
এখন তোমার গল্প বল। এক এক একান্নতে জন্ম অথচ এখনো স-মু-দ্র দেখনি। যাবে আমার সাথে?
সমুদ্র উচ্চারণে কিছুটা জড়তা এসে যায়। কণ্ঠস্বর নিচু করে বলে, স-মু-দ্র।
যেন তার ভুল উচ্চারণ কেউ ধরতে না পারে। তারপর উঁচু হয়ে বলে বাকি সব কথা।
আমি যে খুব স-মু-দ্রে গেছি তা কিন্তু নয়। স-মু-দ্র আমার ভালো লাগে না। ভয় পাই। অনেক ঢেউ সেখানে। একবার পাহাড়ের উপর থেকে দেখেছিলাম। সত্যি অনেক ঢেউ। আমার বয়স উনিশ হলে কি হবে আমি পানিকে খুব ভয় পাই। বাবা কেন যে আমার নাম রেখেছিল বৃষ্টি কে জানে। বৃষ্টি মানেই স-মু-দ্র গিয়ে মিলিয়ে যাওয়া তাই না?
ফুল দাদী, এবার তোমার একটা কষ্টের গল্প বল। আমার স্যাড স্টোরি শুনতে খুব ভালো লাগে। টপ সিক্রেট কথা হলেও বল। আমি কাউকে বলবো না। প্রমিজ।
আসলে আমি একজনের কথা অন্যকে বলি না। জানো কেন? আমি সবার কথা সেভ করে রাখি। বলতে পার কিপটেদের মত করে কথা বাঁচিয়ে রাখি। একদিন আমি যখন তোমাদের বয়সের হব তখন সবার গল্প খুলে নিয়ে বসবো আর দেখবো আমার সাথে অন্যের মিল অমিল।
ভাবছ পাকামো করছি। আমি আসলেই এমন। ট্রুলি বলছি।
আচ্ছা বলতো আমার দিদার কোন গল্প নেই কেন? সমস্ত জীবন একই রুটিনে কাটিয়ে দিলেন। ছেলে বেলায় বাবার সংসারে বাবার শাসন তারপর… ওসবতো তুমি জানো। আমার দিদা ঠিক সেই ধরনের মেয়ে ছিল তাই না?
একজন লোককে ডাক্তার হতে গেলে কি কি বই পড়তে হয়, ডাক্তার হলে একটা মানুষ কত বড় হয় সেগুলো দিদা জানতেন না। তবুও তার দুটো ছেলেই আজ ডাক্তার হয়েছে। সবাই যখন বলতো তোমার ছেলেগুলো বেশ মানুষ হয়েছে। দিদা খুব একটা এক্সাইটেড হতো না। শুধু বলতো ওদের বাবা ছোট বেলায় ওদের রেখে চলে গেছে। শুনেছিলাম কোলকাতা গিয়ে আর একটা বিয়ে করেছে। একবার শুনলাম ট্রামে চাপা পড়েছে। কোনটা সত্যি কোনটা মিথ্যা বলতে পারবো না। সবই শোনা কথা। তারপরও ওরা যখন মানুষ হলো তখন আল্লাহর কাছে হাজাজার শুকরিয়া।
আসলে দিদার ছেলেগুলো মানুষ হয় নি। আমার বাবা তো তার বড় ছেলে। তাকে শুদ্ধ বলছি। ওরা যদি মানুষ হতো তবে কি দিদাকে এই আমেরিকাতে নিয়ে আসে। দিদা সারাজীবন ছোট্ট একটা ঘরে থেকেছে। মানুষের জামা কাপড় সেলাই করে আর বাচ্চাদের স্কুলে আয়া গিরি করে সংসার চালিয়েছে। সম্বলের মধ্যে ছিল একটা সেলাই মেশিন। এখন এত্ত বড় একটা বাড়িতে তাকে এনে আটকে রেখেছে। এটাকে এক ধরনের আটকে রাখাই বলে।
দিদার বেড রুম দেখেছো? এত বড় যে সেখানে হারিয়ে যাবার মত অবস্থা। অথচ ছোট্ট একটা ঘরে একটা মাত্র চৌকির উপর তিনি দুই ছেলেকে নিয়ে কত সুখে নিদ্রা যেতেন।
আমি প্রায় গিয়ে দেখি দিদা এখন জানালার পাশে গুটি মেরে বসে থাকেন। কোথাও নিয়ে গেলে গুটি গুটি পায়ে হাঁটেন। কিছু কিনে দিলে ভয়ে ভয়ে ধরেন। আমরা সামনের দিকে এগিয়ে গেলে তিনি ঘাড় ঘুরিয়ে শুধু পেছন দিকে দেখেন। যিনি জীবনে কোন সুখ কামনা করেননি, তার কাছে লাক্সারি লাইফ কেন এত প্রিয় হবে বল?
একবার আমাকে কি জিজ্ঞেস করেছিল জানো?
