এমএআইডি-সংক্রান্ত বড় সিদ্ধাস্ত সরকারের

এমএআইডি-সংক্রান্ত বড় সিদ্ধাস্ত সরকারের - the Bengali Times
৭ অক্টোবর বিচারমন্ত্রী শন ফ্রেজার ও স্বাস্থ্যমন্ত্রী মারজোরি মিশেল সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপ তুলে ধরেন

কানাডায় চিকিৎসকের সহায়তায় জীবনাবসানের ব্যবস্থা মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্স ইন ডাইং (এমএআইডি) নিয়ে নতুন আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে ফেডারেল সরকার। মানসিক অসুস্থতাই একমাত্র চিকিৎসাগত কারণ এমন ব্যক্তিদের জন্য এমএআইডির যোগ্যতা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা থেকে সরে আসার ঘোষণা দিয়েছেন দেশটির বিচারমন্ত্রী শন ফ্রেজার। একই সঙ্গে গুরুতর ও নিরাময় অযোগ্য অসুস্থতায় আক্রান্ত ব্যক্তিরা ভবিষ্যতে সিদ্ধান্ত জানানোর সক্ষমতা হারাতে পারেন এমন পরিস্থিতির কথা বিবেচনায় নিয়ে আগাম সম্মতির সুযোগ চালুর জন্য আইন আনার পরিকল্পনাও জানিয়েছে সরকার।

২০২৬ সালের ৭ অক্টোবর বিচারমন্ত্রী শন ফ্রেজার ও স্বাস্থ্যমন্ত্রী মারজোরি মিশেল সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপ তুলে ধরেন। তাঁদের ঘোষণায় কানাডার এমএআইডি নীতিতে দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে এসেছে: মানসিক অসুস্থতাকে একমাত্র কারণ হিসেবে বিবেচনা করে যোগ্যতা সম্প্রসারণ না করা এবং নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে আগাম সম্মতির আইনি সুযোগ তৈরি করা। সরকারের এই সিদ্ধান্ত এমন এক সময়ে এল, যখন চিকিৎসকের সহায়তায় জীবনাবসানের অধিকার, রোগীর ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা এবং ঝুঁকিতে থাকা মানুষের সুরক্ষা নিয়ে কানাডায় দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক চলছে।

- Advertisement -

বর্তমান আইনি কাঠামোয় কেবল মানসিক অসুস্থতায় আক্রান্ত হওয়ার কারণে কেউ এমএআইডির যোগ্য নন। আগে এই বিধিনিষেধের মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৭ সালের ১৭ মার্চ পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে নতুন ঘোষণায় সরকার জানিয়েছে, এই সম্প্রসারণ আর এগিয়ে নেওয়া হবে না এবং মানসিক অসুস্থতাকে একমাত্র অন্তর্নিহিত চিকিৎসাগত অবস্থা হিসেবে বিবেচনা করে এমএআইডির যোগ্যতা দেওয়ার পরিকল্পনা অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত থাকবে।

এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। মানসিক স্বাস্থ্যজনিত অসুস্থতার ক্ষেত্রে রোগ নির্ণয়, চিকিৎসার ফলাফল এবং সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা মূল্যায়নের জটিলতা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। অন্যদিকে, ব্যক্তির স্বায়ত্তশাসন ও নিজের চিকিৎসাসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকারের প্রশ্নও আলোচনায় রয়েছে। ২০২৬ সালের ১৭ জুন একটি সংসদীয় কমিটি মানসিক অসুস্থতাকে একমাত্র কারণ হিসেবে দেখিয়ে এমএআইডির যোগ্যতা সম্প্রসারণ অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত রাখার সুপারিশ করেছিল। অক্টোবরের ঘোষণায় সরকার সেই সুপারিশ অনুসরণের সিদ্ধান্ত জানায়।

সরকারের পরিকল্পনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, গুরুতর ও নিরাময় অযোগ্য রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য আগাম সম্মতির আইনি ব্যবস্থা চালু করা। কোনো ব্যক্তি রোগের প্রাথমিক পর্যায়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা বজায় থাকতেই ভবিষ্যতে এমএআইডি নেওয়ার ইচ্ছা জানাতে পারেন। পরে অসুস্থতার কারণে সম্মতি দেওয়ার সক্ষমতা হারালে সেই আগাম সিদ্ধান্ত কীভাবে কার্যকর হবে, প্রস্তাবিত আইনে তা নির্ধারণ করা গুরুত্বপূর্ণ হবে।

