
রাত নামছে, কিন্তু অন্ধকার নামছে না! শহরের রাস্তা, বাড়ির বারান্দা, পার্কিং লট আর বাণিজ্যিক ভবনের কৃত্রিম আলোয় ক্রমেই মুছে যাচ্ছে রাতের স্বাভাবিক অন্ধকার। গবেষণার তথ্য বলছে, প্রতি বছর পৃথিবীর রাতের আকাশ প্রায় ১০ শতাংশ করে উজ্জ্বল হচ্ছে। এর ফলে শুধু তারাভরা আকাশ দেখার সুযোগই কমছে না, বিপন্ন হচ্ছে মানুষ, প্রাণী ও পুরো বাস্তুতন্ত্র।
যুক্তরাষ্ট্রের পোর্টল্যান্ডের মতো আধুনিক শহরে রাতে ঘরের আলো নিভিয়ে দিলেও জানালা দিয়ে ঢুকে পড়ে বাইরের কৃত্রিম আলোর ঝলকানি। রাস্তার বাতি, ভবনের আলো কিংবা পার্কিং লটের তীব্র আলোকসজ্জায় অনেকের কাছেই সত্যিকারের অন্ধকার রাত এখন প্রায় অপরিচিত।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ-পূর্ব ওরেগনের একটি সংরক্ষিত অন্ধকার অঞ্চল যেন সেই হারিয়ে যাওয়া রাতেরই স্মৃতি ধরে রেখেছে। প্রায় ২৫ লাখ একরজুড়ে বিস্তৃত ওই এলাকায় সূর্যাস্তের কিছুক্ষণ পরই আকাশে একে একে দেখা দেয় শুক্র গ্রহ, উজ্জ্বল নক্ষত্র ও বিভিন্ন নক্ষত্রমণ্ডল। রাত যত গভীর হয়, তত স্পষ্ট হয়ে ওঠে ছায়াপথের আলোর রেখা।
কিন্তু এমন নির্মল রাতের আকাশ এখন পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষের কাছেই বিরল। বিভিন্ন পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিশ্বের প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষ এমন এলাকায় বসবাস করেন, যেখানে রাতের আকাশ কোনো না কোনো মাত্রায় আলো দূষণে আক্রান্ত।
শুধু আকাশ নয়, বিপদে প্রকৃতিও
আলো দূষণের প্রভাব শুধু মানুষের রাতের আকাশ দেখার আনন্দ নষ্ট করছে না; এর বড় প্রভাব পড়ছে প্রকৃতির ওপরও। রাতের অন্ধকার অনেক প্রাণীর স্বাভাবিক জীবনচক্রের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
কৃত্রিম আলোর কারণে চাঁদের আলো অনুসরণ করে চলা প্রাণী ও পতঙ্গ পথ হারাচ্ছে। ডিম থেকে বের হওয়া সামুদ্রিক কচ্ছপ অনেক সময় সমুদ্রের পরিবর্তে কৃত্রিম আলোর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। আলোর চারপাশে ঘুরতে ঘুরতে মারা যাচ্ছে বিভিন্ন পতঙ্গ। জোনাকি ও ব্যাঙের মতো প্রাণীর প্রজননও ব্যাহত হচ্ছে। তীব্র নগর আলোর কারণে পরিযায়ী পাখিরাও পথ হারানোর ঝুঁকিতে পড়ছে।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, অতিরিক্ত কৃত্রিম আলো উদ্ভিদ ও পরাগায়নকারীদের স্বাভাবিক সম্পর্ক ব্যাহত করতে পারে। গাছের অস্বাভাবিক সময়ে ফুল ফোটার মতো পরিবর্তনও ঘটতে পারে। একই সঙ্গে মানুষসহ বিভিন্ন প্রাণীর দৈনন্দিন শারীরিক ঘড়ি বা সার্কাডিয়ান ছন্দ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
মানুষের ঘুমেও প্রভাব
রাতের অন্ধকার মানুষের সুস্থতার সঙ্গেও জড়িত। ঘরের ভেতরের আলো কিংবা জানালার বাইরে থেকে আসা কৃত্রিম আলো ঘুম ও বিশ্রামের স্বাভাবিক পরিবেশ ব্যাহত করতে পারে। তাই আলো দূষণ কমানোর ক্ষেত্রে শুধু আকাশের সৌন্দর্য নয়, মানুষের স্বাভাবিক রাতের পরিবেশ ফিরিয়ে আনার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নিরাপত্তার প্রয়োজনীয়তা মেনে আলোর ব্যবহার করা সম্ভব। সব রাস্তার বাতি বন্ধ করার প্রয়োজন নেই। বরং কোথায় কতটা আলো প্রয়োজন, আলো কোন দিকে যাবে এবং কতটা উজ্জ্বল হবে—এসব বিষয় নিয়ন্ত্রণ করলেই অপ্রয়োজনীয় আলোকদূষণ কমানো সম্ভব।
যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনার ফ্ল্যাগস্টাফ শহর এ ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে আলোকসজ্জা নিয়ন্ত্রণের উদাহরণ তৈরি করেছে। ১৯৫৮ সাল থেকেই সেখানে বহিরঙ্গন আলোর ওপর নিয়ম চালু রয়েছে। পরে শহরটি ‘ডার্ক স্কাই সিটি’ হিসেবে স্বীকৃতি পায়।
এবার মহাকাশ থেকেও আসছে আলো
আলো দূষণের নতুন একটি উৎস তৈরি হয়েছে পৃথিবীর ওপরের মহাকাশেও। সংরক্ষিত অন্ধকার অঞ্চলে দাঁড়িয়েও এখন খালি চোখে আকাশে কৃত্রিম উপগ্রহের চলাচল দেখা যায়। এর ফলে নক্ষত্র ও ছায়াপথের স্বাভাবিক দৃশ্যও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
বিশেষ করে বিপুলসংখ্যক বাণিজ্যিক উপগ্রহ পৃথিবীর কক্ষপথে যুক্ত হওয়ায় জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এসব উপগ্রহের প্রতিফলিত আলো রাতের আকাশ পর্যবেক্ষণে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
মানবসভ্যতার ইতিহাসে রাতের আকাশের গুরুত্ব অপরিসীম। তারার অবস্থান দেখে মানুষ পথ চিনেছে, সময় ও ঋতুর হিসাব করেছে, তৈরি করেছে মানচিত্র ও ক্যালেন্ডার। অথচ নগরায়ন ও কৃত্রিম আলোর বিস্তারে সেই তারাভরা আকাশই এখন অনেকের চোখের আড়ালে।
অন্ধকার তাই শুধু আলোর অনুপস্থিতি নয়—এটি প্রকৃতি, জীববৈচিত্র্য ও মানুষের স্বাভাবিক জীবনেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সেই অন্ধকার হারিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছে রাতের আকাশের বহু চেনা সৌন্দর্যও।

