9.8 C
Toronto
রবিবার, অক্টোবর ১৭, ২০২১

শিকড়ের টান

ফিরে যেতে হয় আমার মাতৃভুমিতে

শিকড়ের টানে বারবার ফিরে যেতে হয় আমার মাতৃ ভুমিতে । ছড়িয়ে থাকা শাখা প্রশাখারা আঁকড়ে রাখে বলে, যেতে নাহি দেবো । আমি বলি, শেকড় ছিল বলেই তোমরা শাখা প্রশাখারা পৃথিবীর আলো দেখতে পেরেছা । সে শেকড়কে আমি ভুলি কি করে ? শেকড়কে কবর দিয়ে শাখা প্রশাখারা বাঁচে এটাই নিয়ম ।আমার শাখা প্রশাখারা আমাকে জড়িয়ে থাকে প্রতিক্ষণ । তাদের শেকড়ও যে আমি । আমার শাখা প্রশাখারা যেমন আমাকে আঁকড়ে ধরে আছে তেমনি আমিও আঁকড়ে ধরে আছি আমার শেকড়কে । দীর্ঘদিন দেশের বাইরে থেকে প্রবাসকে বানিয়েছি দেশ, বানিয়েছি বাসস্থান ও ঠিকানা । আমি থেকে হয়েছি আমরা, আমরা থেকে হয়েছে শাখা প্রশাখারা। শাখা এবং প্রশাখারা আমার অনেকটা পথ জুড়ে আছে । দুহাত দিয়ে সরিয়ে তাদের কাছ থেকে আমার বেড়িয়ে আসাটা আসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে ।

শেকড়ের টানে আমি যেমন বারবার ফিরে ফিরে যাই তেমনি আবার বারবার ফিরে আসি শাখা প্রশাখাদের পিছুটানে । এটাই হয়তো জীবন।

২০২১ সালের মার্চ মাস।তিন বছর হয়ে গেলো দেশে যাই না।তিন বছর দেশে যাই না এমন ঘটনা কখনো ঘটে নি। তিন বছর আগে আমার মাকে চির নিদ্রায় ঘুম পারিয়ে দিয়ে চলে এসেছিলাম । তারপর আর যাওয়া হয়নি। “মা” ছাড়া মাতৃ ভুমি কেমন যেনো মরুভূমি মনে হয়।তবে এবারের বই মেলাতে যাবার পরিকল্পনা ছিলো । বই প্রকাশের পরিকল্পনাও ছিলো । কিন্তু আমার পরিকল্পনা আমার ইচ্ছাতে কিছুই আসে যায় না । ভাগ্য বলে একটা জিনিষ আছে। যদি ভাগ্য আমার সাথ না দেয় তাহলে কিছুই হবার নয়। কোভিড ১৯ সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পারাতে আমাদের গৃহ বন্ধী হয়ে যেতে হোল। আমার আর দেশে আসা হোল না। বই প্রকাশ করাও হোল না। কবে যে দেশে আসতে পারবো তারও কোন নিশ্চয়তা নেই। তবু আশায় মানুষ বাঁচে । আমিও সে আশাতেই বেঁচে আছি ।

বাংলাদেশের জীবনটাও কেমন বদলে গেছে। আগের মতো আনন্দ আর খুঁজে পাই না । আগে বিমান বন্দরে নামার সাথে সাথেই আনন্দের এক ঝটকা হাওয়া মনকে জুড়িয়ে দিতো । আব্বা আম্মা ভাই বোনেরা আসতো বিমান বন্দরে আমাকে নিতে । আব্বা আম্মা কে দেখে মনের আবেগ ধরে রাখতে পারতাম না। দুই চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়তো । এখন কেমন যেনো সব কিছু পানসে লাগে। দেশে গিয়ে যাদের সাথে দেখা করাটা দায়িত্বের মধ্যে পরতো সে পাট এখন চুকে গেছে। তাঁরা সব এখন আকাশের তারা হয়ে গেছেন ।ভালোবাসার স্থান গুলোও এখন কমতে কমতে শূন্যের কোটায় চলে যাচ্ছে । বাচ্চারা যখন ছোটো ছিল , বাবা মা, শ্বশুর শাশুড়ি জীবিত ছিলেন জীবিত খালা চাচী , ফুপু সবাই । দেশে, পৌঁছানোর পর দিন থেকে বা সেদিনই খালা চাচীরা কি যে আনন্দ নিয়ে দেখা করতে আসতেন । সাথে সাথে কাজিনদেরও হৈ চৈ করে দেখা করতে আসা । আহা সে যে আমার নানা রঙের দিন গুলো । আমাদের বাচ্চারাও তাদের কাজিনদের সাথে আনন্দে মেতে উঠতো

তখন ঢাকা শহরে ছিলো না এতো যানজট , ছিলো না মানুষের ভীর ভাটটা । চলাফেরাতে দীর্ঘ সময়ের কষ্ট ছিলো না। এখন যেমন বেড়েছে জনসংখ্যা তার সাথে যানজট , পলিউসান, বিশৃঙ্খলতা , অনিয়ম, অপরাধ, দুর্নীতি । মানুষের সরলতা হারিয়ে গেছে সেখানে স্থান নিয়েছে জটিলতা । ৪০ বছর আগে যখন বাংলাদেশ ছেড়ে ছিলাম সে বাংলাদেশকে আমার কল্পনা করা উচিৎ না। তারপরও বহু বার দেশে গেছি আপন জনরা পাশাপাশি জরা জরি করে ছিলাম বলে সব কিছুই ভালো লাগতো । কিন্তু এখন দেশে যাওয়াটা তেমন সুখকর মনে হয় না। তারপরেও প্রানের টানে , দেশের টানে, মাটির টানে , মায়ের টানে সব মিলিয়ে বার বার ছুটে ছুটে দেশে যেতাম । এখনো দেশে ভাই বোনরা