আলঝেইমারের মতো রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে বিষয়টি বিশেষভাবে আলোচিত। রোগের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে কারও সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা কমে যেতে পারে। ফলে রোগের এমন পর্যায়ে পৌঁছানোর আগেই নিজের ইচ্ছা জানানোর সুযোগ থাকা উচিত কি না, তা নিয়ে চিকিৎসা, আইন ও নৈতিকতার প্রশ্ন উঠেছে। তবে আগাম সম্মতি চালুর ঘোষণা মানেই পুরো কানাডায় এই ব্যবস্থা ইতিমধ্যে কার্যকর হয়েছে, এমন নয়। এর জন্য আইন প্রণয়ন এবং বাস্তবায়নের কাঠামো নির্ধারণ প্রয়োজন। বিভিন্ন প্রদেশ ও অঞ্চলে এ ধরনের অনুরোধ কীভাবে পরিচালিত হবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

১৮৯২: কানাডার ফৌজদারি আইনে আত্মহত্যায় সহায়তা করাকে অপরাধ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। আত্মহত্যা নিজেও তখন অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতো।

১৯৭২: ফেডারেল সরকার আত্মহত্যাকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করার বিধান বাতিল করে। তবে আত্মহত্যায় সহায়তা করার বিরুদ্ধে আইনি নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকে।

১৯৯১–২০১০: সহযোগিতার ভিত্তিতে আত্মহত্যাকে অপরাধের আওতার বাইরে আনার বিষয়ে হাউস অব কমন্সে একাধিক বেসরকারি বিল নিয়ে আলোচনা হয়। এসব উদ্যোগের কোনোটিই আইনে পরিণত হয়নি।

১৯৯৩: এএলএসে আক্রান্ত সু রডরিগেজ আত্মহত্যায় সহায়তা নিষিদ্ধ করার বিধানের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে চ্যালেঞ্জ জানান। আদালত ৫-৪ ভোটে তাঁর আবেদন খারিজ করে।

১৯৯৫: স্বেচ্ছামৃত্যু ও আত্মহত্যায় সহায়তার বিষয়ে একটি বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করে কানাডার সিনেট কমিটি।

২০০৯: কুইবেকের চিকিৎসকদের সংগঠন কলেজ ডেস মেডিসিন্স ডু কুইবেক একটি আলোচনাপত্রে বিশেষ পরিস্থিতিতে স্বেচ্ছামৃত্যুর সম্ভাব্য ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করে।

২০১০: নেদারল্যান্ডস, বেলজিয়াম, লুক্সেমবার্গ, সুইজারল্যান্ড, কলম্বিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে চিকিৎসা সহায়তায় জীবনাবসান বা সহায়তাপ্রাপ্ত মৃত্যুর বিভিন্ন ধরন আইনি স্বীকৃতি পায়।

২০১১–২০১২: ব্রিটিশ কলাম্বিয়া সিভিল লিবার্টিজ অ্যাসোসিয়েশন আত্মহত্যায় সহায়তা নিষিদ্ধকারী ফৌজদারি বিধানের বিরুদ্ধে মামলা করে। ২০১২ সালে ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার সুপ্রিম কোর্ট সংগঠনটির পক্ষে রায় দিলে তৎকালীন ফেডারেল সরকার আপিল করে।

২০১২: কুইবেকের ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলির একটি কমিটি সম্মানের সঙ্গে মৃত্যু বিষয়ে দুই বছরের পর্যালোচনার পর প্রতিবেদন প্রকাশ করে।

২০১৩: কার্টার মামলা আপিল আদালতে যায়। মামলাটি পরবর্তী সময়ে কানাডার এমএআইডি আইন পরিবর্তনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

২০১৪: কুইবেকের ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি চিকিৎসা সহায়তায় জীবনাবসানসংক্রান্ত আইন পাস করে। আইনটি ২০১৫ সালে কার্যকর হয়।

২০১৫: কার্টার বনাম কানাডা মামলায় সুপ্রিম কোর্ট সর্বসম্মতভাবে রায় দেয় যে, নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে চিকিৎসা সহায়তায় জীবনাবসান নিষিদ্ধ করার বিধান সংবিধানসম্মত নয়। আদালতের সিদ্ধান্ত ফেডারেল আইন পরিবর্তনের পথ তৈরি করে।

