
কানাডায় বসবাসরত বাংলাদেশি অভিবাসী পরিবারগুলোর মধ্যে এক নতুন সামাজিক বাস্তবতা ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। দেশটিতে জন্ম নেওয়া কিংবা ছোটবেলা থেকে বেড়ে ওঠা বাংলাদেশি নতুন প্রজন্মের একটি বড় অংশ কমিউনিটি অনুষ্ঠান, বাংলা ভাষা ও ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের প্রতি আগ্রহ হারাচ্ছে এমন উদ্বেগ প্রকাশ করছেন অভিভাবক, গবেষক ও কমিউনিটি সংগঠকরা।
পরিসংখ্যান বলছে, বর্তমানে কানাডায় বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মানুষের সংখ্যা আনুমানিক ১ লাখ ২০ হাজারের বেশি। তাদের একটি বড় অংশ বসবাস করেন গ্রেটার টরন্টো এলাকায়। ২০২১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী টরন্টো শহরেই বাংলা ভাষাভাষীর সংখ্যা ৩১ হাজারের বেশি। তবে কমিউনিটি নেতাদের দাবি, নতুন প্রজন্মের মধ্যে মাতৃভাষা ব্যবহারের হার দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে।
কানাডার সামগ্রিক জনসংখ্যার প্রায় ১৭.৬ শতাংশ বর্তমানে দ্বিতীয় প্রজন্ম অর্থাৎ অভিবাসী বাবা-মায়ের কানাডায় জন্ম নেওয়া সন্তান। সমাজবিশ্লেষকদের মতে, এই দ্বিতীয় প্রজন্ম মূলধারার শিক্ষা ও সামাজিক পরিবেশে বেড়ে ওঠায় পারিবারিক ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে তাদের দূরত্ব তৈরি হওয়া একটি সাধারণ প্রবণতা হয়ে উঠছে।
স্ট্যাটিসটিকস কানাডার তথ্য অনুযায়ী, কানাডায় প্রায় ৯৮ শতাংশ মানুষ ইংরেজি বা ফরাসি ভাষায় কথা বলতে সক্ষম। ফলে অভিবাসী পরিবারের সন্তানদের দৈনন্দিন যোগাযোগ প্রধানত এই দুই ভাষাকেন্দ্রিক হয়ে পড়ছে। অনেক পরিবারেই এখন দেখা যায় সন্তানরা বাংলা বুঝলেও সাবলীলভাবে বলতে পারে না। অভিভাবকদের মতে, ঘরের ভেতর বাংলা বলার চর্চা থাকলেও স্কুল, বন্ধু ও সামাজিক যোগাযোগের পরিসরে ইংরেজিই প্রধান ভাষা হয়ে ওঠায় মাতৃভাষার ব্যবহার স্বাভাবিকভাবেই কমে যাচ্ছে।

কমিউনিটি সংগঠকদের পর্যবেক্ষণ আরও উদ্বেগজনক। বাংলা নববর্ষ, স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস কিংবা অন্যান্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে তরুণদের উপস্থিতি আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। বেশিরভাগ আয়োজনে অংশগ্রহণকারীদের বড় অংশই হল প্রথম প্রজন্মের অভিবাসী। কিশোর ও তরুণদের অংশগ্রহণ সীমিত, অনেক ক্ষেত্রে প্রায় প্রতীকী পর্যায়েই সীমাবদ্ধ।
গবেষণায় দেখা গেছে, কানাডায় বেড়ে ওঠা বাংলাদেশি-কানাডিয়ান তরুণদের অনেকেই নিজেদের পরিচয়কে “থার্ড কালচার” বা দ্বৈত সাংস্কৃতিক পরিচয়ের মধ্যে দেখছেন। একদিকে পারিবারিক ঐতিহ্য ও মূল্যবোধ, অন্যদিকে মূলধারার কানাডীয় সমাজ এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করতে গিয়ে তারা এক ধরনের পরিচয়-সংকটে পড়ছে। ফলে অনেক সময় তারা পারিবারিক সংস্কৃতিকে আনুষ্ঠানিকতা হিসেবে দেখলেও ব্যক্তিগত জীবনে মূলধারার সংস্কৃতিকেই অগ্রাধিকার দেয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রচলিত ধাঁচের কমিউনিটি অনুষ্ঠান নতুন প্রজন্মের কাছে আকর্ষণ হারাচ্ছে। মঞ্চভিত্তিক দীর্ঘ সাংস্কৃতিক পর্ব বা প্রথাগত আলোচনা সভার বদলে তারা প্রযুক্তিনির্ভর, ইন্টারঅ্যাকটিভ ও অংশগ্রহণমূলক কার্যক্রমে বেশি আগ্রহী। নেতৃত্বের ক্ষেত্রেও তরুণদের সম্পৃক্ততা কম থাকায় তারা নিজেদের প্রতিনিধিত্ব বোধ করতে পারে না। ফলে অনুষ্ঠানগুলো তাদের কাছে প্রাসঙ্গিকতা হারায়।
বাংলাদেশি কানাডিয়ান হাফিজ আহমেদ বেঙ্গলি টাইমসকে বলেন, ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে সংযোগ দুর্বল হয়ে গেলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তাদের শিকড়, ইতিহাস ও আত্মপরিচয় থেকে দূরে সরে যেতে পারে। পারিবারিক বন্ধন ও মূল্যবোধের ধারাবাহিকতা রক্ষাও তখন কঠিন হয়ে পড়ে। অন্যদিকে, তরুণদের একটি অংশ মনে করে দ্বৈত পরিচয়ই তাদের বাস্তবতা; তাই একক সাংস্কৃতিক কাঠামোয় নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখা সম্ভব নয়।
কমিউনিটি নেতাদের মতে, এখন সময় এসেছে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের। পরিবারে নিয়মিত বাংলা ভাষা চর্চা, সপ্তাহান্তে বাংলা স্কুল, দ্বিভাষিক সাংস্কৃতিক কার্যক্রম এবং তরুণ নেতৃত্বকে সামনে আনার মতো উদ্যোগ বাড়ানো জরুরি। প্রযুক্তি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে ইতিবাচকভাবে কাজে লাগিয়ে নতুন প্রজন্মের আগ্রহের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কর্মসূচি গ্রহণ না করলে প্রবাসে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির চর্চা আরও সীমিত হয়ে যেতে পারে।
ভাষা ও সংস্কৃতি হারিয়ে যাওয়ার প্রশ্নটি কেবল আবেগের নয়; এটি অভিবাসী কমিউনিটির দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক স্থিতি ও আত্মপরিচয়ের সঙ্গেও জড়িত। কানাডায় বেড়ে ওঠা বাংলাদেশি নতুন প্রজন্ম যদি নিজেদের শিকড়ের সঙ্গে সংযোগ বজায় রেখে মূলধারার সমাজে আত্মপ্রকাশ করতে পারে, তবে সেটিই হবে প্রকৃত বহুসাংস্কৃতিক সাফল্য। আর সে লক্ষ্যে এখনই কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণ করাই সময়ের দাবি।

