25.5 C
Toronto
সোমবার, আগস্ট ৮, ২০২২

রবীন্দ্রনাথ ও ইয়েটস: নোবেল প্রাপ্তির হিসেব-নিকেশ

- Advertisement -
রবীন্দ্রনাথ ও ইয়েটস: নোবেল প্রাপ্তির হিসেব-নিকেশ
রবীন্দ্রনাথ ও ইয়েটস

আমরা সবাই জানি, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১) ১৯১৩ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেছিলেন। যে গ্রন্থটির জন্য তিনি পুরস্কারটি পান সেই ইংরেজি গীতাঞ্জলির ভূমিকা লিখে দিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথের আইরিশ বন্ধু ইংরেজ কবি উইলিয়াম বাটলার ইয়েটস (১৮৬৫-১৯৩৯)। হয়তো ইয়েটস রবীন্দ্রনাথের পাণ্ডুলিপির ঘষামাজাও করেছিলেন খানিকটা। আমরা যারা রবীন্দ্রনাথের দোষ খুঁজে বেড়াই তাদের মুখে প্রায়ই শোনা যায় রবীন্দ্রনাথের নোবেলপ্রাপ্তিতে ইয়েটসের ভূমিকা ছিল বিশাল। কিন্তু তাতেই কি রবীন্দ্রনাথের কৃতিত্ব কমে যায়? পৃথিবীর সব ভালো বই-ই তো কোনো-না-কোনো ভালো সম্পাদকের হাত ঘুরেই ছাপাখানায় যায়; অধিকাংশ বই-ই তো একজন আলাদা ব্যক্তির ভূমিকা যুক্ত করেই প্রকাশিত হয়। ভূমিকা ও সম্পাদনার কারণে মূল লেখকের কৃতিত্ব কমে যায় এমন কথা রবীন্দ্রনাথের ক্ষেত্রে যেভাবে শোনা যায় বোধ করি আর কোনো লেখকের ক্ষেত্রে যায় না। রবীন্দ্রনাথকে খাটো করার দুর্ভাগ্য কী স্বয়ং রবীন্দ্রনাথের যার ১৫০ তম জন্মদিন ইউনেসকোর মতো প্রতিষ্ঠান সারা পৃথিবীজুড়ে পালন করেছিল, নাকি সেই দুর্ভাগ্য আমাদের—যারা তাঁর দেশের মানুষ, তাঁর ভাষা ও সংস্কৃতির মানুষ?

আমাদের প্রথমেই মনে রাখা দরকার যে, রবীন্দ্রনাথ ছিলেন প্রথম অশ্বেতাঙ্গ নোবেল বিজয়ী। তাঁর আগে অন্তত ষাট জন নোবেল পান। তাঁদের মধ্যে ইউরোপীয় ছাড়া অন্য যে তিনজন আমেরিকা থেকে নোবেল পেয়েছিলেন তাঁরাও তো প্রকৃতপক্ষে ছিলেন শ্বেতাঙ্গ বংশোদ্ভূত। রবীন্দ্রনাথ দ্রুতই সারা পৃথিবী জুড়ে এক সেলিব্রেটিতে পরিণত হয়েছিলেন বলেই কী তার কপালে জুটেছিল এতসব মন্দ কথা? মন্দের তীব্রতা এত বেশি ছিল যে পুরস্কার প্রাপ্তির পেছনে ষড়যন্ত্রের গন্ধ খুঁজতেও আমাদের বেশি বেগ পেতে হয়নি। অনুরাগীদের অনেকে দ্বিধা কাটিয়ে উঠতে পারেননি বিশ্বাঙ্গনে এত অল্প পরিচিত মানুষটির বিশ্ব শ্রেষ্ঠ পুরস্কারটি অর্জন নিয়ে। বলে রাখা যেতে পারে যে, গীতাঞ্জলির ভূমিকা-লেখক ইয়েটস নিজেও রবীন্দ্রনাথের নোবেল পাওয়া নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেননি।
রবীন্দ্রনাথ রচিত সাহিত্য যে সৎ বিবেচনাতেও শ্রেষ্ঠত্বের দাবিদার হতে পারে সেটি বিশ্বাসযোগ্য মনে হবে যদি আমরা ১৯১৩ সালে পুরস্কারটির জন্য যে সকল সাহিত্যিক নমিনেশন পেয়েছিলেন সে তালিকাটি পর্যালোচনা করি। একই সঙ্গে পর্যালোচনা করতে হবে ইয়েটস কতবার নোবেল নমিনেশন পেয়েছিলেন সেই বিষয়টি। নমিনেশন পর্যালোচনার শুরুতে শুধু একটা বলে রাখি রবীন্দ্রনাথের নাম শুধু ১৯১৩ সালেই একবারের জন্য শুধু একজন প্রস্তাব করেছিলেন। আর ইয়েটসের নাম প্রথম প্রস্তাবিত হয় ১৯০২ সালে। আমাদের সৌভাগ্য যে ১৯২৩ সালে তিনি নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হন। অর্থাৎ রবীন্দ্রনাথের দশ বছর পর।

