
নিশিদিন খেলুক ওরা পূর্ব পশ্চিম, আমি ঝুলে আছি বটবৃক্ষের ডালে। জনসন, ট্রাম্প, হিলারির চেয়ে পদ্মা সেতুর খবরটাই বড়। ডেঙ্গু জ্বর নিয়ে আমার রয়েছে অনেক আতংক। এখন যেমন চলছে শাড়ি শাড়ি খেলা। বাংলাদেশের কোন কিছুই আমার কাছে ফেলনা নয়। টানুন কিংবা ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিন। যখন মাথা উঁচিয়ে ভেসে উঠি কাঁটালতা খেলা করে আমার উষ্কখুষ্ক চুলে। জন্মাবধি আমি নদীর পাড়ের ছেলে। হাতদুটো মুষ্টিবদ্ধ হলে এখনো বাতাসের গায়ে বৈঠা বেয়ে যাই। শরীর স্বাস্থ্য গড়ন দেখে অনেকে বলে চাষার ছেলে। বলে, ফড়িং ধরে ও খেলা করেছে বাল্যকালে। লোকটা এখন প্রবাসী। বয়স হয়েছে সত্তরের কাছাকাছি। আদতে আমিই সেই ছেলে, আমিই সেই লোক।
সত্যিই তাই, ধবল-কালো দুটো গরু ছিল আমাদের। ওরা ঘাস খেত কলমি ক্ষেতের পাশে। কোন বিরক্ত করতো না কাউকে। তবুও বলতাম, হুট হুট তফাৎ যা। যার মানে, বন্ধু এই তোমাদের স্বাধীনতা। যেমন ইচ্ছে মাথা নিচু করে ঘাস খাওয়া। ইদানীং অনেকে জিজ্ঞেস করে তুমি কোথা থেকে এসেছ। পূর্বপুরুষদের কথা কিছু বলো।
জামার বোতাম খুলে মেইড ইন বাংলাদেশ দেখিয়ে বলি এইখানে হাত রেখে দেখ আমার উঠান, আমার পুকুর আমার ধানক্ষেত সুতোয় সুতোয় গুটি পাকিয়ে আছে। এটাই আমার দেশ। সুযোগ পেলে পল্লী কবির কবিতা পরিবর্তন করে বলি, তুমি যাবে ভাই, যাবে মোর সাথে, আমাদের ছোট দেশে? বাড়াই নিমন্ত্রণের হাত। যখন নায়াগ্রার জলপ্রপাতের শব্দ শুনি কিংবা তাকিয়ে তাকিয়ে দেখি জলের গতি, আমি তখন শুনি কিছু চিৎকার। লোকে বলে এটা নাকি এক ধরনের মানসিক রোগ। চিকিৎসা নেওয়া দরকার। বলি, নায়াগ্রার জল ছুটে যাচ্ছে যেমন, এমনি করে একদিন মানুষ ছুটেছিল মানুষের পেছন। ‘মিলিটারি আইসে’ এমন একটি কথার প্রতিধ্বনি হতো। দূর থেকে ভেসে আসা গুড়ুম গুড়ুম মর্টার সেল, চাইনিজ রাইফেলের শব্দ শুনত ওরা। নায়াগ্রার জলপ্রপাতে দেখি একাত্তরের শরণার্থীর গতি। অবিকল সেই রকম ধেয়ে ধেয়ে পশ্চিম বাংলায় যাওয়া। কপোতাক্ষ নদীর পারে বসে আমিও অপেক্ষা করেছি পরবর্তী দিনের জন্য। আগামীকাল এগিয়ে যাব আরও দশ মাইল। তারপর দেখা পাবো সাদা সাদা তাবুতে ঘেরা জয় বাংলা শরণার্থী ক্যাম্প। আমি সেই তাঁবুর একটি ছেলে। সেখানে রিলিফ দিতে একদিন এসেছিল এক গোরা মেয়ে। তারও দিন দশেক আগে দশই আগস্ট এসেছিল এডওয়ার্ড কেনেডি। তবুও সেই মেয়েটির কথা অনেক বেশি মনে আছে। কি মায়া নিয়ে তাকিয়েছিল সকলের দিকে। আমার দিকে যেন একটু বেশি।
সেই থেকে যুদ্ধের মধ্যে বড় হচ্ছি। কখন ফিরে আসতে হবে বলেনি মেয়ে। শুধু ইঙ্গিত করেছিল যুদ্ধে যেতে হবে। যেন যুদ্ধে গেলেই শেষ হয়ে যাবে যুদ্ধ। মেয়েটির চোখে দেখেছিলাম সাহসী আত্মসমর্পণ। ধারণা দিয়েছিল যুদ্ধ শেষে আমি যা বলবো সে সব কিছুই শুনবে। ধারণা দিয়েছিল যেন যুদ্ধ শেষে ফিরে এসে বলি, এই বয়সে রিলিফ ক্যাম্পে ঘুরে ঘুরে আমাদের কেন ‘বিলাতি দুধ’ খাওয়াচ্ছে। তুমি বিয়ে সাদি করবে না। তোমার মনের মানুষ কই?
যুদ্ধ শেষে ঠিকই ফিরে গিয়েছিলাম শরণার্থী শিবিরে। একটার পর একটা শরণার্থী শিবির চষে বেড়িয়েছি। তখন না ছিল তাঁবু না ছিল ক্লান্ত হয়ে বসে থাকা জয় বাংলার লোকজন। তারা সব ফিরে এসেছে। নায়াগ্রার জলপ্রপাতের মত এবার উলটো দিকে নিজ নিজ গ্রামে। এখন অনেক বড় হয়ে গেছে শরণার্থী শিবিরের শিশুগুলো। ওরা ভুলে গেছে রাতের অন্ধকারে ক্ষুধার জন্য একটানা চিৎকার। মরে গেছে তখন যার ছিল যৌবন, তেমন অনেকে। তার আগে মরে গেছে সাদা-পাকা চুলে নতুন দেশ দেখা উৎসুক মুখগুলো। আমি এখনো বেঁচে আছি। আর বেঁচে আছে একটি স্বপ্ন। গোরা মেয়েটাকে শাড়ি পরলে কেমন লাগে সেটা দেখার স্বপ্ন ছিল।
বসে বসে ভাবি অজানা অচেনা দেশের একটি মেয়ে কেন আমাদের যুদ্ধে পাঠিয়েছিল? আমার দেশ মুক্ত হলে ওর তাতে কি আসে যায়! বিদেশ বিভূঁইয়ে অনেক দেখেছি জামদানি কিংবা তাতের শাড়ি পরা মেমসাহেব। কিন্তু ওদের কারোর চোখে দেখি না সেই শাসন। চোখে চোখে যেমন বলেছিল, বালক এখনো তুমি যুদ্ধে যাওনি কেন? যুদ্ধে যাবার যথেষ্ট বয়স হয়েছে তোমার। আমিও সেদিন মনে মনে বলেছিলাম, কথা দাও একদিন শাড়ি পরে আমার সামনে এসে দাঁড়াবে। যেমন ইচ্ছে কিনে দেব শাড়ি তুমি বসে বসে আঁচল টানবে।
নাহ! ওসবের কিছুই বলা হয় নি। সে সাহস ছিল না তখন। হয়তো ছিল না সময়। তাই ভুলতেও পারি না ব্যথার কাহিনী। কল্পনার শাড়ি পরা নারী।
স্কারবোরো, কানাডা

