
এই লেখাগুলো অনেক আগেই আমার শেষ করে ফেলা উচিৎ ছিল। যখন যেটা মনে আসে সেটা যদি তখনই লিখে ফেলতে পারতাম তাহলে হয়তো অনেক দূর এগুতে পারতাম। কিন্তু সে সুযোগ কোথায়? যখন লেখার কথা মনে হয় তখন দেখা যায় আমি অন্য একটি কাজে মহাব্যস্ত, আর যখন ব্যস্ততা কমে তখন লেখাগুলো আমার মন থেকে হারিয়ে যায়। সে কারণে মনের যন্ত্রণাতে ভুগছি। যদি সব ছেড়ে ছুঁড়ে কোনো জায়গাতে বসে নিজের মনে, নিজের মনের কথাগুলো লিখতে পারতাম। কিন্তু সেটা সম্ভব না আমার, কারণ আমাকে চলতে হয় মা দুর্গার মতো দশটি হাত সাথে নিয়ে। আমার সময় কোথায় লেখালেখির দিকে মন দেবার। আমি তো খুব ক্ষুদ্র একজন নারী। আমার জ্ঞানের আয়তন পিঁপড়ের চাইতেও ছোট। কিন্তু যারা বড় বড় কাজ করছেন, অনেক সম্মানিত অবস্থানে অবস্থান করছেন তারাও কি পারছেন সুস্থ মাথায় সংসার করতে? নাহ পারছেন না। সম্ভব না। নারীদের উপরে উঠতে হলে পেছনের সিঁড়িগুলো নড়বড়ে হয়ে যায়, আবার কখনো ভেঙেও পড়ে। আর সে ভাঙা সিঁড়ি বেয়েই তাদের উপরে উঠতে হয়। যাকগে এসব কথা। আসলে আজকে আমি এসব কথা লিখতে বসিনি। রাত অনেক হয়েছে, একদম ঘুম আসছে না। এই ঘুম ব্যাপারটা বেশ ঘন ঘন আমার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে যাচ্ছে। ঘুম না আসার কারণে ভাবলাম আবোলতাবোল যা মনে আসে কিছু লিখি।
ছোটবেলা নিয়ে আমি খুব বেশি আপ্লুত কখনো হতাম না পৃথিবীর অন্যান্য মানুষের মতো। কিন্তু আজকাল স্মৃতি কেন যেন আমাকে টেনে নিয়ে দাঁড় করিয়ে দেয় আমার ছোটবেলায়। ছোটবেলার অনেক কথা মনে পড়ে যায়। সেটা নিয়ে কখনো নিজের মনে হাসি, আবার কখনো বিষণ্ণ হয়ে পড়ি।
বৃষ্টি অনেকই ভালো লাগে যদি বাইরে যাবার তাগিদ না থাকে। ঘরে বসে বৃষ্টি দেখা বৃষ্টি উপভোগ করার আনন্দই আলাদা। ছোটবেলার ঝড় বৃষ্টির আনন্দই ছিল অন্যরকম। ঝড়ে বা প্রবল বৃষ্টিতে বিদ্যুৎ চলে যাবে। অন্ধকার হয়ে যাবে সারাবাড়ি। আহা কী আনন্দ, পড়তে হবে না এখন আর। অন্ধকার ঘরে ভূতুড়ে একটা পরিবেশ সৃষ্টি করে বিছানাতে লাফিয়ে পড়ে ভাই-বোনদের গল্প শুরু হয়ে যেতো। লাইট নেই মানে হারিকেন জ্বালিয়ে দেয়া ঘরে ঘরে। আমাদের ছোটবেলাতে হারিকেনের প্রচলন খুব ছিল। আবশ্য আমার মা সারা বছরই সন্ধ্যা হওয়ার আগেই একটা হ্যারিকেন জ্বালিয়ে ঘরের এককোণে রেখে দেওয়াতেন। সাবধানের মার নেই সে বিশ্বাসে বিশ্বাসী হয়ে। এখন আমাদের বিদেশী অনেক বাঙালির ঘরেই দেখা যায় এন্টিক পিস হিসাবে হ্যারিকেন সাজিয়ে রাখতে।
হ্যারিকেনের কথা লিখতে বসে ছোটবেলার একটা ঘটনা মনে পড়ে গেলো। আমি ছোটবেলা থেকেই একটু ভাবুক ধরনের ছিলাম। কী যে ভাবতাম নিজেও জানি না। আমার মাঝে বেশ কিছু অদ্ভুত আচরণ ছিল যা কি-না ভাই-বোনদের মাঝে হাস্য রসের সৃষ্টি করতো। বিশেষ করে আমার ভাইদের।
