মার্কিন নির্বাচনে ট্রাম্প জয়ী, কানাডার বাণিজ্যে অনিশ্চয়তা

মার্কিন নির্বাচনে ট্রাম্প জয়ী, কানাডার বাণিজ্যে অনিশ্চয়তা - the Bengali Times
ট্রুডো বলেন আমাদের এখন ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করতে হবে কানাডার চাকরি ও অর্থনীতিকে সুরক্ষিত রাখতে হলে শক্ত অবস্থান গ্রহণ ছাড়া উপায় নেই

২০২৪ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের পুনরায় বিজয়ের পর কানাডার অর্থনীতি ও বাণিজ্যে নতুন করে তৈরি হয়েছে উদ্বেগের পরিস্থিতি। নভেম্বরের নির্বাচনে দীর্ঘ ও তীব্র প্রচারণা শেষে ট্রাম্প ভাইস প্রেসিডেন্ট কামালা হ্যারিসকে পরাজিত করে আবারও হোয়াইট হাউসে ফেরার পথ সুগম করেন। ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের শুরুতেই কানাডা-আমেরিকা সম্পর্ক এক অনিশ্চিত মোড় নিতে যাচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

কানাডার মোট রপ্তানির প্রায় ৭৫ শতাংশ যুক্তরাষ্ট্রে যায়। গাড়ি, ইস্পাত, অ্যালুমিনিয়াম, কৃষিপণ্য এবং জ্বালানি এই পাঁচটি খাত বিশেষভাবে নির্ভরশীল মার্কিন বাজারের ওপর। নির্বাচনী প্রচারণায় ট্রাম্প প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তিনি উত্তর আমেরিকার মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (USMCA) পুনর্বিবেচনা করবেন এবং মেক্সিকো হয়ে আসা “সস্তা যন্ত্রাংশ” ও চীনা উপকরণের প্রবাহ রোধে সীমান্তে নতুন শুল্ক আরোপ করবেন।

- Advertisement -

এই পদক্ষেপ কানাডার অটোমোবাইল শিল্পের জন্য বিশেষ করে অন্টারিও প্রদেশে এক বড় ধাক্কা হতে পারে। কারণ অন্টারিওতে অবস্থিত গাড়ি উৎপাদন কেন্দ্রগুলো মূলত যুক্তরাষ্ট্রে যন্ত্রাংশ পাঠানো ও সেখান থেকে উপকরণ আমদানির ওপর নির্ভরশীল। শুল্ক বেড়ে গেলে উৎপাদন খরচ বাড়বে, প্রতিযোগিতা কমবে এবং চাকরি হারানোর ঝুঁকি বাড়বে।

নির্বাচনের ফল ঘোষণার পরপরই কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো সব প্রদেশের প্রিমিয়ারদের নিয়ে জরুরি বৈঠক ডাকেন। বৈঠকে অন্টারিওর প্রিমিয়ার ডগ ফোর্ডসহ প্রদেশগুলোর শীর্ষ নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

বৈঠক শেষে ট্রুডো বলেন, “আমাদের এখন ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করতে হবে। কানাডার চাকরি ও অর্থনীতিকে সুরক্ষিত রাখতে হলে শক্ত অবস্থান গ্রহণ ছাড়া উপায় নেই।”

ডগ ফোর্ডও এক সুরে মন্তব্য করেন, “আমরা আর সস্তা পণ্যের প্রতিযোগিতায় হার মানতে পারি না। অবৈধ মাদক, অস্ত্র ও বাণিজ্যের বিরুদ্ধে এখনই কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার সময়।” এই বক্তব্যগুলো থেকেই স্পষ্ট, ফেডারেল ও প্রাদেশিক সরকার উভয়েই আসন্ন অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জকে অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে দেখছে।

বাংলাদেশি কানাডিয়ান রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. হাসান মাহমুদ বেঙ্গলি টাইমসকে বলেন, ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্কনীতি বাস্তবায়িত হলে আগামী দুই বছরে কানাডার জিডিপি প্রবৃদ্ধি ০.৫ থেকে ০.৭ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে। রপ্তানিনির্ভর হাজার হাজার ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসা টিকে থাকার জন্য কঠিন লড়াইয়ে পড়বে।

বিশেষ করে কৃষিপণ্য খাতে বড় ধাক্কা আসতে পারে। ট্রাম্প দেশীয় কৃষকদের জন্য ভর্তুকি বাড়ানোর পরিকল্পনা করেছেন এবং বিদেশি কৃষিপণ্য আমদানিতে নিরুৎসাহিত করার ইঙ্গিত দিয়েছেন। এর ফলে কানাডার কৃষি রপ্তানি হ্রাস পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা প্রান্তিক কৃষক ও রপ্তানিকারকদের জন্য বিপদ ডেকে আনবে।

টরন্টো, মন্ট্রিয়ল ও ভ্যাঙ্কুভারের ব্যবসায়ী মহলে এক ধরনের অনিশ্চয়তা ছড়িয়ে পড়েছে। নির্বাচনের পরপরই কানাডার স্টক মার্কেটে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। কানাডীয় ডলারের মানও কিছুটা কমেছে।

ব্যাংক অব কানাডা সতর্ক করে বলেছে, “যদি দীর্ঘ মেয়াদে এই অস্থিরতা অব্যাহত থাকে, তাহলে মুদ্রানীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের প্রয়োজন হতে পারে।”

এতে সুদের হার ও মুদ্রাস্ফীতির ওপরও প্রভাব পড়তে পারে, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়িয়ে তুলবে।

শুল্ক বৃদ্ধি ও পণ্যের দাম বাড়লে সরাসরি এর প্রভাব পড়বে সাধারণ ভোক্তাদের ওপর। টরন্টোর এক ক্রেতা স্থানীয় সংবাদমাধ্যমকে বলেন, “আগেই বাজারের দাম বেড়ে গিয়েছে। যদি নতুন করে শুল্ক আরোপ হয়, তাহলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কেনা আরও কঠিন হয়ে পড়বে।” বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খাদ্য ও জ্বালানির দাম বাড়লে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা, পরিস্থিতি সামাল দিতে কানাডা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন করে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য আলোচনায় বসতে বাধ্য হবে। কয়েকজন প্রিমিয়ার ইতোমধ্যেই মেক্সিকোকে বাদ দিয়ে সরাসরি কানাডা-আমেরিকা বাণিজ্য চুক্তির দাবি তুলেছেন।

তবে ট্রুডো সরকার এখনো এ বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত অবস্থান নেয়নি। পর্যবেক্ষকদের মতে, কানাডার কূটনৈতিক কৌশল ও আলোচনার দক্ষতাই নির্ধারণ করবে ভবিষ্যতের বাণিজ্য সম্পর্ক কোন পথে যাবে।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের শুরুতেই কানাডা-আমেরিকা সম্পর্কের সামনে এক জটিল ও অনিশ্চিত পথ খুলে গেছে। অর্থনীতি, বাণিজ্য, কর্মসংস্থান ও জীবনযাত্রার ব্যয় সব ক্ষেত্রেই কানাডীয়দের নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হতে পারে। আগামী কয়েক মাসেই স্পষ্ট হয়ে উঠবে, ট্রাম্প প্রশাসনের নীতিগত পরিবর্তন কানাডার জন্য কতটা চ্যালেঞ্জ বয়ে আনে, আর দেশটি কিভাবে সেই ধাক্কা মোকাবিলা করে।

- Advertisement -

Related Articles

Latest Articles