
ঢাকাই চলচ্চিত্রের প্রয়াত নায়ক সালমান শাহ যেন সময়ের সীমানা পেরিয়ে যাওয়া এক নাম। জনপ্রিয়তার শীর্ষে থাকা অবস্থায় মাত্র ২৫ বছর বয়সে তাঁর আকস্মিক মৃত্যু ঘটে ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর। এরপর কেটে গেছে প্রায় তিন দশক। কিন্তু এত বছর পরও তাঁর প্রতি দর্শক-ভক্তদের আগ্রহে ভাটা পড়েনি।
নব্বইয়ের দশকের এই নায়ককে ঘিরে আজও তরুণ প্রজন্মের মধ্যে রয়েছে প্রবল কৌতূহল। তাঁর অভিনয়, পোশাক, চুলের ধরন, ব্যক্তিত্ব এবং সিনেমার গান এখনো অনুসরণ করেন অনেকে। এমনকি যারা তাঁর মৃত্যুর পর জন্মেছেন, তাদের মধ্যেও তৈরি হয়েছে সালমান শাহকে ঘিরে গভীর অনুরাগ।
ঢাকার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ফাহমিদা জামান ইষ্টি জানান, সালমান শাহকে নিজের চোখে দেখতে না পারা তাঁর জীবনের অন্যতম আফসোস। ছোটবেলায় বাবা-মায়ের কাছ থেকেই সালমান শাহ সম্পর্কে জানতে শুরু করেন তিনি। স্বল্প সময়ের ক্যারিয়ারে তাঁর সাফল্য এবং রহস্যঘেরা মৃত্যু পরবর্তীতে ইষ্টির আগ্রহ আরও বাড়িয়ে দেয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নাফিছা নূজহাতের কাছে সালমান শাহ আকর্ষণীয় তাঁর ব্যতিক্রমী ব্যক্তিত্ব ও অভিনয়ের কারণে। তাঁর মতে, অভিনয় থেকে ফ্যাশন—সব ক্ষেত্রেই সালমান শাহ ছিলেন সময়ের চেয়ে এগিয়ে। তাই তিন দশক পরও তাঁর পোশাক, স্টাইল, সিনেমা ও গান জনপ্রিয়।
অল্প সময়েই তারকাখ্যাতি
১৯৯৩ সালে ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ সিনেমার মাধ্যমে ঢালিউডে নায়ক হিসেবে সালমান শাহর উত্থান ঘটে। প্রথম সিনেমাতেই ব্যাপক জনপ্রিয়তা পাওয়ার পর মাত্র চার বছরের ক্যারিয়ারে তিনি ২৭টি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। এর মধ্যে অধিকাংশ সিনেমাই দর্শকপ্রিয়তা অর্জন করে।
চলচ্চিত্র গবেষক, নির্মাতা ও অধ্যাপক ড. জাকির হোসেন রাজুর মতে, সালমান শাহকে ঘিরে যে ধরনের ভক্তগোষ্ঠী তৈরি হয়েছে, তা বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে বিরল। তাঁর ফ্যাশন ও জীবনযাপনের বিভিন্ন দিকও এখনো দর্শকদের মধ্যে অনুসরণের প্রবণতা তৈরি করে।
মৃত্যুর পরও মুছে যায়নি স্মৃতি
সালমান শাহকে সিলেটের হযরত শাহজালালের দরগাহসংলগ্ন কবরস্থানে দাফন করা হয়। তিন দশক পরও সেখানে তাঁর কবর জিয়ারত করতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ভক্তরা আসেন। এক ভক্ত শুধু কবর দেখার জন্য জামালপুর থেকে প্রায় সাড়ে তিনশ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে সিলেটে যাওয়ার কথাও জানিয়েছেন।
তাঁর মৃত্যুকে ঘিরে তৈরি হওয়া নানা প্রশ্নও মানুষের আগ্রহ বাড়িয়েছে। মৃত্যুর পর একাধিক তদন্তে আত্মহত্যার কথা উঠে এলেও পরিবারের পক্ষ থেকে তা প্রত্যাখ্যান করা হয়। পরে একাধিকবার তদন্ত হয়েছে এবং ২০২৫ সালে আদালতের নির্দেশে তাঁর মৃত্যুর ঘটনায় হত্যা মামলা গ্রহণ করে পুনরায় তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়। বর্তমানে মামলাটি সিআইডি তদন্ত করছে।
রহস্য ও জনপ্রিয়তার মিশেল
সালমান শাহর মৃত্যুর কারণ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ভিন্নমত রয়েছে। বিভিন্ন সময়ে তদন্তকারী সংস্থার প্রতিবেদনে আত্মহত্যার কথা বলা হলেও তাঁর পরিবার সেই সিদ্ধান্ত মেনে নেয়নি। অন্যদিকে মামলায় অভিযুক্ত ব্যক্তিরাও হত্যার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। ফলে মৃত্যুর ঘটনাটি এখনো আলোচনায় রয়েছে।
তবে মৃত্যুর রহস্যের বাইরেও সালমান শাহর জনপ্রিয়তার মূল কারণ তাঁর অভিনয়, ব্যক্তিত্ব ও নিজস্ব স্টাইল। খুব অল্প সময়ের ক্যারিয়ারেও তিনি দর্শকদের মনে যে জায়গা তৈরি করেছিলেন, তা তিন দশক পরও অটুট।
সময়ের সঙ্গে চলচ্চিত্রের ধরন বদলেছে, বদলেছে দর্শকের রুচিও। কিন্তু সালমান শাহর নাম এখনো নতুন প্রজন্মের কাছে পরিচিত। তাঁর সিনেমা, গান ও ফ্যাশন নিয়ে আলোচনা চলে, ভক্তরা ছুটে যান তাঁর কবরের কাছে।
এ কারণেই হয়তো সালমান শাহ শুধু নব্বইয়ের দশকের একজন জনপ্রিয় নায়ক নন; তিনি বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের এমন এক অধ্যায়, যার প্রতি মানুষের কৌতূহল ও আবেগ প্রজন্ম পেরিয়েও টিকে আছে।