সৌভাগ্য এ জন্য বলছি যে, ১৯০২ সালে নোবেল পুরস্কারের জন্য যে লেখকদের নাম প্রস্তাব করা হয় তাঁদের মধ্যে কালের বিচারে টিকে গেছেন যাঁরা তাঁদের অন্যতম হলেন বিংশ শতাব্দীর পুরোধা সাহিত্যিক রাশিয়ার লিও তলস্তোয়। ওই বছর আরও এসেছিল এমিল জোলা, হেনরিক ইবসেন, জর্জ মেরিডিথের নাম। জোলা তো ১৯০২ সালেই মারা যান। ১৯০৬ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ইবসেনের নাম নতুন করে প্রস্তাবিত হয় ১৯০৩ ও ১৯০৪ সালে। ১৯০৭ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত মেরিডিথের নাম সাতটি নমিনেশন পেয়েছিল। ১৯১০ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তলস্তোয়ের নাম মোট পাঁচ বছর ১৯টি নমিনেশন পেয়েছিল। আমাদের দুর্ভাগ্য যে, বিশ্ববরেণ্য এই চারজন সাহিত্যিকের কেউই নোবেল পুরস্কার পাননি। ১৯০২ সালে প্রস্তাবিত বিশ্ববরেণ্য এই চারজন সাহিত্যিকের কপালে নোবেল না জুটলেও ইয়েটসের জুটেছিল। যদিও ততদিনে দুই দশক পার হয়ে গেছে।

অন্যদিকে আমাদের আরও মনে রাখতে হবে যে, ১৯১৩ সালে যেহেতু ইয়েটসের নাম প্রস্তাবিতই হয়নি, সুতরাং তাঁর জন্য সে বছর নোবেল পুরস্কারের কোনো প্রশ্নও ছিল না। প্রধান যে ব্রিটিশ লেখকের নাম সে বছর প্রস্তাবিত হয় তিনি হলেন বিখ্যাত সাহিত্যিক টমাস হার্ডি (১৮৪০-১৯২৮)। রয়্যাল সোসাইটি অব লিটারেচারের সাতানব্বই জন সদস্য তাঁর নাম প্রস্তাব করেছিলেন। এ প্রসঙ্গে বলে রাখা যেতে পারে যে, নোবেল সাহিত্য পুরস্কারের জন্য যে কয়জনের নাম সবচেয়ে বেশিবার প্রস্তাবিত হয়েছিল হার্ডি তাঁদের অন্যতম। শুরু হয়েছিল ১৯১০ সাল থেকে। সোসাইটি অব অথরসের ছয়জন সদস্য সেবার প্রস্তাব করেন। এরপর ১৯১১, ১৯১২, ১৯১৩, ১৯২২, ১৯২৩, ১৯২৪, ১৯২৫, ১৯২৬ ও ১৯২৭ মোট দশ বছরে হার্ডির নাম ২৫টি নমিনেশন পেলেও তাঁর কপালে নোবেল তিলক আসেনি। ১৯১২ সালে রয়্যাল সোসাইটি অব লিটারেচারের ৭০ জন সদস্য হার্ডির নাম প্রস্তাব করেছিল। আর ১৯১৪ সালে করেছিলেন সোসাইটির সকল সদস্য। যদিও স্মরণ করা যেতে পারে যে ১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের কারণে সাহিত্যে নোবেল দেওয়া হয়নি। পরবর্তীকালে ১৯২০ সালে প্রস্তাব এসেছিল ফ্যাকাল্টি অব আর্টস অ্যান্ড লেটার্স থেকে। ১৯২১ সালে প্রস্তাবক ছিলেন ইংলিশ অ্যাসোসিয়েশন। হার্ডির প্রতি সম্মান রেখেই এসব কথা বলছি, রবীন্দ্রনাথের প্রতিদ্বন্দ্বীর অবস্থাটা কত নাজুক ছিল সেটা বোঝাতে।

