
আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছে কানাডাকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলতে কর ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনল অটোয়া। এবার কানাডায় ১০০ কোটি কানাডীয় ডলার বা তার বেশি বিনিয়োগের পরিকল্পনা করা সংস্থাগুলির অ্যাডভান্স ইনকাম ট্যাক্স রুলিং সংক্রান্ত আবেদনকে অগ্রাধিকার দেবে কানাডা রেভিনিউ এজেন্সি। বিনিয়োগের আগে প্রস্তাবিত প্রকল্পে আয়কর আইন কীভাবে প্রযোজ্য হবে, সে বিষয়ে আগাম স্পষ্টতা পাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে বিনিয়োগকারীদের জন্য।
এই ঘোষণা এমন এক সময়ে এল, যখন প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির সরকার আগামী পাঁচ বছরে কানাডায় ১ ট্রিলিয়ন ডলারের মোট বিনিয়োগ আকর্ষণের লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে। একই সময়ে টরন্টোতে ১৪ ও ১৫ সেপ্টেম্বর প্রথমবারের মতো আয়োজিত হয়েছে কানাডা বিনিয়োগ সম্মেলন, যেখানে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী ও সম্পদ ব্যবস্থাপকদের একত্রিত করা হয়েছে।
১৪ সেপ্টেম্বর কানাডা রেভিনিউ এজেন্সি জানায়, ১০০ কোটি ডলার বা তার বেশি বিনিয়োগের সঙ্গে যুক্ত অ্যাডভান্স ইনকাম ট্যাক্স রুলিং আবেদনগুলিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে কোনও বড় প্রকল্পে মূলধন বিনিয়োগের আগে সংশ্লিষ্ট আয়কর আইনের প্রয়োগ সম্পর্কে কানাডা রেভিনিউ এজেন্সির কাছ থেকে বাধ্যতামূলক সিদ্ধান্ত বা স্পষ্টতা পাওয়ার সুযোগ থাকবে। কানাডা সরকারের বক্তব্য, বড় প্রকল্পের ক্ষেত্রে কর সংক্রান্ত অনিশ্চয়তা কমলে বিনিয়োগকারীদের আর্থিক পরিকল্পনা ও সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হবে। কানাডা রেভিনিউ এজেন্সি জানিয়েছে, যেসব আবেদন এই অগ্রাধিকার ব্যবস্থার আওতায় পড়বে না, সেগুলির ক্ষেত্রে প্রচলিত ৯০ কর্মদিবসের পরিষেবা-মান বজায় থাকবে।
কানাডার অর্থমন্ত্রী এবং ন্যাশনাল রেভিনিউ মন্ত্রী ফ্রাসোয়াঁ-ফিলিপ শ্যাম্পেইনের বক্তব্য, বড় প্রকল্পে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কর ব্যবস্থার পূর্বানুমানযোগ্যতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ১০০ কোটি ডলার বা তার বেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে আগাম কর-সংক্রান্ত সিদ্ধান্তকে অগ্রাধিকার দেওয়ার ফলে বিনিয়োগকারীরা প্রকল্প এগিয়ে নেওয়ার আগে প্রয়োজনীয় স্পষ্টতা পাবেন বলে তাঁর দাবি। সরকারের এই উদ্যোগটি প্রথম কানাডা বিনিয়োগ সম্মেলনের আগেই ঘোষণা করা হয়। এর আগে ২০২৬ সালের বসন্তের অর্থনৈতিক আপডেটেও বৃহৎ ও অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের জন্য AITR আবেদনকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা জানানো হয়েছিল।
১৪-১৫ সেপ্টেম্বর টরন্টোয় অনুষ্ঠিত কানাডা বিনিয়োগ সম্মেলনে প্রায় ৩০টি দেশের বিনিয়োগকারী অংশ নেন। কানাডার প্রধানমন্ত্রীর দফতর জানিয়েছে, অংশগ্রহণকারী সংস্থাগুলি সম্মিলিতভাবে ১০০ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি সম্পদ পরিচালনা করে। সম্মেলনে জ্বালানি, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, প্রতিরক্ষা, পরিবহণ ও পরিকাঠামোর মতো ক্ষেত্রে কানাডার বিনিয়োগের সুযোগ তুলে ধরা হয়। প্রধানমন্ত্রী কার্নি তাঁর বক্তব্যে আগামী পাঁচ বছরে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ আকর্ষণের লক্ষ্য পুনর্ব্যক্ত করেন।
কানাডা সরকারের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, প্রথম কানাডা বিনিয়োগ সম্মেলনের পর প্রায় ৫০০ বিলিয়ন ডলারের নতুন বিনিয়োগ প্রতিশ্রুতি এসেছে। এর মধ্যে কানাডার বড় পেনশন ফান্ড, বিমা সংস্থা এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকেই প্রায় ১০০ বিলিয়ন ডলারের নতুন মূলধন বিনিয়োগের ঘোষণা করা হয়েছে।
উদাহরণ হিসেবে, সিপিপি ইনভেস্টমেন্টস ও ব্রুকফিল্ড অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট মিলে গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামো ও কৌশলগত শিল্পে বিনিয়োগের জন্য ৫০ বিলিয়ন ডলারের ম্যাপল ফান্ড চালুর ঘোষণা করেছে। পিএসপি ইনভেস্টমেন্টস কানাডায় তাদের বিনিয়োগ ৩০-৪০ শতাংশ বাড়ানোর পরিকল্পনা জানিয়েছে, যা অতিরিক্ত প্রায় ২৫ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগের সমান।
বিশ্ব অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা, বাণিজ্যিক সম্পর্কের পরিবর্তন এবং বিনিয়োগের প্রতিযোগিতা বাড়ার মধ্যে কানাডা নিজেদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি বিদেশি ও প্রাতিষ্ঠানিক পুঁজি আকর্ষণের চেষ্টা করছে। সরকারের পরিকল্পনায় জ্বালানি, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ, পরিবহণ, ডেটা অবকাঠামো এবং প্রতিরক্ষার মতো কৌশলগত ক্ষেত্র বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।
অর্থাৎ, কর সংক্রান্ত আগাম নিশ্চয়তা দেওয়ার এই পদক্ষেপকে বৃহত্তর বিনিয়োগ-কৌশলের একটি অংশ হিসেবেই দেখছে অটোয়া। লক্ষ্য শুধু নতুন বিনিয়োগের পরিমাণ বাড়ানো নয়, বরং বড় প্রকল্পের ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণের অনিশ্চয়তা কমিয়ে কানাডাকে আন্তর্জাতিক পুঁজির কাছে আরও প্রতিযোগিতামূলক করে তোলা।

