পাগলা মসজিদে এবার মিললো রেকর্ড ১৬ কোটি টাকা

পাগলা মসজিদে এবার মিললো রেকর্ড ১৬ কোটি টাকা - the Bengali Times
বার বস্তার হিসাবে বড় বস্তায় মোট ৪৩ বস্তা টাকা পাওয়া যায় যা বস্তার হিসাবেও সর্বোচ্চ

কিশোরগঞ্জের ঐতিহাসিক পাগলা মসজিদের দান সিন্দুকগুলো যেন বিস্ময়ের ভান্ডার। প্রতিবার খুললেই পাওয়া যায় কয়েক কোটি টাকা। সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে দানের পরিমাণ। এ কারণে প্রতিবারই বাড়ানো হয় দান সিন্দুকের সংখ্যা। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। নির্ধারিত ১০টি দানসিন্দুক খোলার আগেই পূর্ণ হয়ে যাওয়ায় দানবাক্স হিসেবে যুক্ত করা হয় আরো তিনটি ট্রাঙ্ক। এসব উপচে পড়ে কাড়ি কাড়ি টাকায়। ফলে এবারও দানবাক্সের টাকার নতুন রেকর্ড সৃষ্টি হয়েছে। পাওয়া গেছে ১৫ কোটি ৯০ লাখ ৮০ হাজার ১৪৬ টাকা। দান সিন্দুকগুলো শুধু টাকাতেই পূর্ণ ছিলো না। ছিলো স্বর্ণালঙ্কার ও বৈদেশিক মুদ্রাও। সেসবও অন্যান্যবারের চেয়ে বেশি পরিমাণে পাওয়া গেছে। স্বর্ণালঙ্কার পাওয়া গেছে শত ভরির উপরে। যার মধ্যে রয়েছে সোনা, রূপা ও হীরে। দিনার, ইউরো, ডলারসহ বিভিন্ন দেশের মুদ্রার সংখ্যাও ছিলো এবার সর্বোচ্চ। এছাড়া মিলেছে মানতকারীদের ইচ্ছেপূরণের হাজারো চিঠি।

শনিবার পাগলা মসজিদের এসব দানসিন্দুকগুলো খোলা হয়। সকাল ৭টায় মসজিদটির ১০টি দানসিন্দুক এবং ৩টি ট্রাঙ্ক খোলার মধ্য দিয়ে টাকা গণনার কাজ শুরু করা হয়। লোহার সিন্দুকের সিলগালা খুলে প্রথমে টাকাগুলো বের করে বস্তায় ভরা হয়। এবার বস্তার হিসাবে বড় বস্তায় মোট ৪৩ বস্তা টাকা পাওয়া যায়, যা বস্তার হিসাবেও সর্বোচ্চ। পরে বস্তাগুলো মসজিদের দোতলায় নিয়ে মেঝেতে ঢালা হয়। এরপর শুরু হয় টাকা গণনার কাজ। এবার টাকা গণনার কাজেও সর্বোচ্চসংখ্যক মানুষকে যুক্ত করা হয়। মোট ৬৭১ জনের একটি বিরাট টিম টাকা গণনার কাজে সম্পৃক্ত ছিলেন।

- Advertisement -

পাগলা মসজিদ মাদরাসা ও আল জামিয়াতুল ইমদাদিয়ার মোট ৪০৬ জন ছাত্র, পাগলা মসজিদের ৩৫ জন স্টাফ, জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের ১৯ জন স্টাফ এবং রূপালী ব্যাংকের ১৩০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী মিলিয়ে মোট ৪৯০ জন টাকা ভাঁজ করা ও গণনার কাজ করেন। র‌্যাব, পুলিশ ও আনসারের ৭৫ জন সদস্য তাদের সহায়তা করেন। টাকা গণনার এ এলাহী কাণ্ড তদারকি করেন ১৩ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট। গণনা শেষ হয় রাত সাড়ে ৮টায়। এবারের টাকা মিলিয়ে পাগলা মসজিদের ব্যাংকে জমা হওয়া টাকার পরিমাণ ১৩০ কোটি ছাড়িয়েছে। এর আগে পাগলা মসজিদের ব্যাংক হিসেবে ১১৪ কোটি টাকা ছিলো।

