পাঁচ দশকের পুরনো টরন্টোর জেরার্ড ইন্ডিয়া বাজার ক্রেতা হারাচ্ছে, ব্যবসায়িরা হতাশ

পাঁচ দশকের পুরনো টরন্টোর জেরার্ড ইন্ডিয়া বাজার ক্রেতা হারাচ্ছে, ব্যবসায়িরা হতাশ - the Bengali Times
জেরার্ড ইন্ডিয়া বাজার কেবল ব্যস্ত থাকে যে কোনো উৎসব বা আয়োজনে ছবি কাদের মনসুর বেঙ্গলি টাইমস

বাংলাদেশি, ইন্ডিয়া ও পাকিস্তানি ক্রেতাদের পদচারণায় একসময় মুখর থাকতো টরন্টোর জেরার্ড ইন্ডিয়া বাজার। মধ্যরাত অবধি খোলা থাকতো দোকানপাট। এখন সে দৃশ্য পাল্টে গেছে। ক্রেতা হারিয়েছে এই ঐতিহ্যবাহী বাজার। চাঁদনী চক সুপার শপের কর্ণধার হীরালাল বেঙ্গলি টাইমসকে বললেন, শাড়ি, পোশাক, গয়না, মিষ্টি, মসলা কিংবা ঐতিহ্যবাহী খাবার কিনতে বৃহত্তর টরন্টোর বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ ছুটে আসতেন এখানে। সময়ের পরিবর্তনে সেই ব্যবসায়িক পরিবেশেও পরিবর্তন এসেছে। ক্রেতাদের একটি বড় অংশ এখন স্কারবোরো, ব্রাম্পটন ও মিসিসাগার নতুন বাণিজ্যিক কেন্দ্রগুলোতে কেনাকাটা করছেন। ফলে ঐতিহ্যবাহী এই বাজারে ব্যবসা টিকিয়ে রাখা অনেক প্রতিষ্ঠানের জন্য কঠিন হয়ে উঠছে।

বেশ কয়েকটি পানের দোকান ছিলো একসময় বেশ জনপ্রিয়। পানপুরি দোকানের কর্ণধার দিলশাদ খান বললেন,  দক্ষিণ এশিয়ার বিশেষায়িত পণ্য কেনার জন্য জেরার্ড ইন্ডিয়া বাজারের বিকল্প খুব বেশি ছিল না। কিন্তু গত দুই দশকে বৃহত্তর টরন্টোর জনসংখ্যার বিন্যাস বদলেছে। দক্ষিণ এশীয় অভিবাসীদের একটি বড় অংশ স্কারবোরো, ব্রাম্পটন, মিসিসাগা ও মার্কহামে বসতি স্থাপন করেছেন। তাঁদের চাহিদাকে কেন্দ্র করে এসব এলাকায় গড়ে উঠেছে নতুন বিপণিকেন্দ্র, সুপারমার্কেট, পোশাকের দোকান ও রেস্তোরাঁ।

- Advertisement -

টরন্টো ইস্টের অন্যতম কমিউনিটি সংগঠন বিসিসিএস এর নির্বাহী পরিচালক ড. নাসিমা খাতুন এই প্রতিবেদকের কাছে কিছুটা ইতিহাস তুলে ধরলেন। ড. নাসিমা বললেন,  জেরার্ড ইন্ডিয়া বাজারের ইতিহাস প্রায় পাঁচ দশকের। সত্তরের দশকে দক্ষিণ এশীয় অভিবাসীদের উদ্যোগে জেরার্ড স্ট্রিট ইস্টে গড়ে উঠতে থাকে একের পর এক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। ১৯৮২ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় জেরার্ড ইন্ডিয়া বাজার ব্যবসায়ী উন্নয়ন এলাকা। উত্তর আমেরিকার অন্যতম প্রাচীন দক্ষিণ এশীয় বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত এই বাজারে বর্তমানে প্রায় ১৪৫টি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে।কিন্তু ক্রেতা কমেছে জ্যামিতিক হারে। খালি হয়ে যাচ্ছে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। কারণ আগে যেসব ক্রেতাকে দক্ষিণ এশীয় পণ্য কেনার জন্য জেরার্ড স্ট্রিটে আসতে হতো, তাঁদের অনেকেই এখন নিজেদের বাসার কাছেই প্রয়োজনীয় সামগ্রী পাচ্ছেন। স্থানীয় বাজারগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা বাড়ায় জেরার্ড ইন্ডিয়া বাজারের ঐতিহ্যগত ব্যবসায়িক সুবিধাও অনেকটা কমেছে।এসব কারণেই ক্রেতারা বিশেষ সময় বা উৎসব ছাড়া এখানে আসছেন না।

