৮০ দশকের রূপ ধারণের জোয়ার

৮০ দশকের রূপ ধারণের জোয়ার - the Bengali Times
সৈয়দ ইকবাল

শুভ জন্মদিন বন্ধু-ইমদাদুল হক মিলন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় সবার ৮০ দশকের রূপ ধারণের জোয়ার চলছে সোশ্যাল মিডিয়াতে। আমার মনে হলো ৮০ দশকে ফেক নয় সত্যি কোনো ছবি আছে কিনা খুঁজি তোমার সঙ্গে। পেয়েও গেলাম। দেখেতো নিজেই অবাক। মনে পড়তে লাগলো ছবির সময় আমরা কেমন ছিলাম ও ঘটনার ঘনঘটা।  সত্তর দশক শেষ হতেই আমরা নিজেদের লেখা লেখি নিয়ে স্ট্রাগাল অনেকটা শেষ করে ফেলেছি। ঢাকার যে কোনো পত্রিকায় আমাদের গল্প দিলেই অনায়াসে ছাপা হতো। এমন কি তুমি ও আমি কলকাতার অমৃতবাজার পত্রিকার সাপ্তাহিক মেগাজিন অনেকটা ‘দেশ’ এর মত। ‘অমৃত’তে গল্প পাঠালাম। শঙ্কা হচ্ছিলো হয়তো মিলনে গল্প ছাপা হবে,আমার নয়। তবে দুইজনের গল্পই ছাপা হয়ে ছিলো। আমি তখন বিটপী নামের দেশের বড় এ্যাড এজেন্সীতে জমে উঠেছি। তুমিও নামীদামী সব পত্রিকায় কাজ আর দুইহাতে লিখে বেশ ভালো আছো। নিজেদের তখন গাড়ি টারি না থাকলেও অভাবী ছিলামনা। তোমাকে চিনতে শুরু করেছে অনেকে। বিশেষ করে তরুণ তরুণিরা। আমিও চাইতাম আমার লেখা পড়ে পাঠক চিনুক! হয়তো আমার বোমবাস্টিক লেখা তাদের তেমন পছন্দের নয়। তাই তা হয়নি। তোমার মত এমন সহজ সরল ভাবে চেষ্টা করেও পারিনি লিখতে। ক’দিন হয় টরন্টর মনস্তাত্ত্বিক লেখিকা তাসমিনা খানের ‘আমি আমারই মতন’ বইয়ের প্রকাশনা উৎসবে গলাবাজীর সুযোগ পেয়ে ছিলাম। বইটির নাম এখান মনে আসলো। লিখতে পারি আর না পারি নিজের সুন্দর দাড়ি কেটে তোমার মত শুধু গোফ রেখে ছিলাম তখন।

প্রয়ত আমাদের দুইজনের কবিবন্ধু সেই সময় সিনে সাংবাদিক হিসাবে ইত্তেফাক থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক ‘পূর্বাণী’ পত্রিকায় কাজ করতো। তখনকার সম্ভাবনাময় গল্পকারদের ছবিসহ বড় এক সাক্ষাৎকার  ছেপে ছিলো তোমার আমার ও তাপস মজুমদার,বারেক আবদুল্লাহর।

- Advertisement -

তখন আমি প্রায় যেতাম ঢাকার আলিয়ঁস ফ্রঁসেজের আর্ট গ্যালারী কাম ক্যাফেতে। পেইন্টিং এগজিবিশনে ওপেনিং একটাও বাদ পড়তোনা। ওপেনিং এ তখন কেক,কুকিস,কফির সঙ্গে লাল ও সাদা ফ্রেঞ্চ ওয়াইন ও থাকতো। আমার জায়গাটা জোস লাগতো বলে তোমাকেও নিয়ে গেলাম। তুমিও খুব পছন্দ করলে।

সবই ভালো ধনী ঘরের সুন্দর স্মার্ট ইংরেজী বলা মেয়েরা আসতো ফ্রেঞ্চ শিখতে। আমরা ধনীপুত্র না হলেও দেখতে তেমন একটা খারাপ ছিলামনা। তবু তারা আমাদের দিকে তেমন একটা তাকিয়ে দেখতোনা ,কথাতো বোলতোইনা! দুইজনই আফসোস নিয়ে সুনীলদার ‘কেউ কথা রাখেনি’ কবিতার  এই ক’টা লাইন মনে করতাম – লাঠি লজেন্স দেখিয়ে দেখিয়ে চুষেছে লস্করবাড়ির ছেলেরা/ ভিখারীর মত চৌধুরীদের গেটে দাঁড়িয়ে দেখেছি/ ভিতরে রাস-উৎসব…..।

একদিন ঘটলো অন্য রকম ঘটনা। বেশ লম্বা কার্লি চুলের সুন্দর মেয়েটি আলিয়ঁজ নম্বর ওয়ান যে মাঝেমধ্যে হাল্কা ভাবে আড় চোখে তাকাতো। সে সোজা আমার সামনে লম্বা হিলের খুটখুট শব্দ করে হেঁটে  এসে দাঁড়িয়ে বল্লো-হাই!