১৯১৩ সালে যুক্তরাজ্য থেকে অন্য যে সাহিত্যিকদের নাম পাঠানো হয়েছিল তাঁরা হলেন জন মরলে (১৮৩৮-১৯২৩), জন এল লর্ড এভবুরি (১৮৩৪-১৯১৩) ও ফ্রান্সিস সি ওয়েলস। ওয়েলসের নাম প্রস্তাব করেছিলেন তাঁর নিজ দেশেরই অধ্যাপক ও লেখক কারভেত রিড। ফ্রেজারের নাম প্রস্তাব করেছিলেন রয়্যাল সোসাইটির অব লিটারেচারের ফেলো জর্জ এ ম্যাকমিলান। অর্থাৎ স্পষ্ট হয় সোসাইটির একজন সদস্য আলাদাভাবে নাম প্রস্তাবের অধিকার রাখতেন। যেমনটি রেখেছিলেন সোসাইটির সদস্য স্টার্জ মূর (T. Sturge Moore)। আর সে কারণেই তিনি তাঁর স্বাধীন মতামতের ভিত্তিতে পাঠাতে পেরেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নাম।
১৯১৩ সালে রবীন্দ্রনাথসহ মোট যে ২৮ জনের নাম প্রস্তাবিত হয়েছিল তাঁদের মধ্যে বাংলাভাষীদের পরিচিত লেখক হলেন গ্রাসিয়া দেলেদ্দা (১৮৭৫-১৯৩৬) ও আনাতোল ফ্রাঁস (১৮৪৪-১৯২৪)। দেলেদ্দা নোবেল পেয়েছিলেন ১৯২৬ সালে আর তাঁর নাম প্রস্তাব হয়েছিল ১৯১৩ থেকে ১৯২৫ সাল পর্যন্ত সকল বছরেই, শুধু ১৯১৬ সালটি বাদ দিয়ে। অন্যদিকে ফ্রাঁস নোবেল পান ১৯২১ সালে। মোট যে কয়বার তিনি নমিনেশন পেয়েছিলেন সে সালগুলো হলো ১৯০৪, ১৯০৯, ১৯১০, ১৯১১, ১৯১২, ১৯১৫ ও ১৯১৬।

সকলের জানা আছে ১৯১৩ সালের নোবেল সাহিত্য পুরস্কার প্রদানের কর্তৃত্ব সুইডিশ একাডেমির যে ১৮ জন সদস্যের ছিল তাঁদের মধ্যে শুধু বাংলা জানা প্রাচ্যবিদ ইসাইয়াস টেগনা (Esaias Henrik Vilhelm Tegner, ১৮৪৩-১৯২৮) ছাড়া কমিটির বাকিদের ওপর রবীন্দ্রনাথ অনূদিত গীতাঞ্জলি নাকি কোনো প্রভাব ফেলতে পারেনি। তবে অন্য সদস্যদের ওপর প্রভাব তৈরি করতে পেরেছিলেন যিনি তিনি হলেন সুইডেনের সমকালীন খ্যাতিমান কবি কার্ল গুস্তাফ ভন হেইডেনস্টাম (১৮৫৯-১৯৪০)। এ তথ্যও সকলে অবগত যে হেইডেনস্টাম নিজে পরবর্তীকালে ১৯১৬ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পান। কিন্তু আমাদের অনেকেরই জানা নেই ১৯১৩ সালেই হেইডেনস্টামের নামও একজন প্রস্তাবক প্রেরণ করেছিলেন, যদিও আমরা দেখেছি তিনি রবীন্দ্রনাথকে নোবেল দেওয়ার ব্যাপারে কত তৎপর। গীতাঞ্জলির ইংরেজি ও সুইডিস অনুবাদ পাঠ করে রবীন্দ্রনাথের চেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ হেইডেনস্টাম ভীষণ মুগ্ধ হন এবং রবীন্দ্রনাথ ও গীতাঞ্জলি বিষয়ে তিনি লেখালেখির মধ্য দিয়ে কমিটির বাকিদের মুগ্ধতায় আবিষ্ট করেন। অবশেষে ১৩ নভেম্বর মঙ্গলবার ঘোষিত হয় রবীন্দ্রনাথের নাম। উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, এরও আগে ১৯০৯, ১৯১১ ও ১৯১২ সালেও হেইডেনস্টামের নাম নোবেল সাহিত্য পুরস্কারের জন্য প্রস্তাবিত হয়। পরবর্তীকালে নোবেল পুরস্কার পাওয়ার আগে তাঁর নাম আবারও ১৯১৫ সালে প্রস্তাব করা হয়েছিল।
রাজধানী স্টকহোমে নির্দিষ্ট দিনে অর্থাৎ নভেম্বর মাসের দ্বিতীয় বৃহস্পতিবার প্রতি বছর সুইডিস একাডেমির নোবেল কমিটি পুরস্কার ঘোষণা করে থাকে। ১৯১৩ সালে ঘোষণার তারিখটি পড়েছিল নভেম্বর মাসের ১৩। ডিসেম্বরের ১০ তারিখে ঘোষিত লেখক পুরস্কারটি গ্রহণ ও একটি বক্তৃতা প্রদান করেন। মজার ব্যাপার হলো রবীন্দ্রনাথ নিজে উপস্থিত থেকে নোবেল পুরস্কার কমিটির হাত থেকে পুরস্কার গ্রহণ করতে পারেননি। এমনকি বক্তৃতাটি দিতে দিতে সাত বছর পেরিয়ে গিয়েছিল।