একদিন ঝড়-বৃষ্টির রাতে বিদ্যুৎ চলে গিয়ে ঘুটঘুটে অন্ধকার হয়ে গেলো। কয়েকটি হ্যারিকেন জ্বালিয়ে দেবার প্রস্তুতি চলতে লাগলো। আম্মা আমাকে বললেন, শিখু ওই ঘরের হ্যারিকেনটা এই ঘরে এনে দে তো মা। আমি টর্চ জ্বালিয়ে জলন্ত হ্যারিকেন খুঁজতে গেলাম পাশের ঘরে। এটা নিয়ে বেশ কিছুদিন আমার উপর মজা করার কাঁটা বর্ষিত হয়েছিল।
আরেকদিন আম্মা আমাকে বললেন, পানির জগে তিন গ্লাস পানি ঢেলে রাখতে। মায়ের বাধ্য কন্যা আমি। তিন গ্লাস পানি ঢালতে বলা হয়েছে আমাকে, সেটাই করতে হবে। দুই গ্লাস পানি দেয়াতেই জগটা ভরে গেলো। তাতে আমার কী? আমাকে তো তিন গ্লাস পানিই ঢালতে হবে। আমি পানি ঢেলে দিলাম, সারা টেবিল পানিতে ভেসে গেলো। আম্মা হায় হায় করে ছুটে এলেন। আমি নির্বিকার। আমি কী করবো, আমাকে তো তিন গ্লাস পানি ঢালতে বলা হয়েছে, আমি তাই করেছি। টেবিল ভিজে গেলে আমি কী করতে পারি! তখনো হয়তো আমি ছোটবেলার কোনো গভীর চিন্তাতে মগ্ন ছিলাম। পানিতে টেবিল ভেসে গেছে তাতে আমার কোনো খেয়ালই নেই। এখন মাঝে মাঝে মনে হয় আমি কেন এত বোকা ছিলাম? এসব ভেবে এখনো লজ্জা পাই।
আরেকটা ব্যাপার আমার মাঝে কাজ করতো, কোনো জিনিশ খুঁজে না পেয়ে আমাকে কেউ জিজ্ঞেস করলে আমি নির্বিকারভাবে জবাব দিতাম ‘জানি না’। আসলে আমি জানতাম কিন্তু নিশ্চিত ছিলাম না জিনিশটা এখনো সেখানে আছে কি-না। তারপরে আনমনা ভাব করে সে জিনিশটা খুঁজতে যেতাম এবং পেয়েও যেতাম। তখন কোনো একটা কিছু আবিষ্কারের মতো করে চিৎকার দিয়ে বলতাম, পেয়েছি, পেয়েছি। সেটাও ছিল আমার একধরনের খেলা। আমার এই ব্যাপারগুলো আমার ভাইরা খুব ভালো বুঝতো। কারণ বোনদের চাইতে ভাইদের সাথে ছিল আমার বেশি বন্ধুত্ব ও মানসিক মিল।
ছোটবেলাতে ফুল কুড়ানো ছিল আমার অত্যন্তÍ আনন্দের একটা ব্যাপার। আমদের বাসার উঠোনে সিঁড়ির পাশে ছিল একটি শিউলি ফুলের গাছ ( যাকে আমরা বলতাম শেফালী ফুলগাছ)। শিউলি ফুল তার নিয়ম অনুসারে গভীর রাতে ঝরে পড়ে, গাছের নিচে শিশিরভেজা ঘাসে ছড়িয়ে থাকতো। খুব ভোরে সে শিশির ভেজা ঘাসে ছোট ছোট পা ফেলে ঝুড়ি ভরে ফুল তুলতাম। পরে সে ফুলগুলো দিয়ে কি করতাম মনে করতে পারছি না। তবে শিউলি ফুলের কমলা বোঁটাটা দিয়ে ঘষে ঘষে হাতে পায়ের নখ রাঙাতাম। আমাদের বাসার অল্প দূরে ছিল বড় বড় বকুল ফুল গাছ। খালাতো, চাচাতো ভাই-বোনরা যখন বেড়াতে আসতো আর তখন যদি বকুল ফোটার সময় থাকতো তাহলে কাক ভোরে উঠে, ‘ আয় ছেলেরা আয় মেয়েরা ফুল তুলিতে যাই, ফুলের মালা গলায় দিয়ে মামার বাড়ি যাই’ সমবেত স্বরে কবিতা বলতে বলতে ফুল তুলতে যেতাম। যদিও আমাদের কোনো মামা ছিল না। কিন্তু অদৃশ্য মামাকে উদ্দেশ্য করে কবিতা বলেই আমাদের ফুল তোলা