এবার ছয় মাস পর এ মসজিদের দানসিন্দুকগুলো খোলা হয়। এর আগে সর্বশেষ গত বছরের ২৭শে ডিসেম্বর দানসিন্দুক খোলা হয়েছিল। তখন ১১ কোটি ৭৮ লাখ ৪৮ হাজার ৫৩৮ টাকা পাওয়া গিয়েছিল। এছাড়া পাওয়া গিয়েছিলো বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা, সোনা, রূপা ও হীরার গয়না। এবার মসজিদের নির্দিষ্ট ১০টি দানসিন্দুক অন্তত দেড় মাস আগেই দানের টাকায় পূর্ণ হয়ে গিয়েছিলো। বিভিন্ন কারণে সে সময় দানসিন্দুক খোলা হয়নি। তখন দান অব্যাহত রাখার সুবিধার্থে তিনটি বিশাল ট্রাঙ্ক যুক্ত করা হয়। সেসবও বিপুল দানে পূর্ণ হয়ে গিয়েছিলো।

শনিবার সকাল ৭টায় কিশোরগঞ্জের জেলা প্রশাসক সোহানা নাসরিনের উপস্থিতিতে দান সিন্দুক খোলা হয়। অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও দানবাক্স খোলা কমিটির আহ্বায়ক মো. এরশাদুল আহমেদ এ সময় উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) নাজমুস সাকিব খান, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মোহাম্মদ নাহিদ হাসান খান, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. ইশতিয়াক ইমন, কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. কামরুল হাসান মারুফ, রূপালী ব্যাংকের এজিএম মোহাম্মদ আলী হারেছী এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটগণসহ মসজিদ কমিটির সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।

টাকা গণনার কাজ চলার সময় সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন জেলা প্রশাসক ও মসজিদ কমিটির সভাপতি সোহানা নাসরিন। তিনি বলেন, পাগলা মসজিদ ও ইসলামিক কমপ্লেক্সের খরচ চালিয়ে দানের বাকি টাকা ব্যাংকে জমা রাখা হয়। এ পর্যন্ত সরাসরি দানের ১১৪ কোটি টাকা ও অনলাইনে দানের ২৪ লক্ষ ৭৬ হাজার ৮৮২ টাকা ব্যাংকে জমা আছে। এছাড়া মসজিদে দান করা বৈদেশিক মুদ্রাসহ বিপুল পরিমাণ স্বর্ণালংকার জেলা প্রশাসনের ট্রেজারিতে রাখা আছে। ব্যাংকে জমা টাকার লভ্যাংশ থেকে জেলার বিভিন্ন মসজিদ, মাদ্রাসা ও এতিমখানায় অনুদান দেওয়ার পাশাপাশি অসহায় ও জটিল রোগে আক্রান্তদের সহায়তা করা হয়।

পাগলা মসজিদে মানুষ টাকাপয়সা, স্বর্ণালঙ্কার, গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগী, ফল-ফলাদি, কোরআন শরীফ ইত্যাদি দান করেন। এর মধ্যে টাকাপয়সা ও স্বর্ণালঙ্কার মসজিদের দানসিন্দুকগুলোতে জমা পড়ে। অন্যদিকে গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগী, ফল-ফলাদি, কোরআন শরীফ ইত্যাদি নিলামঘরে জমা দিতে হয়। প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ দানসিন্দুকে নগদ টাকা-পয়সা ও স্বর্ণালঙ্কার দান করা ছাড়াও মসজিদের নিলামঘরে নানা ধরনের জিনিসপত্র দান করেন। অনেকের মানত থাকে, তারা সেসব দিয়ে যান। নিলামঘরে প্রতিদিন এসব নিলামে বিক্রি করে দেয়া হয়। এ নিলাম থেকে পাওয়া টাকাও ব্যাংকে জমা করা হয়। জেলা শহরের নরসুন্দা নদী তীরের ঐতিহাসিক এ মসজিদটিতে প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ এসে দান করছেন। যারা দান করতে আসেন তারা ধারণা করে থাকেন, এখানে দান করলে মনের আশা পূরণ হয়।

- Advertisement -

Related Articles

Latest Articles