আমি সবে শিখেছি মাত্র যে হ্যালো মানেই-হাই।

আমি যথাসাধ্য চেষ্টা করছিলাম মাটিতে দাঁড়িয়ে থাকতে! তবে কেন যেন মনে হচ্ছিলো আমি একটা গ্যাস ভরা বেলুনের মত ওপরে উঠে মাথা শিলিং এ ঠেকাতে চলেছি।

– ইউ হ্যাভএ লাইটার? ওর হাতের আঙ্গুলে চাপা সিগারেট।

আমি যেহেতু সিগারেট খাইনা। পড়ি কি মরি করে সবাইকে সরিয়ে তোমার কাছে গিয়ে লাইটার এনে ওর হাতে দিলাম।

এরপর থেকে টুকটাক কথা বলতো মেয়েটি। ক্যাফেতে দেখা হলে কফি,কুকিস খাইয়ে জোর করে নিজেই টাকা দিয়ে দিতো।বোঝাতে চাইতো হয়তো টাকা কোনো বিগডিল নয়।

এসব দেখে মিলন তুমি বলেই ফেল্লে-কি মিয়াঁ চাটগাঁইয়া নওজাওয়ান! কি জাদু করলা?

তোমার কথায় নজর লেগে ছিলো কিনা কে জানে! হাল্কা সক্ষতা,যা হয়ে উঠছিলো তাও গেলো ভেঙ্গে।

পরের দিন সন্ধ্যায় ক্লাশ শেষে প্রায় দোঁড়ে এসে বলেছিলো সে – আমার ড্যাড কি আর্জেন্ট কাজে ড্রাইভারকে গাড়ি সহ ঘন্টা খানেকের জন্যে কোথায় যেন পাঠিয়েছেন। আমার এখনি একটু বাড়ি যেতে হবে। তোমার গাড়িতে কি ড্রপ করে দিয়ে আসতে পারবে?

আমি মিথ্যা বলতে পারতাম যে –আহ হা! এই একটু আগে আমার  মা কোথায় যেন যাবেন তাই পাঠিয়ে দিলাম গাড়ি! তবে আমার দ্বারা এস সব বোমবাস্টিক মিথ্যা বলা হয়ে ওঠেনা। তাই সত্যিটাই বলে দিয়ে ছিলাম – আমারতো গাড়ি নেই,রিক্সায় চলাচল করি। বলোতো রিক্সায় দিয়ে আসি।

মেয়েটি তার লম্বা চুল এক ঝটকায় মাথা ঘুরিয়ে দ্রুত পায় হিলের শব্দ করে চলে গেলো। আর এরপর থেকে কাছেও আসতোনা, তেমন  তেমন একটা কথাও বলতোনা।

তুমি মিলন জড়িয়ে ধরে পিঠে হাত রেখে বলে ছিলে –দুঃখ করিসনা দোস্ত,এরা হাইফাই কীড,এরা এমনি হয়।

তবু খুব রাগ যায়নি। ভাবছিলাম বাড়ি যাইতে চাইছো  আমি রিক্সা না হোক বেবী টেক্সীতে(তগনকার সিএনজি)  দিয়ে আসতাম! রাগের কি আছে। হয়তো সে ভাবেনি আমি গাড়িহীন ক্লাশ।

মাত্র কয়েক বছর পর আমারও নিজের প্রথম গাড়ি হলো টু ডোর টয়োটা পাবলিকা সাদা। মেনুয়াল গিয়ারের পঙ্ক্ষীরাজ। ফার্স্ট গীয়ার দিলে আকাশে লাফ মারতে চায়। যথারীতি তখনও আলিয়ঁজে যাই, ছবির প্রদর্শনীর উদ্বোধনেও থাকি।মেয়েটিও ফ্রেঞ্চে ক্লাশের শেষ ধাপে পৌঁছে গেছে। তখনি প্রতি বছরের মত আলিয়ঁজের তিনতলার ছাদে শামিয়ানা টাঙ্গিয়ে প্রতি বছরের মত জমজমাট নিউ ইয়ার্স পার্টিতে মেয়েটি ঠিক মাতাল নয় তবে কিছুটা বেশামাল হয়ে পড়ে ছিলো। সে রাতেও দেরি হবে ভেবে সে গাড়ি  বাসায় যেতে বলে দিয়েছে।বুড়ো ড্রাইভার শুধু বসে থাকবে তাই ঘন্টা তিনেক পরে এসে নিয়ে যেতে বলে বিদায় করেছিলো। তিন ঘন্টার তখন অনেক বাকি অথচ সে বেশামাল,আর ভালো লাগছেনা। প্রচন্ড মিউজিকে তার এক হাত উঁচিয়ে চিৎকার সবাই শুনলো –আই ওয়ানে গো হোম! হু ড্রপমী?