শুরু হতো। সে ফুলগুলো দিয়ে মালা গাঁথা হতো। সে মালা সারাদিন আমরা হাতে জড়িয়ে রাখতাম আর একটু পর পর নাকের কাছে নিয়ে ফুলের গন্ধ নিতাম। ছোটবেলার কত গল্প কত ঘটনা, সবকিছু লিখতে বসলে ছোট আকারের একটা বই হবে। তারপরও ছোটবেলার জীবনটাকে পেছন থেকে টেনে এনে সামনে দাঁড় করিয়ে দিতে বড্ড ইচ্ছে হলো আজ। ছোটবেলায় আমি অনেক হাসতাম। সে হাসি ছিল অনেক জোরে খিলখিল করে হাসা। আমাদের বাসায় রাবেয়ার মা নামে একজন কাজের বুয়া ছিল। সে রাবেয়ার মা-ও আমার মতো খিলখিল করে হাসতো। আম্মা বলতেন আমার মেয়েটা রাবেয়ার মায়ের হাসিটা কী করে পেলো? আমার খালাতো ভাই হেলাল ভাই, আমার চাইতে বয়সে অনেকটাই বড়। হেলাল ভাই আমার হাসি নিয়ে মজা করে বলতেন, রাস্তার ওপারে থাকলেও নাকি ইথারে ভেসে ভেসে আমার হাসি হেলাল ভাইয়ের কানে যেতো। বড় হয়ে যাবার পর এমন হাসি আর কখনো হাসিনি।
আরেকটি ঘটনা বলি…।
আমি অনেক বড় হয়েও বোতলে দুধ খেতাম। আমাকে স্কুলে ভর্তি করানো হলো। কনভেন্ট স্কুলে। তখন আমার চার বছর বয়স। এই বয়সের বাচ্চাদের ক্লাস এর নাম ছিল বেবি ক্লাস। আমি বেবি ক্লাসের ছাত্রী। ব্রেক টাইমে সব বাচ্চাদের বাড়ি থেকে টিফিন নিয়ে আসা হতো। একটা জায়গা নির্দিষ্ট ছিল বাচ্চাদের খাওয়াবার জন্য। আমার এখন সে দৃশ্যটা পুরো মনে আছে। স্কুলের গেটের ভেতরে বড় বড় দুটো কৃষ্ণচূড়াগাছ। তার নিচটা পরিচ্ছন্ন পাথর দিয়ে বাধানো। সেখানে বাচ্চারা টিফিন খেতো। ব্রেক টাইমের ঘণ্টা বাজার সাথে সাথে গেট খুলে দেয়া হতো টিফিন নিয়ে আসা অভিভাবকদের জন্য। আমাদের বাসা থেকে স্কুলের দূরত্ব ছিল তিন মিনিট। আম্মা কখনো কাজের ছেলেকে দিয়ে কখনো আমার ফুপাতো ভাই হাবু ভাইকে দিয়ে আমার টিফিন পাঠাতেন। আমার নাস্তা নিয়ে কোনো মাথাব্যথা ছিল না। আমার দৃষ্টি ছিল আমার দুধের বোতল এলো কি-না সে দিকে। আম্মা প্রতিদিন ফানটার বোতলে নিপেল লাগিয়ে এক বোতল দুধ পাঠাতেন নাস্তার সাথে। আমি গাছের নিচে দাড়িয়ে এক বোতল দুধ শেষ করে ফেলতাম। যেদিন হাবু ভাই আসতো টিফিন নিয়ে সেদিন একটু লজ্জা পেতে হতো আমার। হাবু ভাই জীভে কামড় দিয়ে বলতো, ‘ছি ছি কী লজ্জা, এত বুড়া মেয়ে নিপেল লাগানো বোতলে দুধ খাস? লুকা লুকা আমার পেছনে লুকাইয়া খা। তোর পাদ্রি টিচার তোকে বোতলে দুধ খাইতে দেখলে তোকে স্কুল থেকে বাইর করে দিবে। ’ আমি ভয়ে ভয়ে হাবু ভাইয়ের পেছনে আড়াল হয়ে দাঁড়িয়ে দুধ খেয়ে শেষ করতাম। ছোটবেলার প্রতিটি জিনিশই মনে হয় কতো মধুর। হাজার চেষ্টাতেও তাকে আর ফিরিয়ে আনা যাবে না।
