মাকে খুঁজে না পেয়ে সুইজারল্যান্ডে ফিরে গেলেন রওফি
কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি
অ+ অ-প্রিন্ট
প্রায় ৪৫ বছর আগে হারিয়ে যাওয়া কন্যাকে আজও খুঁজছেন কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার দলদলিয়া ইউনিয়নের অর্জুন গ্রামের রফিতন বেওয়া (৬৫)। আর ৪৫ বছর আগে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার ৪ বছর পর দত্তক হিসেবে সুইজারল্যান্ডে প্রবাসী হওয়া খোদেজা রওফি মরিনো (৪৮) খুঁজছেন মা'সহ পরিবারকে। তাদের মধ্যে এখনও দেখা হয়নি। পরস্পরের দেয়া তথ্যে কিছু অমিল রয়েছে। ফলে নিশ্চিত হওয়া যায়নি তাদের পরস্পরের মধ্যে রক্তের কোন সম্পর্ক আছে কিনা। এ অবস্থায় শনিবার (২৬ জানুয়ারি) রওফি ঢাকা থেকে সুইজারল্যান্ডের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন ইনফ্যান্টস ডু মনডে'র কান্ট্রি কো-অর্ডিনেটর রাকিব আহসান।

সুইজারল্যান্ডের জেনেভার সাইকেল ডেলা গোলেহে স্কুলের শিক্ষক খোদেজা রওফি মরিনো দু'সপ্তাহের ছুটি নিয়ে ঢাকায় আসেন তার মা'সহ পরবারের সন্ধানে। সাথে আসেন তার স্বামী কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার জিইয়াস মরিনো। এরপর ঢাকা থেকে তারা গত ১৬ জানুয়ারি কুড়িগ্রামে আসেন। এখানে  উলিপুর ও চিলমারী উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় খোঁজখবর করে মা‌’সহ পরিবারের কোন সন্ধান না পেয়ে গত ১৯ জানুয়ারি ঢাকায় ফিরে যান তারা। এ অবস্থায় এক প্রবাসী নারী তার মা'সহ পরিবারের খোঁজে এসেছেন, লোক মুখে এ খবর শুনে শুক্রবার (২৫ জানুয়ারি) দুপুরে কুড়িগ্রাম জেলা শহরে আসেন রফিতন বেওয়া। সাথে ছিলেন পুত্র রফিকুল। রফিতনের সাথে দেখা হয় পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের সামনের রাস্তায়।

রফিতন জানান, অর্জুন গ্রামের ছাত্তার আলীর দ্বিতীয় স্ত্রী তিনি। ছাত্তার আলী ২২ বছর আগে মারা গেছেন। তাদের সংসারে ছিল দু’কন্যা ও এক পুত্র। এই ৩ সন্তানের মধ্যে সবার বড় ছিল সাহেরা। ১৯৭৪ সালে মঙ্গার সময় সাহেরা হারিয়ে যায়। তখন সাহেরার বয়স ছিল ৮ বছরের মতো। তিস্তার ভাঙনে অর্জুন গ্রামের ভিটাবাড়ি বিলীন হলে ২০১৩ সাল থেকে থেতরাই শেখের খামার গ্রামে ওয়াপদা বাঁধে কোন রকমে ঝুপড়ি তুলে বসবাস করছেন তারা। তিনি দুঃখ করে বলেন, ‘মঙ্গার সময় ঘরোত খাবার আছিলো না। ভোকের (ক্ষুধা) ঠ্যালায় ছাওয়া মোর কোন পাকে গেইছে তবার পাং না। সেই যে গেইছে- আর বাড়িত ঘুরি আইসে নাই।’

এদিকে রওফি’র কাছ থেকে পাওয়া তথ্যে জানা গেছে, ১৯৭৪ সালে হারিয়ে যাওয়ার সময় তার বয়স ছিল ৩ বছর। তখন তার নাম ছিল খোদেজা। হারিয়ে যাওয়ার পর চিলমারীতে কর্মরত ‘ছিন্নমুকুল’ নামক সংগঠন তাকে খুঁজে পেয়ে আশ্রয় দেয়। এখানে ৪ বছর থাকার পর ১৯৭৮ সালের দিকে সুইজারল্যান্ডের রওফি পরিবার তাকে দত্তক নেয়। তারপর নতুন বাবা-মায়ের সাথে চলে যান জেনেভা শহরে। সেখানেই পড়াশুনা শেষ করে ২০০১ সাল থেকে জেনেভার সাইকেল ডেলা গোলেহে একটি স্কুলের শিক্ষক হিসেবে কর্মরত আছেন। তিনি বিয়ে করেছেন কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার জিইয়াস মরিনোকে। তাদের সংসারে ইলিয়াস নামের ৫ বছর বয়সী এক পুত্র সন্তান রয়েছে।

বিগত ১৯৭৪ সালে ‘ছিন্নমুকুল’ সংগঠনে কর্মরত ছিলেন আনিছুর রহমান। তিনি জানান, সে সময় ছিন্নমুকুল চিলমারী আশ্রয় কেন্দ্রে ১ হাজার ২০০ জন শিশু ছিল। প্রতি ৫০ জন শিশুর দেখভালের জন্য একজন করে টিম লিডার ছিলেন। খোদেজা যে টিমে ছিল সেই টিমের লিডার ছিলেন তিনি। এখান থেকে ১৯৭৮ সালে ৩৬ জন শিশুকে বিদেশীদের কাছে দত্তক দেয়া হয়েছিল। এদের পিতামাতা বা পরিবারের কোন সন্ধান পাওয়া না যাওয়ায় সরকারের অনুমোদন নিয়ে দত্তক দেয়া হয়। তাদের মধ্যে খোদেজাও ছিলেন।

এদিকে রওফি কুড়িগ্রাম আসার সময় তার সফর সঙ্গী ছিলেন তার স্বামী জিইয়াস মরিনো, জেনেভা বাংলা পাঠশালার পরিচালক ও সুইস বাংলাদেশ কালচারাল এসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান রিয়াজুল হক এবং ইনফ্যান্টস ডু মনডে’র কান্ট্রি কো-অর্ডিনেটর রাকিব আহসান। ইনফ্যান্টস ডু মনডে’র কো-অর্ডিনেটর রাকিব আহসান জানান, বিভিন্নভাবে খোঁজখবর নিয়ে এবং সরেজমিন ঘুরেও রওফি’র পরিবারের খোঁজ পাওয়া যায়নি। আর যাওয়ার আগে রফিতন বেওয়ার কথা তিনি শুনেছেন। কিন্তু রফিতনের দেয়া বয়স ও নামের মিল না থাকায় এনিয়ে রওফি’র মধ্যে কোন আগ্রহ পরিলক্ষিত হয়নি।

 

২৭ জানুয়ারি, ২০১৯ ০৮:১৫:৫৬