২০১৬: সংসদ বিল সি-১৪ পাস করে। ১৭ জুন রাজকীয় সম্মতি পাওয়ার মাধ্যমে কানাডায় এমএআইডির জন্য প্রথম পূর্ণাঙ্গ ফেডারেল আইনি কাঠামো কার্যকর হওয়ার পথ তৈরি হয়।

২০১৯: কুইবেকের সুপিরিয়র কোর্ট রায় দেয়, স্বাভাবিক মৃত্যু যুক্তিসংগতভাবে নিকটবর্তী শুধু এমন ব্যক্তিদের মধ্যে এমএআইডির যোগ্যতা সীমাবদ্ধ রাখা অসাংবিধানিক।

২০২১: বিল সি-৭ কার্যকর হয়। এর মাধ্যমে স্বাভাবিক মৃত্যু যুক্তিসংগতভাবে প্রত্যাশিত হওয়ার শর্ত তুলে নেওয়া হয় এবং যোগ্যতা ও সুরক্ষাব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা হয়। তবে যাঁদের একমাত্র চিকিৎসাগত অবস্থা মানসিক অসুস্থতা, তাঁদের ক্ষেত্রে সাময়িক নিষেধাজ্ঞা বজায় থাকে।

২০২৩: মানসিক অসুস্থতাকে একমাত্র অন্তর্নিহিত চিকিৎসাগত অবস্থা হিসেবে বিবেচনা করে এমএআইডির যোগ্যতা দেওয়ার বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের প্রতিবেদন ও সুপারিশ নিয়ে আলোচনা চলতে থাকে। একই বছর আইন সংশোধনের মাধ্যমে এই যোগ্যতা সম্প্রসারণের সময়সীমা ২০২৪ সাল পর্যন্ত পিছিয়ে দেওয়া হয়।

২০২৪: নতুন আইন করে মানসিক অসুস্থতাকে একমাত্র কারণ হিসেবে দেখিয়ে এমএআইডির যোগ্যতা সম্প্রসারণের সময়সীমা ২০২৭ সালের ১৭ মার্চ পর্যন্ত স্থগিত করা হয়।

১৭ জুন, ২০২৬: একটি সংসদীয় কমিটি মানসিক অসুস্থতার ক্ষেত্রে এমএআইডির যোগ্যতা সম্প্রসারণ অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত রাখার সুপারিশ করে।

৭ অক্টোবর, ২০২৬: বিচারমন্ত্রী শন ফ্রেজার ঘোষণা দেন, সরকার ওই সুপারিশ অনুসরণ করবে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে সম্মতি দেওয়ার সক্ষমতা হারাতে পারেন এমন গুরুতর ও নিরাময় অযোগ্য রোগীদের জন্য আগাম সম্মতির ব্যবস্থা চালুর লক্ষ্যে আইন আনার পরিকল্পনা জানানো হয়।

কানাডার এমএআইডি আইন কয়েক দশকে একাধিকবার পরিবর্তিত হয়েছে। আদালতের রায়, সংসদীয় বিতর্ক, চিকিৎসাবিষয়ক গবেষণা এবং রোগীর অধিকার নিয়ে আলোচনা প্রতিবারই আইনটির পরিধি ও সুরক্ষাব্যবস্থা নির্ধারণে ভূমিকা রেখেছে। সর্বশেষ ঘোষণায় সরকার একদিকে মানসিক অসুস্থতাকে একমাত্র কারণ হিসেবে বিবেচনা করে যোগ্যতা সম্প্রসারণের পথ বন্ধ রাখার অবস্থান নিয়েছে, অন্যদিকে আগাম সম্মতির সুযোগ তৈরির উদ্যোগ জানিয়েছে। এই দুই সিদ্ধান্তের বাস্তব প্রয়োগ নির্ভর করবে প্রস্তাবিত আইন, সংশ্লিষ্ট সুরক্ষাব্যবস্থা এবং প্রদেশ ও অঞ্চলগুলোর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার ওপর।

এমএআইডি নিয়ে কানাডার বিতর্ক তাই শুধু চিকিৎসকের সহায়তায় জীবনাবসানের অধিকার নিয়ে নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা, রোগীর স্বাধীনতা, মানসিক স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতা এবং দুর্বল অবস্থায় থাকা ব্যক্তিদের সুরক্ষার প্রশ্নও। নতুন আইন প্রণয়নের প্রক্রিয়ায় এসব বিষয় কীভাবে বিবেচিত হয়, সেদিকেই এখন নজর থাকবে।

- Advertisement -

Related Articles

Latest Articles