12.7 C
Toronto
বুধবার, সেপ্টেম্বর ২৮, ২০২২

রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধ পরিস্থিতি বিশ্বকে কোন দিকে নিয়ে যাচ্ছে

- Advertisement -

রাশিয়া, ইউক্রেন দুটি দেশই তো বাংলাদেশ থেকে অনেক দূরে। তবে তাদের যুদ্ধ নিয়ে আমাদের মাথাব্যথার কারণ কী? কারণ আছে বটে! যথেষ্ট কারণ। শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়, বিশ্বের সব দেশের জন্যই। কেননা এই যুদ্ধ সারাবিশ্বে অর্থনৈতিক সংকট সৃষ্টি করেছে। জ্বালানি তেলের দাম অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দামও বেড়েই চলেছে। মুদ্রাস্ফীতিও ওপরের দিকে। এ ছাড়া যুদ্ধে অনেক মানুষ নিহত হচ্ছে, বহু সম্পদ নষ্ট হচ্ছে। বিভিন্ন দেশের সামরিক ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে। সারাবিশ্বেই যুদ্ধের হুমকি সৃষ্টি করেছে।

ইউক্রেন সোভিয়েত রাশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ রাজ্য ছিল। ওই অঞ্চলে বিপুল পরিমাণ খাদ্যশস্য উৎপাদিত হতো। এটাকে রাশিয়ার শস্যভাণ্ডার বলা হতো। সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক এবং দেশটির প্রেসিডেন্ট লিওনিদ ব্রেজনেভের জন্মভূমি ও প্রথম কর্মস্থল সেখানেই। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ব্রেজনেভের বিশেষ ভূমিকার কথা সবারই জানা।

ইউক্রেন যখন আলাদা হয়ে যায় তখন সোভিয়েত রাশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক স্থাপনা সেখানে থেকে যায়। যুক্তরাষ্ট্র যখন পাশ্চাত্যের সামরিক শক্তিগুলোকে নিয়ে ন্যাটো নামে সামরিক জোট গঠন করে তখন তারা বলেছিল, রাশিয়ার নেতৃত্বে যে ওয়ারশ জোট হয়েছে তারই পাল্টা ন্যাটো জোট গঠিত হয়েছে। কিন্তু ওটা যে কত বড় ধাপ্পাবাজি তা প্রমাণিত হলো যখন সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে সঙ্গে ওয়ারশ জোটও বিলুপ্ত হয়ে গেল। কিন্তু মার্কিনিরা ন্যাটো তো বিলুপ্ত করলই না, তারা সেই সামরিক জোটকে আরও প্রসারিত করল। সোভিয়েতের সঙ্গে যেসব রাজ্য ছিল তাদের একে একে ন্যাটোতে অন্তর্ভুক্ত করে রাশিয়াকে ঘিরে ফেলতে লাগল। এর পর তারা ইউক্রেনের দিকে থাবা প্রসারিত করল। কিন্তু রাশিয়া তা বরদাশত করবে কেন? পুতিন ছিলেন সমাজতন্ত্রের সময় কেজিবি-প্রধান। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় স্ট্যালিন ফিনল্যান্ডের একটি অংশ দখল করে নিয়েছিলেন, কারণ জার্মানির সঙ্গে যুদ্ধে সেই এলাকার রাজনৈতিক গুরুত্ব ছিল খুব বেশি।

অথচ অক্টোবর বিপ্লবের পর স্ট্যালিনের প্রণীত জাতিসমূহের বিচ্ছিন্ন হওয়ার অধিকারসহ স্বশাসনের ক্ষমতা প্রদানের নীতি অনুসারেই ফিনল্যান্ডকে স্বাধীনতা দেওয়া হয়। যদিও লেনিন এবং স্ট্যালিন জানতেন এর ফলে ফিনল্যান্ডের কমিউনিস্টরা হত্যাকাণ্ডের শিকার হবে। হয়েছিলও তাই। চার্চিল ফিনল্যান্ডের জায়গা দখল করার নিন্দা জানায়। তখন চার্চিল হিটলারকে তোষামোদ করতে ব্যস্ত ছিল। পরে অবশ্য চার্চিল তার আত্মজীবনীতে লিখেছেন যে, স্ট্যালিন যদি তখন ওই ব্যবস্থা না নিতেন তা হলে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের ফলাফল মিত্রপক্ষের বিপক্ষে যেত। রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিন ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিতে ভোলেননি।

