
কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলতে থাকা বাণিজ্য সংঘাত এবার শুধু শুল্ক আর পাল্টা শুল্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না দুই দেশের দীর্ঘদিনের আন্তঃসীমান্ত বাণিজ্যিক সম্পর্কের কাঠামোতেই স্থায়ী পরিবর্তন আসতে পারে। বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, কয়েক দশক ধরে যে অর্থনৈতিক নির্ভরতা ও ঘনিষ্ঠ বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল, বর্তমান পরিস্থিতি তার মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে।
নতুন শুল্কনীতি এবং বাণিজ্য অংশীদার হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর আস্থার প্রশ্নে কানাডার বহু সংস্থা ইতিমধ্যেই বিকল্প বাজারের দিকে নজর দিচ্ছে। মার্কিন বিনিয়োগ কৌশলী পিটার শিফের মতে, কানাডিয়ান সংস্থাগুলোর এই বাজার-বদলের প্রবণতা আগামী দিনে আরও স্পষ্ট হতে পারে। তাঁর বক্তব্য, নতুন বাণিজ্য চুক্তি ও বিকল্প অংশীদারিত্ব তৈরি হওয়ার ফলে একবার যে বাণিজ্যিক সম্পর্কের পুনর্বিন্যাস শুরু হয়েছে, তা সহজে আগের অবস্থায় ফিরবে না।
শিফের মতে, লাভের সম্ভাবনা থাকলে কিছু কোম্পানি ভবিষ্যতেও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ব্যবসা চালিয়ে যাবে। তবে একই সঙ্গে আরও বেশি সংখ্যক কানাডিয়ান ব্যবসা নতুন ক্রেতা ও নতুন বাজার খুঁজবে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই বিকল্প বাজারগুলিই তাদের কাছে তুলনামূলকভাবে বেশি আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে। এর সরাসরি প্রভাব পড়বে দুই দেশের মোট আন্তঃসীমান্ত বাণিজ্যের পরিমাণে।
মার্কিন ডলারের মূল্য দুর্বল হলে কানাডিয়ান কোম্পানিগুলোর যুক্তরাষ্ট্র-নির্ভরতা কমার প্রবণতা আরও দৃশ্যমান হতে পারে বলে মনে করছেন শিফ। তাঁর যুক্তি, ভৌগোলিকভাবে যুক্তরাষ্ট্র কানাডার সবচেয়ে সহজলভ্য ও স্বাভাবিক বাণিজ্য অংশীদার হলেও ব্যবসাগুলি কেবল নিকটবর্তী বাজারের ওপর নির্ভর করে থাকতে বাধ্য নয়। কানাডিয়ান সংস্থাগুলির জন্য যুক্তরাষ্ট্রের বাজারের অন্যতম সুবিধা হল দূরত্ব কম হওয়া এবং পরিবহণ তুলনামূলকভাবে সহজ হওয়া। কিন্তু বিকল্প বাজারে যদি একই সঙ্গে ভালো দাম, স্থিতিশীল বাণিজ্যিক পরিবেশ এবং দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারিত্বের সুযোগ পাওয়া যায়, তাহলে অনেক সংস্থাই সেই পথ বেছে নিতে পারে। শিফের বক্তব্যের সারকথা, আমেরিকানরা শুধু কানাডার পণ্যের ক্রেতা নয়, এতদিন তারা ছিল সবচেয়ে সুবিধাজনক ক্রেতা। কিন্তু পরিস্থিতি বদলালে কানাডিয়ান কোম্পানিগুলো অন্য দেশের ক্রেতা ও বাণিজ্য অংশীদার খুঁজে নেওয়ার পথেও এগোতে পারে।
কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ঘনিষ্ঠ বাণিজ্যিক সম্পর্ক অবশ্য নতুন নয়। কয়েক দশক ধরে দুই দেশ একাধিক বাণিজ্য চুক্তির মাধ্যমে পরস্পরের বাজারকে আরও উন্মুক্ত করেছে। ধীরে ধীরে কমেছে বাণিজ্যিক বাধা, বেড়েছে পণ্য ও পরিষেবার আন্তঃসীমান্ত প্রবাহ এবং দুই দেশের অর্থনীতির পারস্পরিক নির্ভরতাও গভীর হয়েছে। সেই দীর্ঘ প্রক্রিয়াই বর্তমানে বড় পরীক্ষার মুখে। কারণ, ব্যবসায়িক সিদ্ধান্তে শুধু শুল্কের হার নয়, ভবিষ্যতে কোনও বাজার কতটা নির্ভরযোগ্য থাকবে সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঙ্ক স্কুল অব গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স অ্যান্ড পাবলিক পলিসির অধ্যাপক ড্রিউ ফেগানের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে একটি দীর্ঘস্থায়ী পরিবর্তনের সম্ভাবনা রয়েছে। তাঁর ব্যাখ্যায়, বিষয়টি কেবল শুল্ক আরোপের ফল নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে মানসিকতার পরিবর্তনও। ফেগানের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ক্রমশ বেশি সংরক্ষণবাদী ও জাতীয়তাবাদী বাণিজ্যনীতির দিকে এগিয়ে যাওয়ায় কানাডার ব্যবসায়িক মহলেও ভবিষ্যৎ বাণিজ্য সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে ভাবনার প্রয়োজন তৈরি হয়েছে।
ফলে কানাডা-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য সংঘাতের প্রভাব তাৎক্ষণিকভাবে শুল্ক, পণ্যদাম বা আমদানি-রফতানির পরিসংখ্যানে দেখা গেলেও, এর আরও বড় প্রভাব পড়তে পারে দীর্ঘমেয়াদে। কানাডিয়ান কোম্পানিগুলো যদি বিকল্প বাজারে স্থায়ীভাবে জায়গা করে নেয়, তাহলে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক আগের মতো ঘনিষ্ঠ থাকলেও তার চরিত্র বদলে যেতে পারে। অর্থাৎ, বর্তমান বাণিজ্য সংঘাত শেষ পর্যন্ত শুধু একটি শুল্কযুদ্ধ হিসেবে থেকে যাবে, নাকি উত্তর আমেরিকার বহু দশকের বাণিজ্যিক ব্যবস্থাকেই নতুন করে সাজাবে—সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
সোহেলি আহমেদ সুইটি : লোকাল জার্নালিজম ইনিশিয়েটিভ রিপোর্টার