ছোটবেলাতে কত রকম খেলাই না আমরা খেলতাম। কাপড়ের পুতুল বানিয়ে তাকে শাড়ি পরাতাম। কালো সুতা দিয়ে চুল বানিয়ে তাতে বেনি গাঁথতাম। পুতুলদের বাড়িঘর ছিল জুতার বাক্স। পুতুলকে সাজিয়ে গুছিয়ে সুন্দর করে জুতার বাক্সে রেখে দিতাম। আরো কতো ধরনের খেলা আমরা পাড়ার ছেলে-মেয়েরা খেলতাম। ফুল টুকাটুকি খেলা, কতো ফুলের নাম ধরে ডাকতাম, আয় রে আমার গোলাপবালা, আয় রে আমার টগরমালা আর কত কত নাম। কাচের চুড়িভাঙা জমানো একটা নেশা ছিল। কত রঙের কাচের চুড়ি পুটলি বেঁধে রেখে দিতাম। তা দিয়ে হতো আমাদের চুড়িখেলা। যে জিততো সে অন্যদের চুড়িগুলো অনেকটাই পেয়ে যেতো। সে চুড়িভাঙা খেলাতে হেরে গিয়ে চুড়ি হারানোর দুঃখে কত না কেঁদেছি। আজকালকার বাচ্চারা এসব খেলা খেলে না। এসব খেলা এখন শিশুদের কাছে, বিলুপ্ত। তাছাড়া পাড়া, পাড়ার ছেলেমেয়ে এই শব্দগুলো এখন আর নেই। আধুনিক কত রকমের খেলনা, খেলা, খোলা মাঠের অভাব, ছোট পরিবার সবকিছু একসাথে হয়ে শিশুদের বড্ড নিঃসঙ্গ বানিয়ে ফেলেছে।
আমাদের সবচাইতে উত্তেজনামূলক খেলা ছিল কড়িখেলা। এই খেলাটি খেলতে গিয়ে চিৎকার খামচা খামচির শেষ ছিল না। মেজপা ছিল খামচা-খামচির পারদর্শী একটি মেয়ে। এই প্রতিযোগিতাতে কেউ তাকে হার মানাতে পারেনি। মেজপার খামচি খেয়ে কতদিন যে আমাদের লজ্জাতে হাত লুকিয়ে রাখতে হয়েছে কেউ যেন দেখে না ফেলে।
মেজপা (আমাদের মেজ-বোন খুকু)। খামচির ওস্তাদ হলেও অন্য দিকে অত্যন্তÍ গুছালো ও সাংসারিক মেয়ে ছিল বলে আম্মার অত্যন্তÍ প্রিয় মেয়ে ছিল মেজপা। আমাদের সব বন্ধুরা মেজপাকে মেজপা বলেই ডাকতো। এখনো আমার কাছের বন্ধুদের কাছে মেজপা, মেজপা নামেই পরিচিত। কিশোর বয়স থেকে মেজপার মাঝে একটু একটু করে পল্লী নায়িকার ভাব ফুটে উঠতে লাগলো। হয়তো আমার এই বোনটি জীবনটাকে পল্লীনায়িকার রূপেই সাজাতে চেয়েছিল। কিন্তু কঠিন বাস্তব তাকে পল্লী নায়িকার ভূমিকা পালনে বঞ্চিত করে। বাস্তব তাকে কঠিন হাতে বুঝিয়ে দিয়েছে পল্লী নায়িকা হওয়াটা কল্পনা। বাস্তবের সাথে তার কোনো মিলমিশ নেই। আমাদের মেজপার একটি অদ্ভুত ধরনের বিরক্তিকর স্বভাব ছিল, ও হয়তো ভেবেছে এখন চুল বাঁধবে। কিন্তু ভাবার সাথে সাথে সে কাজটি সে কখনো করতো না। ঘন কালো চুলে একঘণ্টা চিরুনিটা গুজে রাখতো। ওই চিরুনিতে কেউ যেন আর হাত দিতে না পারে। মেজপার হয়তো মনে হতো পল্লিনায়িকার চলাফেরার এটাও একটা পর্ব। মেজপার এই চিরুনি গোঁজার ব্যাপারটা আমাদের কাছে বিশেষ করে আমার কাছে অসহ্য লাগতো। তবে আমাদের মেজপা অত্যন্তÍ মায়াবতী একটি মেয়ে ছিলেন। আমাদের আদর করেছেন, ভালোবেসেছেন প্রাণ দিয়ে। একটা বড় বাটিতে মজা করে একটু লবণ বেশি দিয়ে ভাত তরকারী মেখে আমাদের ছোট ভাই-বোনদের মুখে তুলে খাওয়াতেন। এটা ছিল মেজপার আমাদের প্রতি ভালোবাসার একটি অংশ। মেজপার এই ভাত মাখিয়ে খাবার স্বাদটা এখনো আমি অনুভব করতে পারি। আমার বোনটি মানুষকে ভালোবাসা দিতে পারতো। অনেক মিষ্টি করে আদর দিয়ে সবার সাথে কথা বলতো মেজপা। তবে বাস্তব আমার বোনটিকে ভালোবাসার প্রতিদান দিতে ভুলে গেছে। কারণ নিজের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো আমার মমতাময়ী বোনটি একাই নিয়েছিল। অবশ্য আমার মেজপা এখনো ছেলে-মেয়ে নাতি-নাতনীর আদর-সোহাগে মায়াবতী হয়েই আছে।