তিনি যথাসময়ে হস্তক্ষেপ করেছেন এবং ইউক্রেনের বিপুল এলাকা নিয়ন্ত্রণে নিয়েছেন। ইউক্রেনের পারমাণবিক ঘাঁটিও রাশিয়ার সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা হুমকি দিয়ে যাচ্ছে কিন্তু তেমন কিছু সাহায্য করতে পারছে না। তারা একের পর এক অস্ত্র পাঠাচ্ছে বটে কিন্তু সেগুলো যথা অবস্থানে পৌঁছার আগেই ক্ষেপণাস্ত্র সেসবের বেশিরভাগ ধ্বংস করে দিচ্ছে। পুতিন আরও বলেছেন, প্রয়োজনে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করতে রাশিয়া কুণ্ঠা বা দ্বিধা করবে না। রুশ কূটনীতির বড় সাফল্য যে, চীনও রাশিয়ার পক্ষে দাঁড়িয়েছে। মার্কিনিরা এর পর অনেকটা গুটিয়ে নিয়েছে। তারা বলছে, তারা সরাসরি যুদ্ধে জড়াবে না, তবে অস্ত্র সরবরাহ অব্যাহত থাকবে। অনেকে জিজ্ঞেস করছেন, এই যুদ্ধে কোন পক্ষ জয়ী হবে। উত্তরের অপেক্ষা রাখে না, রাশিয়া এক অর্থে জিতেই গেছে। মার্কিন যুদ্ধবাজদের ইউক্রেনের সাহায্যে রাশিয়াকে ঘিরে ফেলার চক্রান্ত সেটা ব্যর্থ হয়েছে। ইউক্রেনে পারমাণবিক ঘাঁটি মার্কিন যুদ্ধবাজদের ব্যবহারের আশায় গুড়ে বালি।

বিশ্বে যাতে খাদ্য সংকটের সৃষ্টি না হয় সেজন্য রাশিয়া ইউক্রেন থেকে খাদ্যশস্য বিভিন্ন দেশে মালবাহী জাহাজে যেতে দিচ্ছে। বাংলাদেশ রাশিয়া থেকে জ্বালানি তেল আমদানি করার চেষ্টা করছে। এটা সফল হলে আশা করা যায় বাংলাদেশ যে জ্বালানি সংকটের মুখোমুখি হয়েছে, সেটা কিছুটা সহজ হবে। আশা করা যায়, বিশ্ব এই সংকট অচিরেই কাটিয়ে উঠতে পারবে। সোভিয়েত ইউনিয়নের বিলুপ্তির পর মার্কিনিরা এককেন্দ্রীয় বিশ্বব্যবস্থা কায়েম করেছিল। তারা ইরাক, আফগানিস্তান, লিবিয়া, ফিলিস্তিনসহ বিভিন্ন দেশে তাদের হামলা ও আধিপত্য বিস্তার করে। কিন্তু রাশিয়া, চীন, ভিয়েতনাম, কিউবা এবং বিভিন্ন দেশের দেশপ্রেমিক সরকার ও জনগণ সেসব প্রচেষ্টা সাফল্যের সঙ্গে মোকাবিলা করছে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্রের মুখোশের অন্তরালে তাদের আগ্রাসী ভূমিকা ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। প্রেসিডেন্ট পুতিনের ভূমিকা, তার কূটনৈতিক সাফল্য, নানা ধরনের মিত্রকে সমবেত করতে পারাটা বিশ্বে শক্তির ভারসাম্য সৃষ্টি করতে সক্ষম হচ্ছে। বিশ্বব্যাপী শান্তি, গণতন্ত্র ও প্রগতির সংগ্রাম এই ভারসাম্যকে আরও ইতিবাচক ধারায় নিয়ে যাচ্ছে। উন্নয়নশীল বিশ্ব সাম্রাজ্যবাদী শোষণ ও আধিপত্যের বিরুদ্ধে শক্তিশালী ও সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়ে তুলছে। আমরা আরও দেখতে পাচ্ছি যে, উন্নত পুঁজিবাদী দেশগুলোও মার্কিনিদের হুকুমজারি মানতে রাজি নয়। আমরা যেন ক্রমেই এক বহুকেন্দ্রিক বিশ্বের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি, যেখানে আধিপত্য ও হুকুমদারি ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়বে এবং বিশ্বশান্তির প্রতি হুমকিও কমে আসবে। রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধ পরিস্থিতি সেদিকেও বিশ্বকে নিয়ে যাচ্ছে।

মনজুরুল আহসান খান : বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাবেক সভাপতি ও শ্রমিকনেতা

Related Articles

Latest Articles