্রিয় ছিলো এই দিনটা। সারাদিনমান সে তার বন্ধুদের সঙ্গে মেতে থাকতো। অটোয়ার ডাউনটাউনে স্থাপিত হতো মূল অনুষ্ঠান মঞ্চ। পুরো কানাডায় যতো বিখ্যাত শিল্পী আছেন তারা সবাই এই মঞ্চে দুপুর থেকে রাত অবধি নৃত্যগীতে মাতিয়ে রাখতো হাজার হাজার মানুষকে। রাত দশটার পরে শুরু হতো ফায়ারওয়ার্কস্‌ বা আতসবাজির উৎসব। অটোয়ার পার্লেমেন্ট ভবনকে কেন্দ্র করে প্রায় আধ ঘন্টার এই আতসবাজির উৎসবটির জন্যে অটোয়াবাসীর কী প্রতীক্ষাই না প্রত্যক্ষ্য করেছি। সকাল ১১টার পর থেকে আমিও ডাউনটাউনের বিশাল উৎসবকেন্দ্রে উপস্থিত থাকতাম। প্রতি বছর।

কোভিদ ঊনিশ আক্রান্ত পরিবর্তিত পৃথিবীতে সব কিছুই উলোটপালোট হয়ে গেছে। গত বছর এই দিনটি উদযাপিত হয়েছে ভার্চুয়ালি। এবছর সেটাও হচ্ছে না। সরকারী উদ্যোগে আয়োজিত সমস্ত অনুষ্ঠানমালা বাতিল ঘোষিত হয়েছে একটা অতি দুঃখজনক ঘটনার কারণে।

অতিসম্প্রতি কানাডার ব্রিটিস কলাম্বিয়া প্রভিন্সের ভ্যাংকুভারে একটি প্রাচীন পরিত্যক্ত আবাসিক স্কুল প্রাঙ্গণে ২১৫জন শিশুকিশোরের দেহাবশেষ আবিস্কারের ঘটনায় থমকে গিয়েছে কানাডা। হতভাগ্য এই শিশুরা কানাডার আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সদস্য। উন্নত মানবিক রাষ্ট্র হিশেবে দুনিয়াব্যাপি পরিচিত কানাডায় আদিবাসীরা ইন্ডিয়ান বা ফার্স্ট নেশন বা নেশন পিপল বা ইন্ডেজিনাস হিশেবে চিহ্নিত। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি, চিরকালই এরা অবহেলার শিকার।

ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দৃশ্যমান হয়–অষ্টাদশ শতকের শেষ থেকে উনবিংশ শতকের শুরুর দিকে কানাডা নামের দেশটিতে দলে দলে ইউরোপীয়রা আসতে শুরু করে। অন্য দেশ থেকে এসে তারা এই দেশটিতে সেটলার হিশেবে স্থায়ী বসতি গড়ার চেষ্টা করে। তখন তারা স্থানীয় আদিবাসীদের (রেড ইন্ডিয়ান) সঙ্গে প্রায়শই সংঘাতে জড়িয়ে পরে। এরকম সংঘাতে পরাজয় বরণ করতে হতো আদীবাসীদেরই। কারণ, সহজ সরল শান্তিপ্রিয় বোকাসোকা এইসব আদিবাসীর হাতে হাতে কোনো অস্ত্র ছিল না। কিন্তু ইউরোপীয়ান দখলদারদের হাতে থাকতো আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র। এইসব দখলদার তথাকথিত শিক্ষিত এই শ্রেণিটি ছিলো চরম রেসিস্ট অমানবিক এবং উদ্ধত। তাদের আক্রমনে পিছু হটতে বাধ্য হয় আদীবাসীরা।

এভাবে ধীরে ধীরে নিজ দেশে উৎখাত হতে হতে আদিবাসীরা এক পর্যায়ে নিজভূমে পরবাসী হয়ে ওঠে! দখলদারদের আক্রমনে কোনঠাঁসা হতে হতে এক পর্যায়ে আদিবাসীরা কপালে ‘ইন্ডিয়ান’ বা ‘ইন্ডেজিনাস’ তকমা নিয়ে অমানবিক জীবন যাপনে বাধ্য ও অভ্যস্ত হয়ে পড়ে!