কী
আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল তোরা কিসের জন্য এত বড় বাড়িতে থাকিস। কি স্ট্রেঞ্জ কথা।
জানো ফুল দাদী। আমি অনেক প্রশ্ন করে তার একটাও গোপন কথা জানতে পারিনি। এমন কোন কথা যা তিনি কাউকে বলতে পারবেন না। এমন কোন আশা যা কোন দিন পূরণ হবার নয়। কিছু মানুষ জন্ম নেবার পর থেকেই মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করতে থাকে। Born to die, দিদা হল ঠিক সে রকম একজন মানুষ। কোন সাধ আ-হ-লা-দ নেই।
তুমি তার ছোট বেলার বন্ধু। একই গ্রামের মেয়ে। দেখ কি আশ্চর্য, এখন এই বয়সে তোমরা আবার পাশাপাশি বাড়িতে তথাকো। তোমার ছেলেকেও তুমি কষ্ট করে ইঞ্জিনিয়ার বানিয়েছ। মেয়ে দুটোকে ভালো বিয়ে দিয়েছ। নাতি-পুতি নিয়ে ভালোই দিন কাটছে। But I noticed, তুমিও কিছুটা দিদার মত। চুপচাপ বসে থাকো।
তোমার কি মনে হয় না এটা একটা মিরাকেল যে ছোট বেলায় তুমি আর দিদা এক সাথে বড় হয়েছ আবার এখন পাশাপাশি দুটো বাসায় থাকছ। তাও আমেরিকার মত দেশে। খুব হ্যাপি লাগছে তাই না।
হাঁ রে বোন। তোমার কথাই ঠিক। আমরা খুব হ্যাপি। তয় আজ যদি আমার বড় ভাই বাইচা থাকতো তাইলে সেও খুব খুশি হইত
তোমার বড় ভাই আছে?
আছে মানে ছিল। কেন! তোর দিদা তার কথা কিছু কয় নাই? মানে আমার ভাইজান ইদ্রিস আলীর কথা কিছুই কয় নাই তোর কাছে?
না তো!
বৃষ্টি তাঁর দাদির ছোট বেলার বন্ধুর কাছে গিয়ে মুখ উঁচিয়ে বসে থাকে। ওর দাদির নাম জুঁই। আর পাশের বাসার দাদীর ছেলে বেলার এই বন্ধুর নাম ফুলবানু। সবাই ডাকে ফুল’দি কিংবা ফুল দাদী। বৃষ্টির বাবা যখন আমেরিকার শিকাগো শহরে আসে তখন বৃষ্টির বয়স ছিল মাত্র দশ বছর। এখনো ভালো বাংলা বলে। স্বভাবেও কিছুটা বাঙালিপানা রয়ে গেছে। বড় হয়ে সে একজন ভালো লেখক হতে চায়। মার্গারেট এটউড, অরুনধুতি, ভার্জিনিয়া উলফ তাঁর প্রিয় লেখকদের মধ্যে অন্যতম। ওর ইচ্ছে শুধু ছোট গল্প লিখবে। উপন্যাস হলে সেখানে ইস্ট এন্ড ওয়েস্টের মিলন ঘটাবে।
বৃষ্টি ফুল দাদির হাতটা তার নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে আলতো করে স্পর্শ করে যাচ্ছে। যেমনটি সে তার বিড়াল মুনরো কে আদর করে। একটা অঘোষিত নীরবতার মধ্যে তার কানে ভেসে আসছে সমুদ্রের গর্জন। অনেক বড় ঢেউ উঁচু থেকে নিচুতে চলে গেলে যে শিহরন জাগে তেমনি শিহরন জেগে উঠছে। পাহাড়ের উপর থেকে একদিন ভয় ভয়ে যে ভাবে সমুদ্রকে দেখেছিল সেই ভয় দেখতে পায় সে ফুল দাদির চোখে। তবু সে নীরবতা ভাঙ্গে না। যেন ফুল দাদির অব্যক্ত কথা সে শুনতে পাচ্ছে। আর এদিকে মনে মনে একটি পুরুষ চরিত্র দাঁড় করিয়ে ভাবছে ইদ্রিস আলীর শরীরের গঠন। কত ছিল তার বয়স? চুলগুলো কি কোঁকড়ানো ছিল, চোয়াল শক্ত! সাথে সাথে এও ভাবছে আজ বাসায় ফিরে সে দিদার বেড রুমের পর্দাগুলো খুলে দিবে। জানালার পাশে দাঁড়িয়ে পর্দা উঁচিয়ে কতটুকু আর দেখা যায়। কতদূর যায় সে দৃষ্টি।
আরো ভাবছে, বৃষ্টি গড়াতে গড়াতে এক সময় মিশে যায় সমুদ্রে। দৃষ্টির শেষ কোথায়?
স্কারবোরো, কানাডা

