দূরের তারা, কাছের তাঁরা
দ্য বেঙ্গলি টাইমস ডটকম ডেস্ক
অ+ অ-প্রিন্ট
জীবনের বাকিটা সময় এই বিশ্বকাপ স্মৃতির সাগরে ডুব দিয়ে যাবো অবিরাম৷ তুলে আনবো অমূল্য সব মণিমুক্তো৷ এত কাছ থেকে মারাদোনা, ফন বাস্তেন, মেসি, নেইমার, হ্যাজার্ড, মদ্রিচদের দেখা! দূরের তারাদের এমন কাছের হয়ে যাওয়া বলে কথা! মেসির ওই ঐশ্চরিক বাঁ পায়ের পাতা এত ছোট! নেইমার এমন ছিপছিপে; প্রায় হাড় জিরজিরে! পুঁচকে এডেন হ্যাজার্ডের শরীর এত সুগঠিত! রোমালু লুকাকু বিশালদেহী বুঝতাম, তাই বলে এমন দানবের মতো! উগো লরির হাতের পাঞ্জাও দেখি বিশাল! 

ওদিকে মার্কো ফন বাস্তেন আছেন ঠিক আগের মতোই; চুলের আধিক্য কমে যাওয়া এবং রং বদলে যাওয়াটুকুন বাদ দিলে৷ গ্যারি লিনেকারের ভেতর ইংরেজসুলভ অহমিকা তো দেখলাম না! পাচাত্তরেও ফুটবল নিয়ে কেমন মেতে কার্লোস আলবের্তো পাহেইরা! আর ‘পাগলা' হোসে লুইস চিলাভার্তের সেই পাগলাটে চাহনিটা তো রয়েছে ঠিকই; সঙ্গে শিশুর সারল্যমাখা হাসিও৷ বিসেন্তে লিজারাজু এতই ছোটখাট যে, রাস্তা দিয়ে হাঁটলে হারিয়ে যাবেন জনারণ্যে৷ সেই ভিড়েও মাথা উঁচু হয়ে থাকবেন মার্টিন কিওন৷

তাঁরা সবাই দূর আকাশের তারা৷ দূর থেকে দেখেছি এতকাল৷ তাঁদের আলো, তাঁদের সৌন্দর্য উপভোগ করেছি; ফুটবলীয় সামর্থ্য-প্রজ্ঞায় কুর্ণিশ করেছি বারবার৷ কিন্তু বরাবরই তাঁরা থেকে গেছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে৷ চোখ আর তারার মাঝে যেমন আকাশ-মহাকাশের ব্যবধান, আমাদের সঙ্গে ফুটবলের এসব রথী-মহারথীরও তাই৷ টেলিভিশন পর্দার বাধাটুকুন ঘোচেনি কখনো৷

রাশিয়া বিশ্বকাপে এসে তা ঘুচে গেল৷ আকাশের তারারা নেমে এলেন মাটিতে৷ নক্ষত্রের খইফোটার মতো তাঁরা ঘুরতে থাকেন চোখের সামনে৷ মাঠের খেলায়; সংবাদ সম্মেলনে; মিক্সড জোনে৷ সে কারণেই তো বিস্ময়ের ঘোর কাটে না কিছুতেই৷ প্রথম মহাকাশে গিয়ে ইউরি গ্যাগারিনও নিশ্চয় অমন অনন্ত-বিস্ময়ে ডুবে গিয়েছিলেন; প্রথম চাঁদে পা রাখা নীল আর্মস্ট্রংও৷ ফুটবল-নক্ষত্রদের চোখের সামনে, স্পর্শের দূরত্বে; নিঃশ্বাসের ব্যবধানে দেখে তাই শ্বাস বন্ধ হয়ে আসতে চায় রোমাঞ্চে৷ এত দিনের টিভি পর্দায় দেখা, বই-সংবাদপত্রে পড়ার সঙ্গে মেলাতে চাই বারবার৷ তাতে বিস্ময় বাড়ে আরো; কমে না কিছুতেই৷

