
ইনুভিক শহরটি ছোট একটি শহর মাত্র ৪ হাজার লোকের বসবাস। ইন্টারনেটে চাঁকুরী খুজতে গিয়ে এ শহরটির খোঁজ পেয়েছিলাম। ইন্টারভিউ ও যথাযথ প্রক্রিয়ার পর ইনুভিক রিজিওনাল হাসপাতালে যোগ দিলাম ২০১৫ এর আগষ্ট মাসের ১৭ তারিখে। এ শহরের নিকটবর্তী শহর ১২০০ মাইল দূরে। এদেশে ভালো চাকুরীই যখন সোনার হরিন তখন এ স্থানকে উপযুক্ত বলে মনে করলাম।
একদিন শপিং মল থেকে কিছু জিনিসপত্র কিনে বাসায় ফিরছি নির্জন পথে দেখলাম একাকী এক ভদ্রলোক আমার পাশ দিয়ে যাচ্ছেন। কেন যেন মনে হলো ইনি কি বাঙ্গালী? ততক্ষনে তিনি অনেক দূরে চলে গেছেন। একদিন হাসপাতালে সকালে অফিসের সামনে একজন আমাকে ডেকে তাদেরকে দেখিয়ে বললো
-এই, তুমি এদেরকে চিনো?
আমি চুপ করে দাঁড়িয়ে আছি। ভাবছি ভদ্রলোককে তো সেদিন দেখেছিলাম। মনে হয়েছিলো সে বাঙ্গালী কিন্তু পরিচয় না থাকায় কেউ আর কথা বলিনি।
-এরা বাংলাদেশী।
পরিচয় পর্ব সারলাম, টিলিফোন নম্বর আদান প্রদান হলো।
ইনুভিক আর্কটিক অন্ঞলের অর্ন্তভুক্ত। এই শহর থেকে ১৫০ কিমি দূরে আর্কটিক ওসান বা সাগর। বছরের ৯/১০ মাস এ সাগর বরফ জমা থাকে। সাগরের তীরের কাছে ছোট্ট একটি কমুনিটি আছে নাম-টাকটুইয়াকটুক, সংক্ষেপে টাক বলা হয়।
ইনুভিকে খুঁজে পেলাম একটি মসজিদ ছোট অথচ চমৎকার, শহরের বাইরে। এখানে শুক্রবারে জুমার নামাজ পড়ি, রোজার সময় বিকালে অফিসের পর এসে বসে থাকি। এফতার, নামাজ, রাতের খাবার মসজিদ থেকে সেরেই তবে বাসায় ফিরি। এখানে আসতে গাড়ী ভাড়া করে আসতে হতো না হয় অন্য কারো গাড়ীর সাহায্য নিতে হতো।
ইনুভিক ছেড়ে চলে গিয়েছিলাম অন্য প্রভিন্সের অন্য শহরে। কখনো ভাবিনি ১বছর ১০ মাস পর একই হাসপাতালে একই চাকুরীতে আবার ফিরে আসবো। শুক্রবারে জুম্মার নামাজে যাই আগের মতো সেই মিড নাইট সান মসজিদে। এবার এসে কিছু নতুন মুখ দেখতে পেলাম। একজন পাকিস্তানী ভদ্রলোককে মসজিদে পেলাম। সে হাসপাতালের ফাইন্যান্স ডিপার্টমেন্টে কাজ করে। প্রায়ই দেখি জুম্মার নামাজে যাওয়ার জন্য গাড়ীর অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকে। তাকে একদিন বললাম
-তুমি আমার সাথে জুম্মার নামাজে যাওয়া আসা করতে পারো।
সে সম্মতি দিলো। আমার ডেস্ক ফোন নং তাকে দিয়ে বললাম
-১২১৫ মিনিটে আমাকে কল দিয়ে বেরিয়ে আসবে।
১২-১টা লান্ঞ বিরতি আর জুম্মার জামাত ১২৪৫ এ। ১টায় আমরা ফিরে আসি কাজে।
জুম্মার নামাজের দিন মসজিদের একেবারে পিছে গিয়ে দেয়ালে পিঠ লাগিয়ে বসে খুতবা শুনি। এটি আমার বরাবরের অভ্যেস তাছাড়া পিঠে ব্যাথার জন্য আমি বেশীক্ষণ সাপোর্ট ছাড়া বসে থাকতে পারিনা। যখন নামাজের জন্য সবাই দাঁড়ায় তখন পেছন থেকে আমার যেতে কিছুটা বিলম্ব হওয়ায় সবার পরেই আমি দাঁড়াই সারিতে। একদিনতো বোকা বনে গেলাম। সামনের সারিতে এক চিলতে ফাকা জায়গা নেই দাঁড়ানোর। পেছনে আমি একা। দু একজন পিছু ফিরে আমাকে একা দেখেছেন কিন্তু কি করবেন সেখান থেকে বেরিয়ে এলে সে স্থান ফাকা হয়ে যাবে কাজেই এমন দোটানার মধ্যে নামাজ শুরু হলে আমি একাই দাঁড়িয়ে থাকি।
আমি ভাবছি একা একটি কাতারে কিভাবে নামাজের নিয়ত বান্ধবো। আমি সামনের সারির পিছনের ফাকা সারিতে একাই দাঁড়িয়ে আছি। ডাইনে তাকাই বায়ে তাকাই হঠাৎ দেখি দুজন দৌড়িয়ে এসে আমার পাশে দাড়িয়ে নিয়ত বান্ধলো। আমিও একই কাজ করলাম।
মনে হলো দুজন ফেরেস্তা আমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন।
ইয়েলোনাইফ, কানাডা

