
সঠিক সংখ্যা বলতে পারবো না তবে সেপ্টেম্বর-আগস্ট মাসের দিকে হয়তো হাজারেরও বেশি লোক ধারণে সক্ষম হয়েছিল বাকুন্ডিয়া মুক্তিবাহিনীর ক্যাম্প। আমার তাঁবুটি ছিল ক্যাম্প ইন-চার্জ ক্যাপ্টেন সুলতানের (তিনি আগরতলা মামলার আসামী ছিলেন) দাপ্তরিক তাঁবুটির পাশেই। একদিন রাতে আমার প্রচণ্ড দাঁত ব্যথা শুরু হয়। দাঁতের ব্যথায় মানুষ মারা যায় কিনা জানি না কিন্তু আমার অবস্থা দেখে ক্যাপ্টেন সুলতান তাই ভেবেছিলেন।
আব্বা ছিলেন পাশের ‘শাঁকচুড়া’ ইয়ুথ ক্যাম্পের ইন-চার্জ। মাত্র কিছুদিন আগে মোল্লাহাট থানার এম এন এ জনাব আবুল খায়ের (খায়ের মাষ্টার) এই ক্যাম্পটি বরাদ্দ পান। মোল্লাহাট ফকিরহাট এই সমস্ত অঞ্চলের ছেলেদের জন্য ক্যাম্পটি গড়ে তোলা হয়। এম এন এ খায়ের, আব্বাকে সেই ক্যাম্পের ইন-চার্জ হিসেবে নিয়োগ দেন। কোন অভিজ্ঞতা ছাড়াই নিজ হাতে বাঁশ চাটাই দিয়ে অন্যান্যদের সাহায্য নিয়ে শুরু করে দেন ছেলেদের থাকার ব্যবস্থা। সুযোগ পেলেই আব্বা চলে আসতেন ক্যাপ্টেন সুলতানের সাথে কথা বলতে। কেননা ক্যাপ্টেন সুলতান ছিলেন ক্যাম্প পরিচালনায় অভিজ্ঞ ব্যক্তি। মাঝে মাঝে তিনি আসতেন বলেই আমার সাথে তাঁর দেখা হতো।
একটা টুলের উপর বসে ক্যাপ্টেন সুলতান মগে করে গরম চা খাচ্ছিলেন। শেখ ফরিদ (বঙ্গবন্ধু পরিবারের সদস্য), আব্বা এবং ক্যাপ্টেন সুলতানের মধ্যে কথা হচ্ছিলো। কোলকাতার বাস ধরবেন তাই যাবার পথে রাঁধা কিশোর ঘোষ বাবুও ক্যাপ্টেন সুলতান সাহেবের সাথে দেখা করতে এসেছিলেন। এই রাঁধা কিশোর ঘোষের জমিদারিতেই গড়ে উঠেছিল আমাদের বিশাল ক্যাম্প। থাকবার জন্য নিজস্ব দালানটি রেখে বাকি সবকিছু তিনি ছেড়ে দিয়েছিলেন আমাদের জন্য। এমনকি তাঁর বিশাল মন্দিরটিও ছিল আমাদের দখলে। সেখানেই ছিল ৯ নং সেক্টরের অস্ত্রাগার। তখন ঘোষ বাবুর নাম দেয়াল চিকাতে লেখা থাকতো। পশ্চিম বাংলার বিধান সভার সদস্য ছিলেন তিনি। দু’গালে হাত চেপে আমি ওনাদের সামনে এসে উপস্থিত হতেই বাবু তো অবাক বিস্ময়ে আমার দিকে চেয়ে থাকলেন। জিজ্ঞেস করলেন কোন ক্লাসে পড়ি। আমি বললাম ক্লাস টেন। মনে হল তাঁর অবাক হবার মাত্রা বেড়েই চলছে। ইন্সট্রাক্টর নায়েক আব্দুর রশিদকে ডেকে কথা বললেন সুলতান সাহেব। আব্বার সাথেও তাঁর কথা হলো। শেষে আমাকে কলকাতা পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিলেন ওনারা। বাবু বললেন তিনি সব ব্যবস্থা করে দেবেন। এক কাপড়ে রওনা দিলাম বাবুর সাথে।
আমরা যে শুধু জমিদার রাঁধা কিশোর ঘোষ বাবুর গ্রামের জমিজমা দখল করে ক্যাম্প বানিয়ে বসেছিলাম তা নয়। বাবুর একটা ভাড়া করা বাসা ছিল কলকাতার শ্যামবাজার চৌরাস্তার কাছে। তিনতালার সেই ভাড়া করা ঘরটিও বাংলাদেশের ছেলেদের জন্য তিনি ছেড়ে দিয়েছিলেন। যে যেভাবে পারতো সেখানে মাথা গুঁজে ট্রেনিং এ যাবার জন্য অপেক্ষা করতো। বাবুর শ্যামবাজারের বাড়িতে গিয়ে পরিচয় হলো মতিন ভাই এবং আলী ভাই নামের দুই যুবকের সাথে। আলী ভাই ও মতিন ভাই সিলেট কিংবা চিটাগাং মেডিক্যাল কলেজের ছাত্র ছিলেন। ওনারা দুজনেই রাঁধা কিশোর ঘোষের পরামর্শে পরবর্তীতে আব্বার শাঁকচুড়া ক্যাম্পে যোগ দেন এবং দুজনেই মোল্লাহাট থানার বড়বাড়িয়া ইউনিয়নের মন্নু ডাক্তারের সাথে চিকিৎসকের কাজে করতেন আব্বার ক্যাম্পে।