সমকালের সবচেয়ে বড় তারকা লিওনেলমেসির সঙ্গে এমন প্রথম দেখা ব্রোনোত্‍সিতে৷ আর্জেন্টিনার বেস ক্যাম্পে৷ মস্কো শহরের ঠিক বাইরে ৬০ মাইল দূরত্বে আবাস গড়েছিলেন তাঁরা৷ ঘণ্টা দুয়েক ভ্রমণ শেষে, জনে জনে জিজ্ঞাসার পর খোঁজ মেলে অবশেষে আলবিসেলেস্তেদের৷ গণমাধ্যমের জন্য ১৫ মিনিটের উন্মুক্ত সেশনে চোখের সামনে কতো তারকা! গনসালো হিগুয়েইন, সের্হিয়ো আগুয়েরো, হাভিয়ের মাসচেরানো, পাউলো দিবালারা৷ কিন্তু দৃষ্টি শুধু খুঁজে ফেরে তাঁকে৷ মেসিকে৷ ওই তো ১০ গজ দূরত্বে দাঁড়িয়ে জাদুকর৷ একটু পর হাঁটতে হাঁটতে ঢুকে যান মাঠের ভেতর৷ দলের অনুশীলনের সময়টায় অবশ্য নিজেকে গুটিয়ে রাখলেন পুরোপুরি৷ একটিবারের জন্য বলের সঙ্গে তাঁর পায়ের স্পর্শ হয়নি৷ জাদুকরী মুহূর্তের আক্ষেপ নিয়েই শেষ হয়ে যায় ১৫ মিনিট৷ হেঁটে বেরিয়ে যান৷ চর্মচক্ষের তৃষ্ণা তাতে মেটে না৷ মিটেছে পরে৷ স্পার্তাক স্টেডিয়ামে মেসিদের অনুশীলনে৷ সেন্ট পিটার্সবার্গে নাইজেরিয়ার বিপক্ষে ম্যাচে৷ সে ম্যাচের পরের সংবাদ সম্মেলনে৷ এমনিতে নাকি ম্যাচের আগে-পরে গণমাধ্যমের মুখোমুখি হন না এই ফুটবল কিংবদন্তি৷ সেদিন নাইজিয়াকে হারানোর আনন্দেই কিনা চলে এলেন! মাত্র দুটো প্রশ্নের উত্তর দিয়ে না হয় চলেও গেলেন, তবু তো মাত্র ৭-৮ হাত দূর থেকে দেখা হলো মেসিকে৷ জার্সি-শর্টসের সঙ্গে চপ্পল পরা অবস্থায়; ছেলের আঁকিবুকিতে পায়ে যে ট্যাটু এঁকেছেন – তা-ও দেখলাম স্পষ্ট৷

নেইমারের সঙ্গে প্রথম দেখাও অনুশীলনে৷ তবে সেটি দূর থেকে৷ চোখের সামনে চলে আসেন কোস্টা রিকার বিপক্ষে দ্বিতীয় ম্যাচে৷ মিক্সড জোন দিয়ে হেঁটে বেরিয়ে যাবার সময়৷ আক্ষরিক অর্থেই তখন তিনি স্পর্শসীমায়৷ আর সার্বিয়ার বিপক্ষে খেললেনই তো চোখের ঠিক সামনে৷ স্পার্তার স্টেডিয়ামে সেদিন সিট পড়েছে একেবারে প্রথম সারিতে৷ টাচলাইন ২০ হাত দূরত্বেও না৷ বাঁ প্রান্ত দিয়ে নেইমার আক্রমণ করছিলেন যখন, এক অর্ধের পুরো ৪৫ মিনিট দেখলাম তাঁকে৷ তাঁর কারিকুরি; তাঁর জাদুকরী৷ ম্যাচ শেষে মিক্সড জোনে দেখা মেলে আবার৷ কথা বলেন না কারো সঙ্গে৷ কিন্তু সতীর্থদের সঙ্গে খোশগল্পে হেসে হেঁটে বেরিয়ে যান ঠিকই৷ বেলজিয়ামের কাছে হেরে বিশ্বকাপ থেকে বিদায়ের পর সে মুখেই কী রাজ্যের বিষন্নতা! ফেলিপে কুতিনিয়ো, গাব্রিয়েল জেসুস, থিয়াগো সিলভা –সবার৷

সেদিন মিক্সড জোন থেকে বেরোতেই আচমকা মার্সেলোর সামনে৷ ওখানে তখন তাঁর থাকার কথা নয়, কী যেন খুঁজছিলেন হন্তদন্ত হয়ে৷ 'টাফ লাক' বলে সান্ত্বনা দেবার চেষ্টায় ভাষাটা বুঝলেন কী বুঝলেন না, কিন্তু সে ব্যবধান দূর হয়ে যায় সমবেদনার বৈশ্বিক ভাষায়৷ কাঁধ ঝুঁকিয়ে সমবদেনাটুকুন গ্রহণ করলেন মার্সেলো, এরপর ওই কষ্টসাগরে হাবুডুবু খেতে খেতেও মেটালেন ছবি তোলার আবদার৷ পেশাদারিত্বের খোলসে নিজেকে ঢেকে নিয়ে৷

 

 

১৪ জুলাই, ২০১৮ ২৩:০৪:৫৯