ভিনদেশী হানাদার দখলদাররা এক পর্যায়ে মেতে ওঠে ভয়ংকর পরিকল্পনার বাস্তবায়নে। সেই পরিকল্পনার অংশ হিশেবে আদিবাসী পরিবারের শিশুকিশোরদের জোর করে ধরে এনে, পরিবার থেকে তাদের বিচ্ছিন্ন করে, ক্যাথলিক আবাসিক স্কুলগুলোয় তাদের ভর্তি করা হতো। পরবর্তীতে প্রাচীন ক্যাথলিক আবাসিক স্কুলগুলোয় ভর্তি হওয়া শিশুকিশোরদের ভাগ্যে কী ঘটতো তা আর জানতে পেতো না হতভাগ্য পরিবারগুলো।

ভ্যাংকুভারে ২১৫জন আদিবাসী শিশুকিশোরের দেহাবশেষ উদ্ধারের পর আমরা কানাডাবাসী এখন জানতে পারছি এ ধরনের ভয়াবহ নির্মম ঘটনাগুলো কোথাও লিপিবদ্ধ নেই! কেউ লেখেননি হতভাগ্য শিশুদের কথা!

কানাডার মানবিক প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো এই ঘটনায় বেদনার্ত মর্মাহত ও শোকার্ত প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। তিনি ঘটনাটিকে দেশের ইতিহাসের অন্ধকার ও লজ্জাজনক অধ্যায়ের একটি নমুনা উল্লেখ করে বলেছেন–শিশুদের দেহাবশেষ উদ্ধারের খবরে আমার হৃদয় ভেঙে গেছে। দেশের অধিকাংশ মানুষের মানসিক অবস্থাও এখন আমার মতোই। আমরা জাতি হিসেবে সবসময় আদিবাসীদের পাশে রয়েছি।

শুধু কথার কথা নয়। ট্রুডো ক্ষমা চেয়েছেন। ক্ষমা চেয়ে এই ঘটনার তদন্তে এবং আরো কোনো অনাবিষ্কৃত গণকবর আছে কী না সেটা খুঁজে বের করতে এক কোটি ডলার বরাদ্দ করেছেন। বলেছেন আগামীতে প্রয়োজনে এই বরাদ্দ বাড়বে।

এই ঘটনার সপ্তাহ দুয়েক পরে কানাডার আরেকটি প্রভিন্স সাসকাচুয়ানে আবিস্কৃত হয়েছে আরো ৭৫১টি চিহ্নহীন গণকবর! অনুমান করা হচ্ছে এগুলোও আবাসিক ক্যাথলিক স্কুলের আদিবাসী শিশুদেরই কবর!

ক্যাথলিক চার্চ পরিচালিত আবাসিক স্কুলগুলোয় আদিবাসী শিশুদের ওপর নির্যাতন ও গোপন সমাধির ঘটনায় ক্ষুব্ধ প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো খ্রিষ্টান ধর্মযাজক পোপ ফ্রান্সিসকে কানাডায় আসার এবং এই ঘটনায় ক্ষমা চাওয়ার আহবান জানিয়েছেন। যদিও এখন পর্যন্ত পোপ ফ্রান্সিস কোনো প্রতিক্রিয়াই জানাননি! কী বিস্ময়কর!

সম্প্রতি জি-৭ সম্মেলন পরবর্তী সফরের অংশ হিসেবে কানাডার প্রধানমন্ত্রী ট্রুডো ভ্যাটিকান সফরে যান এবং পোপের সঙ্গে দেখা করেন।

আমরা স্মরণে আনতে পারি–কানাডার আদিবাসীদের প্রায় দেড় লাখ শিশুকে ক্যাথলিক চার্চ পরিচালিত আবাসিক স্কুলে নিয়ে আসা হয়েছিলো জোরপূর্বক। সময়কাল ১৮৮০। কানাডার মূল সমাজের সাথে খাপ খাইয়ে নেবার ট্রেনিং-এর অজুহাতে সেইসব শিশুদের নিজেদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও ভাষা থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হয়েছিলো পুরোপুরি। এমনকি তাদের পরিবারের সঙ্গেও থাকতো না কোনো যোগসূত্র। বেদনার বিষয় হলো–এইসব স্কুলে অর্থায়ন করতো কানাডা সরকার। কিন্তু পরিচালনা করতো ক্যাথলিক চার্চ। এইসব আবাসিক স্কুলের বহু শিক্ষার্থীই শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার হতো। দিনের পর দিন। কিছু ঘটনা প্রকাশিত হতো। কিন্তু অধিকাংশই থেকে যেতো গভীর গোপন অন্ধকারে।

