যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞায় পড়া আইসিসি বিচারকের ওপর আস্থা আছে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর

যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞায় পড়া আইসিসি বিচারকের ওপর আস্থা আছে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর - the Bengali Times
আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত ICC এর বিচারক বিম্বারলি প্রোস্টের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত নিষেধাজ্ঞা ঘিরে কূটনৈতিক মহলে তীব্র আলোচনার জন্ম দিয়েছে

আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (ICC)-এর বিচারক বিম্বারলি প্রোস্টের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত নিষেধাজ্ঞা ঘিরে কূটনৈতিক মহলে তীব্র আলোচনার জন্ম দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপের প্রেক্ষিতে কানাডা প্রকাশ্যে কোনো সমালোচনা না করায় দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী অনীতা আনান্দ এখন রাজনৈতিক ও নৈতিক চাপের মুখে পড়েছেন।

গত ২০ আগস্ট মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের কয়েকজন বিচারকের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করেন। আফগানিস্তানে মার্কিন সেনাদের যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ তদন্তের সঙ্গে যুক্ত থাকার কারণে এই নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়েছেন কানাডিয়ান বিচারক বিম্বারলি প্রোস্ট, যিনি আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালে দীর্ঘদিন ধরে দায়িত্ব পালন করছেন।

- Advertisement -

আফগানিস্তানে মার্কিন সৈন্যদের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য যুদ্ধাপরাধ তদন্তের অনুমতি দেওয়ার পর থেকেই ওয়াশিংটন ও আইসিসির মধ্যে সম্পর্ক টানটান। যুক্তরাষ্ট্র অভিযোগ করে আসছে, আইসিসি তার এখতিয়ার ছাড়িয়ে মার্কিন নাগরিকদের বিচার করার চেষ্টা করছে, যা তাদের সার্বভৌমত্বের ওপর “আক্রমণ” হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ফ্রান্স দ্রুতই এই পদক্ষেপের নিন্দা জানিয়ে বলেছে, বিচারকদের ওপর এমন নিষেধাজ্ঞা আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতার ওপর সরাসরি আঘাত। কিন্তু কানাডা প্রথমদিকে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানায়নি। এই নীরবতা ঘিরেই সমালোচনা বাড়ে। মানবাধিকার সংগঠন ও আন্তর্জাতিক ন্যায়ের পক্ষে থাকা গোষ্ঠীগুলো প্রশ্ন তোলে, আইন ও ন্যায়ের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার যে ঐতিহ্য কানাডার রয়েছে, সেটি কি এখন নীতিগত আপসের মুখে?

মঙ্গলবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী অনীতা আনান্দ বিচারক প্রোস্টের সঙ্গে কথা বলেছেন বলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জানিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, “আইসিসির বিচারকরা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন। দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে তাদের নিরপেক্ষতা ও নৈর্ব্যক্তিকতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিচারক প্রোস্ট এই মান বজায় রাখতে সক্ষম হবেন, সে বিষয়ে আমার পূর্ণ আস্থা রয়েছে।” তবে এই বিবৃতিতে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নাম উল্লেখ করেননি, কিংবা নিষেধাজ্ঞার সমালোচনাও করেননি।

গত সপ্তাহে আনান্দের কার্যালয় থেকে জানানো হয়, ওয়াশিংটন সফরের সময় তিনি মার্কো রুবিওর সঙ্গে বৈঠকে প্রোস্টের ওপর নিষেধাজ্ঞা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। কিন্তু সেই উদ্বেগ কতটা জোরালোভাবে তোলা হয়েছে তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই গেছে।

সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী লয়েড অ্যাক্সওয়ার্দি কঠোর সমালোচনা করে বলেন, “কানাডা যে আদালত প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল, সেই আদালতের বিচারকদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের পরও সরকারের নীরব থাকা হতাশাজনক। আইনের শাসন ও আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচারের প্রতি কানাডার ঐতিহ্যবাহী অবস্থান এখন প্রশ্নবিদ্ধ।” তিনি আরও বলেন, অটোয়া এখন এমন এক অবস্থানে দাঁড়িয়েছে যেখানে তারা একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা করছে, অন্যদিকে নিজেদের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তিও ধরে রাখছে।

অ্যানালিস্টদের মতে, এই ঘটনাটি কানাডার পররাষ্ট্রনীতির একটি স্পর্শকাতর দিককে উন্মোচিত করেছে যেখানে মানবাধিকার ও ন্যায়ের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার প্রতিশ্রুতি বাস্তবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্যের সামনে প্রায়শই দুর্বল হয়ে পড়ে।

কানাডার নীতিনির্ধারকেরা জানেন, ওয়াশিংটনের সঙ্গে সরাসরি সংঘাত দেশটির অর্থনীতি ও নিরাপত্তা উভয় ক্ষেত্রেই ক্ষতিকর হতে পারে। ফলে আনান্দের এই ‘নিরপেক্ষ কিন্তু নীরব’ অবস্থানকে অনেকেই বাস্তববাদী কূটনীতির অংশ হিসেবে দেখছেন।

তবে সমালোচকরা বলছেন, ন্যায়বিচারের প্রশ্নে কানাডার এই আপস আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাদের নৈতিক অবস্থানকে দুর্বল করবে।

যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা এবং কানাডার প্রতিক্রিয়া দুটোই এখন আন্তর্জাতিক রাজনীতির সূক্ষ্ম ভারসাম্যের এক প্রতীক হয়ে উঠেছে। একদিকে রয়েছে আইনের শাসন ও আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচারের প্রশ্ন, অন্যদিকে বাস্তব রাজনীতির কূটনৈতিক বাধ্যবাধকতা। অনীতা আনান্দের এই সতর্ক অবস্থান হয়তো তাৎক্ষণিকভাবে ঝড় এড়িয়েছে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে তা কানাডার পররাষ্ট্রনীতিতে নৈতিক বিতর্কের নতুন অধ্যায় খুলে দিয়েছে।

This article was written by Sohely Ahmed Sweety as part of the LJI

- Advertisement -

Related Articles

Latest Articles