আমার সেজ বোন যে কি-না কর্মক্ষেত্রে এবং সমাজে তাওফিকা আফতাব, পরিবার ও বন্ধু মহলে রেখা নামে পরিচিত। বর্তমানে সুপ্রিম কোর্ট ও হাইকোর্টের আইনজীবী। আমরা কখনো আমাদের সেজো বোনকে আপা বলে ডাকতাম না। আমরা ছোট তিন ভাইবোন ওকে রেখা বলে ডাকতাম এবং এখনো ডাকি। কেন যে কখনো ওকে আপা ডাকিনি বা আপা ডাকানো শেখানো হয়নি তা জানি না। মাঝে মাঝে রেখা আমাকে চুপিচুপি বলত, ‘শোন এখন থেকে তুই আমাকে বুবু বলে ডাকবি।’ কারণ তখন বড় বোনদের বুবু ডাকার একটা ফ্যাশান চালু হয়েছিল। তখন মাথা নেড়ে ওর কথায় সম্মতি জানালেও বাস্তবে রেখাকে আপা বা বুবু কিছুই ডাকিনি। রেখা ওকে আপা না ডাকার যুক্তিটা দাঁড় করাতো এভাবে, ‘আসলে আমাকে তো তোদের চাইতে অনেক ছোট লাগে দেখতে তাই তোরা আমাকে আপু ডাকিস না।’
আমার বোন রেখার ভেতরে সব সময় একটা শাসক-শাসক ভাব কাজ করতো। যখন যা করতে ইচ্ছা করতো তখন তাই করতো। ভীষণভাবে স্বাধীনচেতা ছিল আমার এই বোনটি। কাউকে উচিৎ কথা শুনিয়ে দেবার ব্যাপারে ওর জুড়ি ছিল না। ছোটবেলা থেকেই ও ছিল রূপ চর্চাতে, সৌন্দর্য রক্ষাতে সচেতন একটি মেয়ে। এমন কোনো ফ্যাশান ওর সামনে দিয়ে চলে যেতে পারেনি যেটা কি-না ওর ধরা হয়নি। মঞ্চে নাচ করতো, রাজনীতি করতো। ওকে কে কী বললো সে ব্যাপারে কোনো মাথা ব্যথা ছিল না।
ছোটবেলার বেশ কিছু মজার স্মৃতি আছে আমাদের রেখার সাথে। ঈদের সময় খালারা আসতেন কুমিল্লা ঈদ করতে। আমাদের বাসা আর আমাদের নানার বাসা খুব কাছাকাছি ছিল। যার ফলে নানার বাড়িতে ছিল আমাদের নিত্য যাতায়াত। ঈদে যখন খালারা আসতেন নানার বাড়িতে ঈদ করতে তখন খালারা নানার বাসায় থাকলেও একঝাঁক খালাতো ভাইবোনরা আমাদের সাথেই থাকতো। ঈদের আগের রাতে ছাদে উঠে চাঁদ দেখা কী যে একটা আনন্দের ব্যাপার ছিল! চাঁদ দেখে ভাই-বোনেরা বড়দের মতো একে অপরের সাথে কোলাকোলি করতাম। সে ছিল আমাদের এক নির্মল আনন্দ। চাঁদ দেখার সাথে সাথে বাড়িতে শুরু হয়ে যেতো ঈদের প্রস্তুতি। বেচারা মুরগিদের হত্যার করুণ আর্তনাদ, পায়েস, সেমাই রান্না, কাজের বুয়াদের মসলা পিসার শব্দ, আমাদের নতুন জামা কাপড়, ফিতা, চুড়ি, জুতা, স্যান্ডেল সাজিয়ে রাখা ঈদের দিন সকালে উঠে সাজগোজ করার জন্য। আমাদের ঈদের আনন্দের মতো আনন্দ এখনকার বাচ্চারা উপলব্ধি করে না, কারণ এখন নানারকমের আনন্দধারা বইছে আজকালকার ছেলে-মেয়েদের মাঝে।