গোপন সমাধি উদ্ধার প্রকল্পের তৃতীয় ধাপে দু’দিন আগে পাওয়া গেছে আরেকটি হৃদয় ভাঙা সংবাদ।

ব্রিটিশ কলম্বিয়ার ক্র্যানব্রুক এলাকার কাছাকাছি সেন্ট ইউজেনস ক্যাথলিক স্কুল প্রাঙ্গণে আরো ১৮২জন হতভাগ্য শিশুকিশোরের দেহাবশেষের সন্ধান পাওয়া গেছে! যাদের বয়েস সাত থেকে পনেরো!

এই ঘটনায় কানাডা শোকে মোহ্যমান।

সন্দেহ নেই, মাটির নিচে অনুসন্ধানযোগ্য রাডার ব্যবহার করে চিহ্নহীন গোপন সমাধি অনুসন্ধান কার্যক্রম অব্যাহত থাকলে আরো গণকবর আবিষ্কৃত হবে!

একের পর এক আদিবাসী শিশুদের গণকবর আবিষ্কারের ঘটনায় অন্য ধর্মের প্রতি সহনশীল চিরকালের কানাডা কী রকম অসহিষ্ণু হয়ে উঠতে চাইছে! কয়েকটি ক্যাথলিক চার্চে আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছে ক্ষুব্ধ নাগরিকদের একটা অংশ। চার চারটি পুরোপুরি বিধ্বস্ত পুড়ে যাওয়া চার্চের ছবি টেলিভিশন পর্দায় প্রদর্শিত হচ্ছে। শান্তির দেশ সম্প্রীতির দেশ কানাডায় যা প্রায় অবিশ্বাস্য ঘটনা।

০২

অটোয়া পার্লামেন্ট হিলে, যেখানে প্রতিবছর কানাডা ডের মূল উৎসব অনুষ্ঠিত হয়, সেখানে অরেঞ্জ টি শার্ট পরা ক্ষুব্ধ মানুষেরা জড়ো হয়েছেন। কমলা রঙ আদীবাসীদের প্রিয় রঙ বা চিহ্নস্মারক। পার্লামেন্ট হিলের সামনে স্থাপিত স্থায়ী শিখা অনির্বানকে ঘিরে সকাল থেকেই চলছে সংহতি সমাবেশ। এখানে একটা বড়সড় সার্ফেসে শিশুকিশোরদের ব্যবহৃত অজস্র ছোট ছোট জুতোর প্রদর্শনী মনটা বিষণ্ণ করে দিচ্ছে।

শুধু অটোয়া নয়, সারা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অরেঞ্জ কালারের টি শার্ট পরা মানুষেরা সংহতি ও ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছেন। সংহতি জ্ঞাপন সূচক শ্লোগানটি হচ্ছে EVRY CHILD MATTERS.

কানাডার মানবিক প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো বারবার ক্ষমা চাইছেন। সকাল থেকে শুনছি কানাডা ডে-র বার্তায় তিনি বলছেন–উই মাস্ট বি অনেস্ট এবাউট আওয়ার হিস্ট্রি।

তিনি বলছেন–ইন্ডেজিনাস জনগোষ্ঠীর প্রতি আমাদের অতীতের লট অব টেরিবল মিসটেকস্‌ এর একটা সুরাহা হতে হবে।

বলছেন–উই ক্যান ডু রিকন্সিলিয়েশন।

উই ক্যান মেক এ বেটার কান্ট্রি।

০৩

আমি এবারের কানাডা ডে-র সমস্ত আনন্দ অনুষ্ঠান প্রত্যাখ্যান করছি, অস্বীকার করছি।

একই সঙ্গে আমরা আমাদের সেইসব ফার্স্ট নেশন বাচ্চাদের পরিচয় স্বীকার করছি, স্মরণ করছি।

চোখের জলে অনুভব করার চেষ্টা করছি সেইসব হতভাগ্য শিশুদের নিষ্পাপ পবিত্র অসহায় মুখগুলোকে–যারা একদিন স্কুলে গিয়েছিলো কিন্তু আর কোনোদিন বাড়ি ফিরে আসেনি…

অটোয়া ০১ জুলাই ২০২১

- Advertisement - Visit the MDN site

Related Articles

- Advertisement - Visit the MDN site

Latest Articles