কানাডার প্রাদেশিক সরকারগুলো যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আলাদা বাণিজ্য চুক্তির পরিকল্পনা করছে

কানাডার প্রাদেশিক সরকারগুলো যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আলাদা বাণিজ্য চুক্তির পরিকল্পনা করছে - the Bengali Times
কুইবেক প্রদেশের প্রিমিয়ার ফ্রাঁসোয়া লেগো কৃষি ও দুগ্ধ শিল্পে প্রতিযোগিতার চাপের বিষয়টি তুলে ধরে বলেন আমাদের কৃষিপণ্য ও দুগ্ধশিল্প এখন সরাসরি মেক্সিকোর সস্তা ফল ও সবজির সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নামতে হচ্ছে যা স্থানীয় কৃষকদের জন্য অত্যন্ত কঠিন

কানাডার অর্থনৈতিক ও বাণিজ্য নীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছে দেশের প্রাদেশিক সরকারগুলোর সাম্প্রতিক ঐক্যবদ্ধ অবস্থান। নভেম্বরে সব প্রদেশ ও অঞ্চল একযোগে ঘোষণা করেছে যে, উত্তর আমেরিকার বিদ্যমান মুক্ত বাণিজ্য কাঠামো যা এক সময় নাফটা (NAFTA) নামে পরিচিত ছিল এবং পরবর্তীতে কাসমা (CUSMA) নামে কার্যকর হয় তা আর দেশের শিল্প ও শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষা করতে পারছে না।

প্রাদেশিক নেতারা অভিযোগ করছেন, মেক্সিকোর অংশগ্রহণের কারণে চীনা উৎপাদিত সস্তা যন্ত্রাংশ ও কাঁচামাল মেক্সিকোর মাধ্যমে উত্তর আমেরিকার বাজারে প্রবেশ করছে, যা কানাডার ঐতিহ্যবাহী উৎপাদন খাতগুলোর জন্য তীব্র প্রতিযোগিতার চাপ তৈরি করছে। এর ফলে তারা মেক্সিকোকে বাদ দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি নতুন দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তির দাবি তুলেছেন।

- Advertisement -

অন্টারিও প্রদেশের প্রিমিয়ার ডগ ফোর্ড পরিস্থিতিকে “গুরুতর” আখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেন, “অন্টারিওর গাড়ি শিল্প কানাডার অর্থনীতির অন্যতম চালিকা শক্তি। শুধু এ খাত থেকেই দেশের অর্থনীতিতে বার্ষিক প্রায় ১৫ বিলিয়ন ডলারের অবদান আসে এবং এক লাখেরও বেশি শ্রমিক সরাসরি কর্মরত। কিন্তু মেক্সিকোর কারখানাগুলো সস্তা শ্রম ও কাঁচামালের মাধ্যমে যেভাবে যন্ত্রাংশ উৎপাদন করছে, তা আমাদের শিল্পকে প্রতিযোগিতা থেকে সরিয়ে দিচ্ছে।”

অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, কানাডার মোট রপ্তানির প্রায় ৭৫ শতাংশ যুক্তরাষ্ট্রে যায়, যার মধ্যে ২০ শতাংশই আসে গাড়ি শিল্প থেকে। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মেক্সিকোর অগ্রগতি আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। গত তিন বছরে যুক্তরাষ্ট্রে মেক্সিকোর রপ্তানি বেড়েছে ৩৫ শতাংশ, যেখানে কানাডার রপ্তানি বেড়েছে মাত্র ৮ শতাংশ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ব্যবধানের মূল কারণ হলো মেক্সিকোর সস্তা উৎপাদন ব্যয় ও লজিস্টিক সুবিধা।

কুইবেক প্রদেশের প্রিমিয়ার ফ্রাঁসোয়া লেগো কৃষি ও দুগ্ধ শিল্পে প্রতিযোগিতার চাপের বিষয়টি তুলে ধরে বলেন, “আমাদের কৃষিপণ্য ও দুগ্ধশিল্প এখন সরাসরি মেক্সিকোর সস্তা ফল ও সবজির সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নামতে হচ্ছে, যা স্থানীয় কৃষকদের জন্য অত্যন্ত কঠিন।”

