বৈশ্বিক অর্থনীতিতে সুদহার হ্রাসের ঢেউ, বাণিজ্যে প্রভাবের শঙ্কা

বৈশ্বিক অর্থনীতিতে সুদহার হ্রাসের ঢেউ, বাণিজ্যে প্রভাবের শঙ্কা - the Bengali Times
ইতিমধ্যেই কানাডার ব্যাংকগুলো মর্টগেজ এবং ভোক্তা ঋণের সুদহার কমানোর উদ্যোগ শুরু করেছে এর ফলে আবাসন বাজারে নতুন গতি আসতে পারে

গত কয়েকদিনে বৈশ্বিক আর্থিক বাজারে উল্লেখযোগ্য ওঠানামা লক্ষ্য করা গেছে। সুইজারল্যান্ড ও ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক উভয়ই তাদের নীতি সুদহার কমানোর ঘোষণা দিয়েছে। এর আগে, কানাডার কেন্দ্রীয় ব্যাংক ১১ ডিসেম্বর সুদহার অর্ধ শতাংশ কমিয়ে ৩.২৫ শতাংশে নামিয়ে আনেছিল। অর্থনীতিবিদরা একে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার আশঙ্কা মোকাবিলার জন্য সমন্বিত পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন।

ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের সুদহার ৩ শতাংশে নামিয়েছে, যা গত চার বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। সুইজারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংকও তাদের সুদহার কমিয়ে ১.২৫ শতাংশে নিয়ে এসেছে। উভয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকই জানিয়েছে, বৈশ্বিক বাণিজ্য সংকোচন নিয়ন্ত্রণ, মূল্যস্ফীতি সীমিত করা এবং বিনিয়োগ পুনরুজ্জীবিত করার উদ্দেশ্যেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

- Advertisement -

কানাডার অর্থনীতিবিদদের মতে, এই বৈশ্বিক সুদহার হ্রাসের ধারা কানাডার রপ্তানি ও আমদানি খাতে সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে। কানাডার মোট রপ্তানির প্রায় ৭২ শতাংশ যুক্তরাষ্ট্রে, ৯ শতাংশ ইউরোপীয় ইউনিয়নে এবং ৪ শতাংশ এশিয়ায় যায়। ইউরোপ ও সুইজারল্যান্ডে সুদহার কমার ফলে সেখানে মুদ্রার মান দুর্বল হতে পারে। ফলে কানাডার পণ্য তুলনামূলকভাবে বেশি দামে বিক্রি হবে, যা রপ্তানি প্রতিযোগিতাকে কমিয়ে দিতে পারে।

অন্যদিকে, আমদানির ক্ষেত্রে খরচ কিছুটা হ্রাস পেতে পারে। কানাডা ইউরোপ থেকে বছরে প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলারের সমমূল্যের যন্ত্রপাতি, ওষুধ, বিলাসী পণ্য ও প্রযুক্তি আমদানি করে। মুদ্রার মান দুর্বল হলে আমদানির খরচ কমে যাবে, যা ভোক্তাদের জন্য ইতিবাচক সংবাদ। তবে অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করেছেন যে দীর্ঘমেয়াদে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি হ্রাস পেলে চাহিদা কমে যাবে, যা কানাডার সামগ্রিক অর্থনীতিকে প্রভাবিত করতে পারে।

ব্যাংকিং খাতেও এর প্রভাব পড়েছে। ইতিমধ্যেই কানাডার ব্যাংকগুলো মর্টগেজ এবং ভোক্তা ঋণের সুদহার কমানোর উদ্যোগ শুরু করেছে। এর ফলে আবাসন বাজারে নতুন গতি আসতে পারে। টরন্টো ও ভ্যাঙ্কুভারের মতো শহরে যেখানে গড় বাড়ির দাম ৯ লাখ থেকে ১০ লাখ ডলার, সেখানে ক্রেতারা আবারও বাজারে প্রবেশের সুযোগ পাবেন। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, দীর্ঘমেয়াদে এটি নতুন বুদ্বুদ তৈরি করতে পারে।

শ্রমবাজারেও কিছুটা স্বস্তি আসার সম্ভাবনা রয়েছে। কম খরচে ঋণ পাওয়ায় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো নতুন কর্মসংস্থানে বিনিয়োগ করতে উৎসাহিত হবে। অর্থনীতিবিদদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, এই ধারা অব্যাহত থাকলে ২০২৫ সালের মধ্যে কানাডায় প্রায় ১.৫ লাখ নতুন চাকরি তৈরি হতে পারে।

তবে কিছু অর্থনীতিবিদের মধ্যে বিপরীত মত রয়েছে। তারা বলছেন, সুদহার হ্রাস স্বল্পমেয়াদে অর্থনীতিতে গতি আনলেও মুদ্রাস্ফীতির ঝুঁকি থেকে যাবে। বর্তমানে কানাডার মুদ্রাস্ফীতি হার ৩.৪ শতাংশ, যা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের লক্ষ্যমাত্রা ২ শতাংশের ওপরে। ভোক্তাদের হাতে খরচের অর্থ বাড়লে মূল্যস্ফীতি পুনরায় তীব্র হতে পারে।

আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এই সিদ্ধান্তকে এক ধরনের সমন্বিত সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রে নতুন প্রশাসনের শুল্কনীতি অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। যদি যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্যে সুরক্ষাবাদী নীতি জোরদার করে, তবে কানাডা ও ইউরোপ উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এজন্য সুদহার কমানো হতে পারে একটি প্রতিরক্ষামূলক কৌশল।

১২ ডিসেম্বরের বৈশ্বিক সুদহার হ্রাসের ঢেউ শুধু ইউরোপ ও সুইজারল্যান্ডকেই নয়, বরং কানাডার অর্থনীতিতেও সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলতে যাচ্ছে। সাধারণ মানুষের জীবনে এটি তাৎক্ষণিক স্বস্তি আনলেও নীতিনির্ধারকদের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জও তৈরি করবে। কানাডা এখন এমন এক অবস্থানে দাঁড়িয়ে যেখানে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সমন্বয় ও নিজস্ব নীতি উভয়ই ভবিষ্যতের স্থিতিশীলতার জন্য সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

- Advertisement -

Related Articles

Latest Articles