রবীন্দ্রনাথের পক্ষে যাওয়া সম্ভব না বিবেচনা করেই স্টকহোমের ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূতকে আমন্ত্রণ জানানো হয় পুরস্কারটি কবির পক্ষে গ্রহণ করবার জন্য। রাষ্ট্রদূত কবির ধন্যবাদ বার্তা পাওয়ার জন্য যোগাযোগ করেন বাংলার তৎকালীন গভর্নর লর্ড কারমাইকেলের সঙ্গে। ১০ ডিসেম্বর সোনার মেডেল ও ডিপ্লোমা গ্রহণ করেন রাষ্ট্রদূত ক্লাইভ। তিনিই পড়ে শোনান রবীন্দ্রনাথের পাঠানো ধন্যবাদ বার্তা। পরের বছরের ২৯ জানুয়ারি বৃহস্পতিবার কলকাতার গভর্নর হাউজে সে মেডেল ও ডিপ্লোমা সুইডিস কনসাল এবং সরকারি বেসরকারি বহু বিশিষ্ট ব্যক্তির উপস্থিতিতে রবীন্দ্রনাথের হাতে তুলে দেন লর্ড কারমাইকেল।

পুরস্কারপ্রাপ্ত কবিকে নোবেল বক্তৃতা দানের ব্যাপারে যে শর্ত ছিল সেটি তাহলে কবে পূর্ণ হলো? ততদিনে সাত বছর পার হয়ে গেছে। ১৯২১ সালে ২৬ মে বিকেল সাড়ে চারটায় কবি তাঁর নোবেল বক্তৃতাটি প্রদান করেন।
এই তো গেল রবীন্দ্রনাথের নোবেল পাওয়ার কথা। আর ইয়েটসের? তাঁর নাম মোট সাতবার প্রস্তাবিত হয়। প্রথমবার ১৯০২ সালে, অর্থাৎ রবীন্দ্রনাথের নাম উপস্থাপিত হওয়ার ১১ বছর আগে। এরপর ১৯১৪, ১৯১৫, ১৯১৮, ১৯২১, ১৯২২ ও ১৯২৩। শেষ দুইবার তাঁর নাম প্রস্তাব করে নোবেল কমিটি নিজে। সর্বশেষ বার তিনি নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হন। তাঁর নাম নোবেল কমিটির পক্ষ থেকে প্রস্তাবের কথা শুনে কারও কারও ভ্রু কুঁচকাবে আশঙ্কায় জানিয়ে রাখতে চাই, ১৯৬০ সাল পর্যন্ত নোবেল কমিটি তিন বছরে মোট আটজনের নাম প্রস্তাব করেছিল। ১৯২২ সালে করেছিল ছয়জনকে যাঁদের কেউই নোবেল পাননি। ১৯৪৮ সালে করেছিল রুশ লেখক মিখাইল সলোকভের নাম যিনি সেবার নোবেল না পেলেও ১৯৬৫ সালে পান অন্য একজনের দ্বারা প্রস্তাবিত হয়ে। আর ১৯২৩ সালে কমিটি যে একটি নামই প্রস্তাব করে তিনি হলেন ডব্লিউ বি ইয়েটস।

ইস্টইয়র্ক, অন্টারিও, কানাডা

- Advertisement -

Related Articles

- Advertisement -

Latest Articles