কানাডা প্রতিবছর প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলারের কৃষিপণ্য যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি করে। কিন্তু মেক্সিকো থেকে কম দামে আসা ফল ও সবজি বাজারে ঢুকতে থাকায় কানাডিয়ান কৃষিপণ্য হারাচ্ছে বাজার ও দাম দুটোই।

ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার একজন কর্মকর্তারা বেঙ্গলি টাইমসকে বলেন, কাঠ ও অন্যান্য প্রাকৃতিক সম্পদ খাতেও একই ধরনের প্রতিযোগিতার ধাক্কা পড়েছে। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে টিকে থাকতে এখন তাদের মারাত্মকভাবে দাম কমাতে হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর।

আলবার্টা প্রদেশ তাদের উদ্বেগ জানাতে গিয়ে বলেছে, মেক্সিকোকে বাদ দিলে জ্বালানি খাতে কানাডা যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে আরও শক্ত অবস্থান নিতে পারবে। কানাডার মোট জ্বালানি রপ্তানির ৯০ শতাংশই যুক্তরাষ্ট্রে যায়, যার মূল্য প্রায় ১০০ বিলিয়ন ডলার। আলবার্টার হিসাব অনুযায়ী, যদি দ্বিপাক্ষিক চুক্তি হয়, তবে তেল ও গ্যাস খাতে নতুন কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগের সম্ভাবনা তৈরি হবে।

তবে ব্যবসায়ী মহল একক অবস্থানে নেই। টরন্টো বোর্ড অব ট্রেড তাদের প্রতিবেদনে সতর্ক করেছে, মেক্সিকোকে বাদ দিলে কিছু খাতে সুযোগ বাড়লেও অন্য খাতে বড় ধরনের ক্ষতির ঝুঁকি আছে। কানাডা প্রতি বছর মেক্সিকোতে প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলারের কৃষিপণ্য রপ্তানি করে। যদি মেক্সিকো পাল্টা শুল্ক আরোপ করে, তবে এই বাজার পুরোপুরি হারিয়ে যেতে পারে।

স্ট্যাটিস্টিকস কানাডার তথ্য অনুযায়ী, উত্তর আমেরিকার মুক্ত বাণিজ্য কাঠামোর আওতায় কানাডা বছরে প্রায় ৫০০ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি-রপ্তানি করে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এই কাঠামো ভেঙে গেলে স্বল্পমেয়াদে বিনিয়োগে ধাক্কা লাগবে এবং জিডিপি প্রবৃদ্ধি ০.৪ থেকে ০.৬ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে।

তবে তারা এটাও উল্লেখ করেছেন, যদি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন দ্বিপাক্ষিক চুক্তি সফলভাবে করা যায়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে গাড়ি শিল্প ও জ্বালানি খাতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ আসতে পারে।

প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো সাংবাদিকদের বলেন, “আমরা প্রাদেশিক সরকারের উদ্বেগকে গুরুত্ব দিচ্ছি। তবে আমাদের কৌশল হবে কানাডার সামগ্রিক স্বার্থ রক্ষা করা। কোনো তাড়াহুড়ো না করে সঠিক কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক পদক্ষেপ নেয়া হবে।”

তিনি ইঙ্গিত দেন, সরকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং প্রয়োজন হলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন চুক্তি নিয়ে আলোচনায় বসবে।

সব মিলিয়ে, নভেম্বর ২০২৪-এ কানাডার প্রদেশগুলোর এই অভূতপূর্ব ঐক্যবদ্ধ দাবি দেশের ভবিষ্যৎ বাণিজ্যনীতিতে এক বড় পরিবর্তনের সঙ্কেত দিচ্ছে। একদিকে গাড়ি, জ্বালানি ও প্রাকৃতিক সম্পদ খাতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলতে পারে মেক্সিকোকে বাদ দেওয়া কোনো চুক্তি। অন্যদিকে কৃষি ও আমদানি-রপ্তানি বাজারে কূটনৈতিক জটিলতা ও অর্থনৈতিক ধাক্কার ঝুঁকিও থেকে যাচ্ছে।

কানাডার জন্য আগামী মাসগুলো হবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—কারণ এখানেই নির্ধারিত হবে দেশের অর্থনীতির ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা: বহুপাক্ষিক বাণিজ্যের পুরনো পথে, না কি নতুন দ্বিপাক্ষিক কৌশলে।

- Advertisement -

Related Articles

Latest Articles