
একসময় ঋণের বোঝায় রেস্তোরাঁ বন্ধ করে দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন দুই ভাই। প্রতিদিন যেখানে মাত্র কয়েকজন ক্রেতা আসতেন, সেখানেই হঠাৎ শুরু হলো উপচে পড়া ভিড়। রান্নাঘরে ছোলা শেষ, উপকরণ আনতে ছুটতে হচ্ছে আশপাশের দোকান ও বাড়িতে। আর এই নাটকীয় পরিবর্তনের শুরু হয়েছিল মাত্র দুই প্লেট ছোলে ভাটুরের একটি অর্ডার দিয়ে। অর্ডারটি করেছিলেন বলিউড অভিনেত্রী আনুশকা শর্মা, খাবারটি ছিল তার স্বামী ভারতীয় ক্রিকেট তারকা বিরাট কোহলির জন্য।
মুম্বাইয়ের চেম্বুরে জসপাল সিং খালসা ও মহেন্দ্র সিং খালসার ছোট রেস্তোরাঁ ‘দিল্লি সে’। মাত্র ২৫০ বর্গফুট জায়গায় তিনটি টেবিল ও নয়টি চেয়ার নিয়ে ২০২১ সালের অক্টোবরে যাত্রা শুরু করেছিল প্রতিষ্ঠানটি। দিল্লির স্বাদের ছোলে ভাটুরে ছিল তাদের প্রধান আকর্ষণ। কিন্তু ক্রেতা কম থাকায় ব্যবসা জমছিল না।
এক বছরের মধ্যেই দুই ভাইয়ের মাথায় জমে যায় প্রায় ১৮ লাখ রুপি ঋণ। ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর নাগাদ রেস্তোরাঁ বন্ধ করে দেওয়ার কথাও ভাবছিলেন তারা। ঠিক তখনই বদলে যায় গল্প।
২০২২ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর কৌতুকশিল্পী অভিষেক উপমন্যু হঠাৎ তাদের রেস্তোরাঁয় গিয়ে ছোলে ভাটুরে খান। খাবার পছন্দ হওয়ায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশংসা করেন তিনি। তার পোস্ট ছড়িয়ে পড়তেই ‘দিল্লি সে’তে বাড়তে থাকে ক্রেতার সংখ্যা।
তবে আসল চমক তখনও বাকি।
অভিষেকের সেই পোস্ট নজরে পড়ে আনুশকা শর্মার। স্বামী বিরাট কোহলির ছোলে ভাটুরের প্রতি বিশেষ পছন্দের কথা জানতেন তিনি। তাই পোস্ট দেখে চেম্বুরের ওই রেস্তোরাঁ থেকে বিরাটের জন্য দুই প্লেট ছোলে ভাটুরে অর্ডার করেন অভিনেত্রী।
অর্ডারটি পৌঁছে দিতে হবে প্রায় সাড়ে ১৩ কিলোমিটার দূরের জুহুতে। দুই প্লেট খাবারের দাম ছিল মাত্র ২৪০ রুপি। দূরে খাবার পৌঁছে দেওয়ার অতিরিক্ত খরচের কথা জানালে অর্ডারদাতা ব্যাংক হিসাবের তথ্য চেয়ে নেন। এতে সন্দেহে পড়ে যান জসপাল। শেষ পর্যন্ত ভাইয়ের পরামর্শে অর্ডারটি গ্রহণ করেন তিনি।
এরপর ফোনের ওপাশ থেকে জানানো হয়—খাবারটি বিরাট কোহলির জন্যই অর্ডার করা হয়েছে।
তবুও বিশ্বাস হচ্ছিল না জসপালের। শেষ পর্যন্ত ২০২২ সালের ৫ অক্টোবর বিরাটের জন্য খাবার পৌঁছে দেন দুই ভাই। রেস্তোরাঁয় ফিরে তারা জানতে পারেন, আনুশকা তাদের খাবারের প্রশংসা করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করেছেন।
এরপর যা ঘটে, তা যেন সিনেমার গল্প।
আনুশকার পোস্টের পর মাত্র আধ ঘণ্টার মধ্যেই রেস্তোরাঁয় ভিড় জমে যায়। মুহূর্তেই শেষ হয়ে যায় দিনের সব খাবার। ফোনে আসতে থাকে একের পর এক অর্ডার। পরিস্থিতি সামাল দিতে শেষ পর্যন্ত পুলিশও ডাকতে হয়।
চাহিদা এতটাই বেড়ে যায় যে, একসঙ্গে ছয় থেকে দশ প্লেট করে অর্ডার আসতে থাকে। রান্নার উপকরণ ফুরিয়ে গেলে আশপাশের বাড়ি ও দোকান থেকে ছোলা-মসলা সংগ্রহ করে রান্না চালিয়ে যান দুই ভাই।
বিরাট-আনুশকার অর্ডারের আগে প্রতিদিন প্রায় আট কেজি ছোলা রান্না করতেন তারা। সেই পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ১০০ কেজিতে। বর্তমানে প্রতিদিন প্রায় ১২৫ কেজি ছোলা ভেজানো হয়, যা রান্নার পর পরিমাণে প্রায় এক টনে পৌঁছে যায়।
একসময় যে রেস্তোরাঁটি ১৮ লাখ রুপি ঋণের চাপে বন্ধ হওয়ার পথে ছিল, বর্তমানে ‘দিল্লি সে’র চারটি শাখা রয়েছে—চেম্বুর, মুলুন্দ, আন্ধেরি পশ্চিম ও বাসাইয়ে। প্রতিদিন বিক্রি হয় প্রায় তিন হাজার প্লেট ছোলে ভাটুরে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমানে রেস্তোরাঁটির মাসিক বিক্রি প্রায় ২ কোটি রুপি। দুই ভাইয়ের জীবনে সেই মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া ঘটনা ছিল মাত্র দুই প্লেট ছোলে ভাটুরের একটি অর্ডার—যার পেছনে ছিলেন আনুশকা শর্মা।

