কাকলীর "রবীন্দ্রনাথের প্রেমের গান"!
সাব্বির খান
অ+ অ-প্রিন্ট

নাহিদ কবির কাকলী- কানাডাপ্রবাসী রবীন্দ্র সংগীত শিল্পী, আমার বন্ধু! বাংলাদেশের প্রখ্যাত হাওয়াইন গিটারবাদক ওস্তাদ এনামুল কবিরের মেয়ে পরিচয়ে নয়, সুরের জগতে কাকলী তৈরি করে নিয়েছেন নিজের এমন এক বলয়, যার পরিধি দেশের সীমান্ত পেরিয়ে বিদেশেও আজ সমান সমৃদ্ধ! ‘তুমি একলা ঘরে বসে বসে কি সুর বাজালে, প্রভু, আমার জীবনে’- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গানের এই কলিকে বুকে ধারণ করে কাকলী খুঁজতে চেয়েছিল সুরের সাত আদি-অন্তকে! যা পেয়েছে, তা-ই আজ শোনা যায় তাঁর সুরের মুর্চ্ছনা আর সংগীতে! কাকলীর সংগীত সাধনা যখন শুরু হয়েছিল, হয়ত জানত না জীবনের এবেলায় এসে পূর্ণতা এভাবেই অনর্গল হবে সুরে আর লয়ে। তাঁর বিশ্বাস ও সাধনা রবীন্দ্রপ্রেমী শিল্পী হিসেবে তাঁকে এনে দাঁড় করিয়েছে আজ এমন এক উচ্চতায়, যা অনেকের হয়ত "সাধ থাকে, কিন্তু সাধ্যে কুলোয় না"!

সম্প্রতি বের হওয়া রবীন্দ্র সংগীতের এলবাম ‘রবীন্দ্রনাথের প্রেমের গান’ কাকলীকে এনে দিয়েছে সে সাধ্যের পূর্ণতা! আমার হিয়ার মাঝে লুকিয়েছিলে, সেদিন দুজনে দুলেছিনু বনে, তুমি কোন কাননের ফুল, আমার নিশীথ রাতের বাদল ধারা, তুমি একটু কেবল বসতে দিও কাছে, জাগরণে যায় বিভাবরী, আমি তোমার প্রেমে, প্রাণ চায় চক্ষু না চায়, কাছে থেকে দূর, এই কথাটি মনে রেখো- এই দশটি গান নিয়ে অনবদ্য এলবামটির জন্য নাহিদ কবির কাকলী অনায়াসে গর্ববোধ করতে পারেন।

ইতোপূর্বে তাঁর গাওয়া রবীন্দ্র সংগীতের আরো তিনটি এলবাম বেরিয়েছে। সেগুলোর সাথে তুলনামূলকভাবে সাম্প্রতিক এলবামটিতে তাঁর গায়কী, কন্ঠের কারুকার্য ও গাম্ভীর্য অনেক বেশি পরিণত, অভিজ্ঞ এবং প্রাজ্ঞ। আগের গানগুলোর গায়কী বা কন্ঠে যে কিছুটা অস্থিরতার রেশ অনুভব হতো, এ পর্যায়ে এসে তা অনেক বেশি স্থির এবং পরিনত মনে হয়েছে। এসবই সম্ভব হয়েছে 'বিষয়ের' উপর সুস্থির সাধনা ও পান্ডিত্য লাভের ফলে। “জাগরনে যায় বিভাবরী” গানটিতে কাকলীর কন্ঠকে কিছুটা ক্লান্ত মনে হওয়ায় জিজ্ঞেস করেছিলাম, “কিরে রেকর্ডিংয়ের আগের রাতে কি তোর ঘুম হয়নি? টেনশনে ছিলি?” উত্তরে সে বলেছিল, “ঠিক মনে করতে পারছি না, হয়ত!” কিন্তু সেই ক্লান্তি-ই যেন গানটিকে পূর্ন করেছে।

ভাল গাইতে পারলেই একজন ভাল শিল্পী হওয়া যায়, এটাই আমাদের চিরায়ত ভাবনার কেন্দ্রবিন্দু! কিন্তু একজন ভাল রবীন্দ্র সংগীত শিল্পী হতে হলে তাঁকে আত্মিকভাবে রবীন্দ্রপ্রেমী হতে হয়। তা না হলে তাঁকে পরিপূর্ণভাবে রবীন্দ্র সংগীত শিল্পী বলা যাবেনা। এটা অনেকটা শাস্ত্রীয় আচারপালণের মত গুরুগৃহে সিদ্ধতা লাভ করার মতই সত্য! শিল্পী নাহিদ কবির কাকলীর সাথে যখনই কথা বলেছি, সময়ের সাথে তাঁর রবীন্দ্রপ্রেমের শাস্ত্রীয় আচারপালণের সিদ্ধতায় ততবেশি সিদ্ধতর হতে দেখেছি, যা আজ তাঁর গায়কীতে এনে দিয়েছে পূর্ণতা।

ভারতের অন্যতম সেরা সংগীত পরিচালক দূর্বাদল চট্টোপাধ্যায়ের পরিচর্যায় এবং কলকাতা থেকে রেকর্ডকৃত ‘রবীন্দ্রনাথের প্রেমের গান” এলবামে কাকলীর প্রতিটি গানেই সৃষ্টি হয়েছে সুরের প্রাঞ্জল আবহ। রবীন্দ্র সংগীতের সুর, লয়, তাল বা বানীতে কোন পরিবর্তণ আনা প্রায় অপরাধের সামিল। কিন্তু সবকিছু ঠিক রেখেও কাকলী প্রতিটি গানেই রেখেছেন একধরণের নিজস্বতার ছাপ, যা তাঁকে অন্যদের থেকে করেছে আলাদা।

একজন রবীন্দ্রবিশেষজ্ঞ না হয়েও সবশেষে একথাই বলবো, নাহিদ কবির কাকলীর এই এলবামটিতে শুধু দশটি গানই নয়, আছে সুরকে ভালবাসার অদম্য স্পৃহা, রবীন্দ্রনাথের প্রতি অগাধ প্রেম, আর সুরের সীমাহীন মূর্চ্ছনা। নাহিদ কবির কাকলীর জন্য রইল আমার শুভকামনা।

সাব্বির খান : বিশ্লেষক ও সাংবাদিক


 

১০ এপ্রিল, ২০১৮ ২৩:১৭:২২