প্রায় এক সপ্তাহ ধরে চলল আমার নানামুখী সরকারী চিকিৎসা। আমি ভারতের নাগরিক কিনা সে কথা হয়তো জিজ্ঞেস করা হয়েছিল কিংবা কেউ জিজ্ঞেস করেনি তবুও আমার চিকিৎসা আটকে থাকেনি। মোটা মোটা সুই ঢুকিয়ে দাঁত অবশ করে ড্রিল করা হতো। মোট চারটি দাঁতের চিকিৎসা হলো। একটি ফেলে দিত হলো। সেই দাঁতটির যায়গাটা এখনো ফাঁকা। আমি বলি ফাঁকা স্মৃতি। দাঁতের ডাক্তার একসাথে একটার বেশি দাঁতে হাত দিতেন না। সেহেতু মাঝে থাকতো বিস্তর সময়। সেই এক সপ্তাহ ঘোষ বাবু আমাকে কোলকাতার কিছু লোকের সাথে দেখা করাতে নিয়ে গিয়েছিলেন। দাঁতের নিচে তুলা চেপে ট্রাম আর টানা রিক্সায় চড়ে কলকাতায় কিছু বাড়িতে গিয়েছি। কোলকাতার নিউমার্কেট থেকে ঘোষ বাবু আমাকে একটা টার্টেল নেক (হাই নেক) গেঞ্জি, টেরি কোর্টের প্যান্ট, জুতা মোজা কিনে দিয়েছিলেন। সাথে মতিন ভাই ও আলি ভাইয়ের জন্য দুটো রাজেশ খান্না পাঞ্জাবি এবং অন্যান্যদের জন্য টুকিটাকি। তিনি হয়তো ওদের প্রায়ই কিছু না কিছু কিনে দিতেন। শুনেছি গ্রামে ফিরে যাবার সময় ক্যাম্পের ছেলেদের জন্য হাত ভরে নানা রকম ফল ও খাবার নিয়ে যেতেন। খুব ভালোবাসতেন মা-বাবা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকা ক্যাম্পের ছেলেদের। হোড়লের ডাল আর জাউ ভাত খেতাম। মায়ের কথা মনে করে একবারও ফিরে যাবার কথা বলতাম না। ভাল খাবার মোটা কাপড়ের জন্য বায়না ধরতাম না এসব দেখে তিনি আশ্চর্য হতেন। কলকাতার পরিবারগুলোর কাছে তিনি আমাকে যখন নিয়ে যেতেন সেখানেও এই কথাগুলো বলতেন। যে বাড়িতেই যেতাম প্রচুর খাবার খেতে দিতো। হায়! ননি গুড়ের সন্দেশগুলো সব যদি সাবাড় করে দিতে পারতাম কী মজাই না পেতাম! বাড়ির লোকগুলো পাশে বসে থাকতেন। ছোট ছোট বাচ্চারা উঁকি দিয়ে মুক্তিবাহিনীকে দেখে যেত। গৃহকর্ত্রীরা মাথায় হাত বুলিয়ে দোয়া করে বলতেন ‘তোমার মত ছোট ছেলেরা যখন যুদ্ধ করতে এসেছ কে পারবে তোমাদের সাথে’। অথবা ‘ভেবো না খোকা তামাদের দেশ খুব শীঘ্রই জয় বাংলা হয়ে যাবে’। এখন আর আমি খোকা নই। দোয়া করার বয়স আমারও হয়েছে। একসময় ঠিক মত খেতে পেতাম না এই ভেবে যারা যত্ন করে খাইয়েছেন মাথায় হাত দিয়ে দোয়া করেছেন তাঁরা চিরকালের আপনজন। তাদেরকে জানাই গভীর শ্রদ্ধা ও আন্তরিক কৃতজ্ঞতা।
নতুন জামাকাপড় জুতোতে আমাকে হয়তো সেদিন কিছুটা ভিন্ন রকম লাগছিলো। সে কারণেই হয়তো একটা স্টুডিওতে নিয়ে গেলেন বাবু। যেভাবে স্টুডিওর মালিক আমাকে বসতে বলল ঠিক সেই ভাবেই ছবি তুললাম। একবার রাঁধা কিশোর ঘোষ এসে বসলেন আমার সাথে।
যুদ্ধের পর কোলকাতার স্টুডিওতে তোলা দুটি ছবি ঘোষ বাবু ডাকযোগে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। রাঁধা কিশোর ঘোষ এখনো বেঁচে আছেন কিনা জানি না। কিন্তু তিনি আমার স্মৃতিতে অম্লান। তাঁর স্নেহ মমতা ভালবাসায় আমি আজও সিক্ত হয়ে আছি। এই ছবি দুটি শুধু একাত্তরের ছবি না, জীবনের অমূল্য সম্পদ। অসুস্থ ছিলাম তাই ঘোষ বাবু একটা হরলিক্স কিনে দিয়েছিলেন। এরপর জীবনে আর কখনো হরলিক্স খেতে পারিনি। হরলিক্সের ছবি দেখলেই তাঁর কথা মনে পড়ে যায়। বাকুন্ডিয়া গ্রামের রবি নামের ছেলেটাকে মনে পড়ে। খোলা মাঠে দাঁড়িয়ে যে আমাকে ‘জন গণ মন অধিনায়ক জয় হে’ শুনিয়ে বলেছিল এবার তুমি তোমার জাতীয় সঙ্গীত গাও। আমি তখন কেঁদে দিয়েছিলাম। যে সঙ্গীতের ছত্রে ছত্রে মা উচ্চারণ করতে হয় সে সঙ্গীত চোখ শুঁকিয়ে রেখে গাওয়া যায় না। সেই একাত্তরে যেমন না, এখনো না।
স্কারবোরো, কানাডা

