
অন্টারিও প্রাদেশিক পুলিশ (ওপিপি) ৬ ডিসেম্বর ২০২৪ থেকে প্রদেশের সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে বিশেষ টহল কার্যক্রম শুরু করেছে। সরকারের বক্তব্য অনুযায়ী, এই পদক্ষেপ মূলত অবৈধ অস্ত্র ও মাদক প্রবাহ ঠেকানো এবং প্রদেশজুড়ে বাড়তে থাকা সংগঠিত অপরাধ দমন করতে নেওয়া হয়েছে।
কানাডা-যুক্তরাষ্ট্র সীমান্ত বিশ্বের দীর্ঘতম অরক্ষিত সীমান্তগুলোর মধ্যে একটি। প্রতিবছর এই সীমান্ত দিয়ে প্রচুর পরিমাণ বৈধ বাণিজ্য হয়। তবে অপরাধী চক্রও সীমান্তকে ব্যবহার করে অবৈধ অস্ত্র, মাদক ও মানবপাচারের মতো কার্যক্রম চালায়। সরকারি পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৩ সালে কানাডা সীমান্ত সেবা সংস্থা প্রায় ১,২০০টি অবৈধ অস্ত্র এবং ১৫ টন অবৈধ মাদক জব্দ করেছে। এর মধ্যে প্রায় ৪৫ শতাংশ অন্টারিওর সীমান্ত দিয়ে প্রবেশ করেছিল।
ওপিপি জানিয়েছে, বিশেষ টহল কার্যক্রমের আওতায় সীমান্তবর্তী সড়ক, নদীপথ এবং গ্রামীণ প্রবেশপথগুলোতে নজরদারি বৃদ্ধি পাবে। নতুন প্রযুক্তিনির্ভর চেকপোস্ট স্থাপন করা হবে, যেখানে ড্রোন, নাইট ভিশন ক্যামেরা এবং মোবাইল স্ক্যানার ব্যবহার করা হবে। পাশাপাশি, যুক্তরাষ্ট্রের সীমান্ত নিরাপত্তা সংস্থার সঙ্গে যৌথ সমন্বয় জোরদার করা হয়েছে।
অন্টারিওর প্রিমিয়ার ডগ ফোর্ড এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, “আমাদের প্রদেশকে অবৈধ অস্ত্র ও মাদকের ধ্বংসাত্মক প্রভাব থেকে রক্ষা করতে হবে। সংগঠিত অপরাধ শুধুমাত্র নিরাপত্তা বিপন্ন করছে না, বরং তরুণ প্রজন্মের ভবিষ্যতকেও হুমকির মুখে ফেলছে। আমরা কঠোর পদক্ষেপ নিতে বাধ্য।”
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অন্টারিওতে অস্ত্র সহিংসতার মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। টরন্টো শহরে ২০২৩ সালে অস্ত্র ব্যবহার করে সহিংস ঘটনার সংখ্যা ৪৬০টি রেকর্ড করা হয়েছে, যা ২০১৯ সালের তুলনায় প্রায় ৩৫ শতাংশ বেশি। অপরাধবিজ্ঞানীরা মনে করছেন, এর মূল উৎস সীমান্ত দিয়ে প্রবেশ করা অবৈধ অস্ত্র। পাশাপাশি, প্রদেশে ওপিয়য়েড অতিরিক্ত ব্যবহারের কারণে মৃত্যু ব্যাপক আকার নিয়েছে। শুধুমাত্র ২০২৩ সালে ওপিয়য়েড অতিরিক্ত সেবনে মৃত্যুর সংখ্যা ২,২০০ জনের বেশি।
সীমান্তবর্তী শহরগুলোও এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছে। উইন্ডসর শহরের মেয়র বলেন, “সড়ক ও মহাসড়ক দিয়ে অবৈধ কার্যক্রম প্রবেশ করলে গোটা অঞ্চলের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়। ওপিপির নতুন টহল আমাদের জন্য আশার আলো।”
তবে সমালোচকরাও রয়েছেন। মানবাধিকার সংগঠনগুলো মনে করছেন, সীমান্তে কঠোর নজরদারি অনেক সময় নিরীহ ভ্রমণকারী ও অভিবাসীদের হয়রানির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তারা দাবি করছেন, আইন প্রয়োগের পাশাপাশি মানবিক দিককেও বিবেচনায় রাখা উচিত।
অর্থনীতিবিদরা জানাচ্ছেন, এই উদ্যোগের কারণে বৈধ বাণিজ্যে সাময়িক ব্যাঘাত সৃষ্টি হতে পারে। সীমান্তে চেকপোস্ট ও তল্লাশি বৃদ্ধি পেলে পণ্য পরিবহন প্রক্রিয়ায় বিলম্ব ঘটতে পারে। কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে দৈনিক বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার। সরকার বলেছে, বৈধ বাণিজ্য যাতে ব্যাহত না হয়, সে বিষয়ে সমন্বিত পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে।
মোট মিলিয়ে, ৬ ডিসেম্বর থেকে অন্টারিও প্রাদেশিক পুলিশের শুরু করা বিশেষ সীমান্ত টহল প্রদেশের নিরাপত্তা জোরদারের এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এটি অপরাধ দমন, অস্ত্র ও মাদকের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ এবং নাগরিকদের আস্থা ফিরে পাওয়ায় সহায়ক হতে পারে। তবে এর দীর্ঘমেয়াদী কার্যকারিতা নির্ভর করবে প্রযুক্তি ব্যবহারের দক্ষতা, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং আইন প্রয়োগে স্বচ্ছতার ওপর।