সাথে সাথে যত রাজপুত্রা এমনকি বেশ কয়েকজন বুড্ডা রাজারাও তাকে ঘিরে ফেলে বলতে লাগলো-আমি,আমি,আমি!

আমি একটু দূরে পিলারে পিঠ ঠেকিয়ে রেড পান ওয়াইনে চুমুক দিচ্ছি। চিৎকার করে বল্লাম-আমি আর গাড়িহীন নই জ্যাসমিন! আমার একটা সাদা টু ডোর পাবলিকা পঙ্ক্ষীরাজ আছে। যাবে আমার সঙ্গে?

এত হট্টোগোল আর মিউজিকের মধ্যেও সে ঠিকই শুনলো আমাকে। একহাতে ওয়াইন গ্লাস অন্য হাতে সবাইকে ঠেলে সরিয়ে লম্বা হিলের খুটখাট শব্দ করে একেবারে আমার সামনে এসে দাঁড়ালো।

– রীয়েলি, তোমার পঙ্ঙ্কীরাজ আছে! আমি তোমার সাথেই যাবো!

সবাই খেঁকিয়ে উঠলো-কি করছো বেবী! টু ডোর পাবলিকা কিসের পঙ্ক্ষীরাজ! আমার নতুন হোন্ডা হেডম আছে! আমার সঙ্গে এসো।

– নো,নো আমি ওর সাথে পঙ্ক্ষীরাজে যাবো। আমাকে শক্ত করে ধরো ইকবাল,সিঁড়ি দিয়ে নামতে আমি পড়ে যেতে পারি।

হ্যামিলনের বংশী বাদকের পেছনে যেমন মানুষেরা পিছু নিয়ে ছিলো তেমনি হুড়মুড় করে ওরা সবাই নেমে এলো আমাদের পিছুপিছু। মিরপুর রোডে আলিয়ঁজের সামনে আমার পাবলিকার পেসেঞ্জার সিটের দিকের দরজা খুলে ওকে বসাতে যুদ্ধ করতে হলো। প্রায় তারা তাকে টেনে ধরে নিয়ে যেতে চায়। আমিও তখন কম ছিলামনা! ভেতরে ঠেলে বসিয়ে দরজা লক টিপে বন্ধ করে ঘুরে এসে ড্রাইভিং সিটে বসে ফার্স্ট গীয়ার দিতে পাবলিকা পঙ্ক্ষীরাজ যাম্প দিলো সামনে। পেছনে সবাই ভারসাম্য হারিয়ে পড়ে যায়যায় অবস্থা। হপ্তার সাত দিনে নিজের পাঁচটি   গাড়ি একএকদিন আনা আমার থেকে দশ বছরের ছোট ধানমুন্ডি ও আলিয়ঁজের হিরো কষে আমার পঙ্ক্ষীরাজে পাছায় লাথি মারলো। আমার পঙ্ক্ষীরাজ তত ভদ্র কিছু নয়,রেগে বল্লো-সিউচেশন স্যার অন্য রকম তানা হলে ব্যাক গীয়ার দিয়ে লাথি মারা পা ভেঙ্গে দিয়ে যেতাম।

প্রায় ৪০ বছর পর আবার আমার হিরোর সাথে সেই আলিয়ঁজের ক্যাফেতে দেখা হয়ে ছিলো। অবস্থা এমনই নিজের পায়ে বেশিক্ষণ দাঁড়ালে পাঁ কাঁপে,শরীরও কাঁপে।

*বন্ধু ইমদাদুল হক মিলনের আরো অনেক মজার স্মৃতি জমে আছে লেখা হয়ে ওঠেনি। মিলন তার ‘বন্ধু বান্ধব’ বইয়ে আমার ও অভিনেতাবন্ধু ফরিদীর এক মজার ঘটনা বড়ই চমৎকার ভাবে লিখেছে অনেক আগে।

- Advertisement -

Related Articles

Latest Articles