
অন্টারিও প্রাদেশিক সরকার শ্রমজীবী মানুষের জন্য একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়েছে। নভেম্বর ২০২৪-এ প্রাদেশিক পার্লামেন্টে উপস্থাপিত হয়েছে নতুন শ্রম আইন ‘ওয়ার্কিং ফর ওয়ার্কার্স সিক্স অ্যাক্ট’। সরকারের দাবি, এই আইন কার্যকর হলে প্রদেশের হাজার হাজার শ্রমিক, কর্মজীবী নারী-পুরুষ ও বিশেষ পেশাজীবীরা নতুন সামাজিক সুরক্ষা ও আইনি সুবিধা পাবেন।
এই আইনের মূল ফোকাস রাখা হয়েছে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে ১) দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতার কারণে ছুটি, ২) দত্তক ও সারোগেসির মাধ্যমে সন্তান গ্রহণকারীদের মাতৃত্বকালীন সুবিধা, ৩) দমকল কর্মীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা।
নতুন আইনের অন্যতম বড় পরিবর্তন এসেছে দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতার ক্ষেত্রে। আগে যেখানে কোনো কর্মী সর্বোচ্চ ১৭ সপ্তাহ পর্যন্ত অসুস্থতার ছুটি নিতে পারতেন, এখন সেই সময়সীমা বাড়িয়ে ২৭ সপ্তাহ পর্যন্ত করা হয়েছে।
এতে ক্যান্সার, হৃদরোগ, মানসিক অসুস্থতা বা অন্যান্য দীর্ঘস্থায়ী স্বাস্থ্য সমস্যায় ভোগা শ্রমিকরা চিকিৎসা ও পুনরুদ্ধারের জন্য আরও বেশি সময় পাবেন।
অন্টারিও শ্রমমন্ত্রী ডেভিড পিচ্চিনি বলেন, “আমরা জানি, অসুস্থ হলে পরিবার ও কর্মীর ওপর কত বড় মানসিক ও আর্থিক চাপ পড়ে। এই আইন তাদের সেই কঠিন সময়ে কিছুটা হলেও সুরক্ষা দেবে।” বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সিদ্ধান্ত কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা-সংক্রান্ত নীতিতে এক বড় অগ্রগতি।
আইনের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ দিক পরিবার পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত। এতদিন অন্টারিওতে মাতৃত্ব ও পিতৃত্বকালীন ছুটি থাকলেও দত্তক বা সারোগেসির মাধ্যমে সন্তান গ্রহণকারী বাবা-মা সমান সুবিধা পেতেন না।
নতুন আইন বলছে, এখন থেকে দত্তক বা সারোগেসির মাধ্যমে সন্তান নেওয়া পরিবারগুলোও মাতৃত্বকালীন ছুটির সমান সময় ও চাকরির সুরক্ষা পাবেন।
এতে সমলিঙ্গ দম্পতি ও নিঃসন্তান পরিবারগুলো সামাজিকভাবে আরও সমান অধিকার ভোগ করতে পারবে। সামাজিক ন্যায্যতা ও কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য হ্রাসের ক্ষেত্রে এটিকে বড় পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
কমিউনিটি এ্যাডভোকেট সিরাজুল মুনীর বেঙ্গলি টাইমসকে বলেন, দমকল কর্মীরা নিয়মিত ধোঁয়া, বিষাক্ত রাসায়নিক ও বিপজ্জনক পরিবেশে কাজ করায় তাদের মধ্যে ক্যান্সারের ঝুঁকি সাধারণ মানুষের তুলনায় অনেক বেশি। নতুন আইনে স্পষ্ট বলা হয়েছে যদি কোনো দমকল কর্মীর মধ্যে নির্দিষ্ট প্রকার ক্যান্সার ধরা পড়ে, তবে সেটিকে কাজজনিত অসুস্থতা হিসেবে গণ্য করা হবে। এর ফলে তারা পাবেন ক্ষতিপূরণ, বিশেষ চিকিৎসা সহায়তা এবং পরিবারভিত্তিক আর্থিক সুবিধা।
অন্টারিওতে বর্তমানে প্রায় ১২,০০০ পূর্ণকালীন ও ১৯,০০০ স্বেচ্ছাসেবী দমকল কর্মী রয়েছেন। তারা দীর্ঘদিন ধরে এই দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছিলেন। নতুন আইনে সেই দাবি বাস্তবায়িত হওয়ায় দমকল ইউনিয়নগুলো একে “ঐতিহাসিক বিজয়” বলে আখ্যা দিয়েছে।
অন্টারিও চেম্বার অব কমার্সের এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, এই আইনের প্রভাবে প্রতিবছর প্রায় ৫০,০০০ কর্মী সরাসরি উপকৃত হবেন। দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতার ছুটি কার্যকর হলে বছরে প্রায় ২০,০০০ শ্রমিক এর সুবিধা পাবেন। দত্তক ও সারোগেসি সংক্রান্ত ছুটিতে উপকৃত হবেন ৫,০০০–৭,০০০ পরিবার। দমকল কর্মীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় উপকার পাবেন আরও কয়েক হাজার কর্মী ও তাদের পরিবার।
এই আইন নিয়ে প্রদেশজুড়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। বিরোধীদল এনডিপি ও কিছু ব্যবসায়ী সংগঠন বলছে, এই আইন ভালো হলেও এটি ছোট ব্যবসায়ীদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করবে। দীর্ঘমেয়াদি ছুটি দিলে বিকল্প কর্মী নিয়োগ ও প্রশিক্ষণে খরচ বাড়বে, যা ছোট ব্যবসার জন্য বড় বোঝা হতে পারে। তাদের দাবি, সরকার যদি ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসার জন্য কোনো আর্থিক ভর্তুকি বা সহায়তা না দেয়, তবে এই আইন বাস্তবে জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে।
অন্যদিকে শ্রমিক ইউনিয়ন ও সামাজিক সংগঠনগুলো একে ঐতিহাসিক সাফল্য হিসেবে দেখছে। তাদের মতে, “এই আইন দেখিয়ে দিল শ্রমিকরা শুধু অর্থনীতির চালিকাশক্তি নয়, তাদের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও সরকারের দায়িত্ব।”
টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রম গবেষণা কেন্দ্রের ২০২৩ সালের এক সমীক্ষায় উঠে এসেছে, অন্টারিওর ৩২% শ্রমিক কোনো না কোনোভাবে দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছেন। দমকল কর্মীদের মধ্যে ক্যান্সারের ঝুঁকি সাধারণ মানুষের তুলনায় তিন গুণ বেশি। এই পরিসংখ্যানই প্রমাণ করে, নতুন আইনের প্রয়োজনীয়তা কতটা জরুরি ছিল।
‘ওয়ার্কিং ফর ওয়ার্কার্স সিক্স অ্যাক্ট’ কেবল একটি শ্রম আইন নয় এটি অন্টারিওর শ্রমজীবী মানুষের জন্য সামাজিক সুরক্ষা ও ন্যায়বিচারের এক নতুন অধ্যায়। এই আইন কার্যকর হলে কর্মক্ষেত্রে সুরক্ষা, পরিবারবান্ধব নীতি এবং সামাজিক সমতা আরও জোরদার হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