আছে কিন্তু” মা” নেই। মা নেই বলে দেশে যাবার আগ্রহটাও কেমন যেনো কমে গেছে।

আমার জন্ম কুমিল্লা শহরে ।সেখানকার শান্ত, স্নিগ্ধ পরিবেশে আমার বেড়ে উঠা । কুমিল্লা শহর এখনো আমাকে টানে , ভীষণ ভাবে টানে । পরিস্কার পরিছন্ন শহর ,খোলা মেলা রাস্তা ঘাট , স্বচ্ছ দিঘীর জল। কুমিল্লা শহর দীঘি পুকুরের জন্য বিখ্যাত ছিলো। শিশির ভেজা ঘাসে ধর্ম সাগরের পার দিয়ে হেঁটে বেড়ানো । সকালে বকুল ফুল কুড়ানো , পথে যেতে যেতে দেখা যেতো সবুজ ঘাসের উপর লাল ফুলে ভরা কৃষ্ণ চুড়া গাছ। জানি না এখনো কি সে সব আছে এমনি ভাবে। ছোট বেলার বন্ধুরাও কোথায় যেনো সবাই হারিয়ে গেছে। মাঝ রাতে ঘুম ভেঙে গেলে কানে আসতো কোন এক সুখী রিকশাওয়ালার রিক্সার টুং টুং ঘণ্টি বাজিয়ে সদ্য মুক্তি পাওয়া কোন সিনেমার জনপ্রিয় গান গলা ছেড়ে গাইতে গাইতে বাড়ি ফেরা। কোন এক বাঁশি ওয়ালা আসাধারন মিষ্টি সুরে বাঁশি বাজিয়ে যেতো চৌরাস্তার মোরে । এরা সব কোথায় এখন? কোথায় হারালো সে সব দিনগুলো? যা হারিয়ে যায় তাকে কি আর ফিরিয়ে আনা যায় ?

আমরা আমাদের কিশোর বেলায় তরুন বেলাতে এসব ছোট খাটো ব্যাপারে যতোটা আনন্দ পেয়েছি, এখনো সে সব অতীত কে বুকের মাঝে জড় করে আনি আমাদের ছেলে মেয়েরা আমাদের এসব ভালো লাগার কথা শুনলে অদ্ভুত চোখ করে তাকিয়ে থাকে।

এখন দেশে গেলে যখন কুমিল্লা যাই তখন বড্ড বেশী স্মৃতি কাতর হয়ে পরি। আমাদের সময়ের কুমিল্লা শহরটি কোথাও যেনো খুঁজে পাই না। অগনিত রিকশার বিশৃঙ্খল চলাফেরা। অসংখ্য মানুষে খিজি বিজি অবস্থা। দিঘী পাড় গুলো আর আগের মতো নেই। প্রিয় ধর্ম সাগর এখন চার দেয়ালে বন্ধি। সেখানে খালি পায়ে শিশির ভেজা ঘাসে হেঁটে বেড়াবার কোন সুযোগ নেই। অসাধারন একটা সৌন্দয্য নিয়ে ধর্ম সাগরের পারে যে রানির কুঠির দাঁড়িয়ে ছিলো , সে রাণীর কুঠিরের ভগ্ন অবস্থা দেখে মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে গিয়েছিলো । কোন রকম সংস্কার নেই এসব ঐতিহাসিক বিল্ডিং গুলোর ।

বড্ড জানতে ইচ্ছে করে এখনো কি কোন রিকশা চালক ঘণ্টি বাজিয়ে খোলা গলায় গান গাইতে গাইতে বাড়ি ফিরে? এখনো কি কোন সুখী বংশী বাদক চৌরাস্তার মোরে বাঁশি বাজায়? আরো একটা কথা জানতে আমার খুব বেশী ইচ্ছে করে এখনো কি তরুন ছেলেরা মিষ্টির দোকান পেড়া ভাণ্ডার বা মাতৃ ভাণ্ডারে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আড্ডা দেয় নাকি নতুন প্রযুক্তির খেলাঘরে সবাই আটকে থাকে?তরুনরা কবিতা লিখতো , কবিতা পড়তো । এখন কি তরুণরা কবিতা লিখে? কবিতা নিয়ে আলোচনা করে? এখনকি কিছু কিশোর কিশোরী সংঘটন তৈরি করে “ আমরা কজন সোনার হরিন” তাদের বিপরীতে কিছু কিশোর আর একটি সংঘটন বানিয়ে ফেলে “ আমরা সোনার হরিন চাই ।”আরো কতো কিছু আমার জানতে ইচ্ছে করে আমার প্রিয় শহরটির কথা । এই শহর যে আমার প্রানের শহর বড্ড বেশী ভালোবাসার শহর । মাঝে মাঝে কবি গুরুর ভাষাতে বলতে ইচ্ছে করে,” আমাদের গেছে যে দিন একেবারেই কি গেছে- কিছুই কি নেই বাকি-।

মিলটন । ক্যানাডা ।

- Advertisement - Visit the MDN site

Related Articles

- Advertisement - Visit the MDN site

Latest Articles