ট্রেনের ধাক্কায় মা-ছেলের মৃত্যু, যে দৃশ্য কাঁদাল সবাইকে

ট্রেনের ধাক্কায় মা-ছেলের মৃত্যু, যে দৃশ্য কাঁদাল সবাইকে - the Bengali Times
কাঁধে স্ত্রী ও বুকে আহত সন্তানকে জড়িয়ে হাসপাতালে ছুটছেন সুজন

ঈদের কেনাকাটার জন্য স্ত্রী ও দুই সন্তান নিয়ে গত বুধবার নরসিংদী শহরে এসেছিলেন সুজন মিয়া। মনের খুশিতে কেনাকাটা শেষে রাত সাড়ে ৮টার দিকে নরসিংদী রেলস্টেশনে আসেন তারা।

রেললাইন পার হয়ে হাজেরা টাওয়ারের সামনে থেকে বাড়ির উদ্দেশে অটোরিকশায় উঠার কথা ছিল তাদের। স্টেশনে এসে তারা দেখেন, ঢাকাগামী আন্তনগর মহানগর এক্সপ্রেস ট্রেন দীর্ঘক্ষণ ধরে স্টেশনের ১ নম্বর প্ল্যাটফর্মে থেমে আছে। অন্য অনেকের মতো তারাও মহানগরের একটি বগির দরজা দিয়ে উঠে অন্য দরজা দিয়ে নামেন।
সুজনের স্ত্রী সাথী বেগমের কোলে ২ বছরের ছেলে হাছেন।

- Advertisement -

এ সময় হাছেনকে নিয়ে প্রথমে নামে সাথী। ৫ বছর বয়সী মেয়ের হাত ধরে পেছনে পেছনে যাচ্ছেন বাবা সুজন মিয়া। ওই সময় আন্তনগর কক্সবাজার এক্সপ্রেস ট্রেনটি দ্রুতগতিতে ঢাকার দিকে যাচ্ছিল। ট্রেনের ধাক্কায় কোলে থাকা হাছেনসহ সাথী বেগম ছিটকে পড়ে মাথাসহ শরীরের বিভিন্ন জায়গায় আঘাত পান।

এ সময় স্ত্রীকে কাঁধে ও আদরের সন্তানকে বুকে জড়িয়ে সুজন ছুটেন হাসপাতালে। ১০০ শয্যাবিশিষ্ট নরসিংদী জেলা হাসপাতালের জরুরি বিভাগে সুজন স্ত্রী ও সন্তানকে নিলে চিকিৎসক তাদের মৃত ঘোষণা করেন। চিকিৎসক জানান, হাসপাতালে আর আগেই তাদের মৃত্যু হয়েছে।
এ ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ওই ভিডিওতে দেখা যায়, আহত স্ত্রীকে কাঁধে ও এক হাত দিয়ে ছেলে হাছেনকে বুকে জড়িয়ে ধরেছেন।

অন্য হাতে মেয়েকে ধরে দ্রুত হাসপাতালে ছুটছেনে সুজন।

আলী আজম নামে একজন এ ঘটনার একটি ছবি তার ফেসবুক ওয়ালে শেয়ার করে লিখেছেন, ‘কাঁধে স্ত্রীর লাশ, বুকে আদরের সন্তানের লাশ, বাম হাতে ধরলেন পেছনে হাউমাউ করে কান্না করা মেয়ে সন্তানটির হাত। গত বুধবার রাতে নরসিংদী রেলওয়ে স্টেশনে কক্সবাজার এক্সপ্রেস ট্রেনের ধাক্কায় মা ও সন্তানের মৃত্যু হয়। নিমিষেই পরিবারটিতে ঈদের আনন্দ বিষাদে রূপ নেয়। মাঝে মাঝে জীবন এভাবেই থমকে যায়। আল্লাহ পরিবারটিকে ধৈর্য্য ধরার তৌফিক দান করুন।’

মতলু মলিক নামে এক সাংবাদিক ফেসবুক একই ছবি ফেসবুকে শেয়ার করে লিখেছেন, ‘ঈদযাত্রায় ট্রেনের ধাক্কায় স্ত্রী ও শিশু সন্তান নিহত। কাঁধে স্ত্রী আর বুকে সন্তানের নিথর দেহ। আরেক শিশু সন্তানকে ডান হাতে ধরে ফিরে যাওয়া, কী যে হৃদয় বিদারক। এক জীবনে এতটা কষ্ট, কেমনে সহ্য হবে? হে আল্লাহ, তুমি রহম করো।

বীর সাহাবি নামে একজন লিখেছেন, ‘নরসিংদী রেলস্টেশনে আন্তঃনগর কক্সবাজার এক্সপ্রেস ট্রেনের ধাক্কায় সুজন মিয়ার স্ত্রী সাথী বেগম (২৭) এবং ছেলে হাছেন মিয়া (২) মারাত্মকভাবে আহত হয়। ঘটনাটি গতকাল রাত সাড়ে আটটার ঘটনা। সুজনের সামনেই এ ঘটনা ঘটে। সুজন দিনমজুর। ঈদের কেনাকাটা করে বাসায় যাচ্ছিল। ট্রেনের ধাক্কায় চরমভাবে আহত সাথী ও মাত্র ২ বছরের হাছেনকে কেউ হাসপাতালে নেয়নি। এ সময় সুজনের ৫/৬ বছরের মেয়েও সঙ্গে ছিল।

সুজন মৃতপ্রায় স্ত্রীকে প্রথম বাম কাঁধে তুললেন, এরপর দুই বছরের সন্তানকে বুকে নিলেন। সুজনের হাতে ঈদের বাজার, কেমন করে যেন সেসবের ভেতর এক হাত দিয়ে মেয়ের হাত ধরলেন, তারপর হাসপাতালের দিকে হাঁটা শুরু করলেন। সুজনের চারপাশে মোটা তাজা কত লোক ছিল, জিম করা কেউও থাকতে পারে; কেউ তাদের ধরল না। সুজন হাঁটলেন, হাসপাতালেও পৌঁছে জানলেন স্ত্রী ও সন্তান দুজনেই মারা গেছে।

রেলস্টেশনের এই ভিডিও যারা করেছেন তারা সমেত সেখানে শতশত মানুষ ছিল, কিন্তু সুজনের আহত পরিবারের পাশে কাউকে পাওয়া গেল না….!’

স্ত্রী-ছেলেকে হারিয়ে হাসপাতাল চত্বরেই কান্নায় ভেঙে পড়েন সুজন মিয়া। বলেন, ‘চোখের সামনেই আমার অবুঝ শিশুসন্তান আর স্ত্রীকে হারালাম। ডাইরেক্ট ট্রেন আসতে দেখে চিৎকার করছিলাম, আটকানোরও চেষ্টা করেছি, কিন্তু কিছুই করতে পারিনি।’

নরসিংদী রেলওয়ে ফাঁড়ির উপপরিদর্শক দিলীপ চন্দ্র সরকার বলেন, স্টেশনের ১ নম্বর লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা মহানগর এক্সপ্রেসের একটি বগির দরজা দিয়ে ওঠানামা করতে গিয়ে কক্সবাজার এক্সপ্রেসের ধাক্কায় মা-ছেলের মৃত্যু হয়েছে। এই দুর্ঘটনায় পরিবারের কোনো অভিযোগ না থাকায় ময়নাতদন্ত ছাড়াই লাশ হস্তান্তর করা হয়েছে।

- Advertisement -

Related Articles

Latest Articles