পাঁচ দশকের পুরনো টরন্টোর জেরার্ড ইন্ডিয়া বাজার ক্রেতা হারাচ্ছে, ব্যবসায়িরা হতাশ - the Bengali Times
সাউথ এশিয়া ফেস্টিভ্যালে জেরার্ড ইন্ডিয়া বাজারের একাংশ ছবি কাদের মনসুর বেঙ্গলি টাইমস

ওয়াটারলু বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ফেলো মাহতাব হোসেন। ২০১৮ সালের একটি গবেষণায়ও জেরার্ড ইন্ডিয়া বাজারের পরিবর্তিত পরিস্থিতির বিষয়টি তিনি প্রথম উল্লেখ করেন। মাহতাব এই প্রতিবেদককে বলেন,  এই এরিয়াতে দক্ষিণ এশীয় জনগোষ্ঠীর উপস্থিতি কমে যাওয়া এবং নতুন জনসংখ্যার আগমন বাজারটির প্রচলিত ব্যবসায়িক পরিচয় ও কার্যক্রমে পরিবর্তন আনছে।  গত ছয় বছরে কানাডায় মুদি দোকানের খাদ্যপণ্যের দাম প্রায় ৩৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের পেছনে পরিবারের ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় পোশাক, গয়না ও অন্যান্য অনাবশ্যক সামগ্রীর কেনাকাটায় প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকেও কর্মচারীদের বেতন, বিদ্যুৎ, বিমা এবং অন্যান্য পরিচালন ব্যয় বহন করতে হচ্ছে।

সিটি অব টরন্টোর এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২২ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ব্লুর অ্যানেক্স, মাউন্ট ডেনিস এবং আপটাউন ইয়ং এলাকার ব্যবসায়ী উন্নয়ন অঞ্চলগুলোতে প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ১০ শতাংশের বেশি কমেছে।  ২০২৩ সালে প্রায় ২৩ বছর ব্যবসা পরিচালনার পর জেরার্ড স্ট্রিটের পরিচিত রেস্তোরাঁ রিজেন্সি বন্ধ হয়ে যায়।

জোরার্ড ইন্ডিয়া বাজারে নিয়মিত পরিবারসহ যাতায়াত করেন তানজিম সোহাগ। সোহাগ বললেন,  জেরার্ড ইন্ডিয়া বাজারের আরেকটি চ্যালেঞ্জ যানবাহন পার্কিংয়ের সীমাবদ্ধতা। আশপাশের শহর থেকে ব্যক্তিগত গাড়িতে আসা ক্রেতাদের জন্য সুবিধাজনক পার্কিংয়ের অভাব দীর্ঘদিনের সমস্যা। অন্যদিকে শহরতলির বড় বিপণিকেন্দ্রগুলোতে সহজে গাড়ি পার্কিংয়ের সুযোগ থাকায় অনেক ক্রেতা সেসব এলাকায় কেনাকাটা করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।

জেরার্ড বিআইএর অন্যতম পরিচালক সমিত মিশ্রা বলেন, হাজার চ্যালেঞ্জের মধ্যেও জেরার্ড ইন্ডিয়া বাজারের সাংস্কৃতিক গুরুত্ব অটুট রয়েছে। প্রতিবছর সাউথ এশিয়া ফেস্টিভ্যালসহ বিভিন্ন আয়োজনে বিপুলসংখ্যক মানুষ এখানে আসেন। এসব আয়োজন ব্যবসায়ীদের জন্য নতুন ক্রেতা আকর্ষণের সুযোগ তৈরি করে। তবে বছরে কয়েক দিনের উৎসবের বাণিজ্যিক সুফল দিয়ে সারা বছরের ব্যবসায়িক ব্যয় কতটা সামাল দেওয়া সম্ভব, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

জেরার্ড ইন্ডিয়া বাজারের বর্তমান পরিস্থিতি শুধু একটি বাণিজ্যিক এলাকার পরিবর্তনের গল্প নয়; এটি টরন্টোর দক্ষিণ এশীয় অভিবাসী জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনেরও প্রতিফলন। একসময় যে বাজারকে কেন্দ্র করে অভিবাসীদের ব্যবসা-বাণিজ্য ও সামাজিক যোগাযোগ গড়ে উঠেছিল, সময়ের সঙ্গে সেই কর্মকাণ্ড ছড়িয়ে পড়েছে বৃহত্তর টরন্টোর বিভিন্ন এলাকায়। ব্যবসায়িদের অনেকেই মনে করেন, নতুন প্রজন্মের ক্রেতা আকর্ষণ, ব্যবসার বৈচিত্র্য বৃদ্ধি এবং স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণের মাধ্যমে জেরার্ড ইন্ডিয়া বাজার আবারও প্রাণবন্ত হয়ে উঠতে পারে।

- Advertisement -

Related Articles

Latest Articles