
স্বয়ংক্রিয় গাড়ির দুনিয়ায় আরও এক ধাপ এগোল আমেরিকা। ভবিষ্যতের রোবোট্যাক্সিতে স্টিয়ারিং হুইল, ব্রেক প্যাডেল কিংবা মানুষের হাতে থাকা প্রচলিত ম্যানুয়াল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা না থাকলেও যাতে সেগুলি রাস্তায় চলতে পারে, সেই পথ আরও সহজ করার উদ্যোগ নিয়েছে মার্কিন ফেডারেল নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলি। দ্রুত বদলে যাওয়া স্বয়ংক্রিয় গাড়ি প্রযুক্তির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পুরনো পরিবহণ-নিয়ম আধুনিক করাই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য। এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী হতে পারে অ্যামাজনের মালিকানাধীন স্বয়ংক্রিয় গাড়ি সংস্থা জুক্স। বৃহস্পতিবার সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয়, বিশেষভাবে নকশা করা জুক্স গাড়িতে যাত্রী পরিবহণের জন্য অর্থ নেওয়ার অনুমতি মিলেছে। এত দিন নির্দিষ্ট এলাকায় পরীক্ষামূলকভাবে বিনামূল্যে যাত্রী পরিষেবা দেওয়া হলেও এবার বাণিজ্যিকভাবে সেই পরিষেবা চালুর দিকে এগোতে পারবে সংস্থাটি।
জুক্সের গাড়ির নকশাই প্রচলিত গাড়ির তুলনায় সম্পূর্ণ আলাদা। গাড়িটিতে মুখোমুখি চারটি আসন রয়েছে এবং এটি মূলত চালকবিহীন যাত্রী পরিবহণের কথা মাথায় রেখেই তৈরি। অর্থাৎ, এখানে সামনে বসে থাকা কোনও চালক নেই, নেই স্টিয়ারিং হুইল বা প্রচলিত ড্যাশবোর্ডের সেই পরিচিত কাঠামোও। প্রযুক্তিগত দিক থেকে এই নকশা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, বর্তমানে রাস্তায় চলা অধিকাংশ গাড়ি মানুষের চালানোর বিষয়টি মাথায় রেখে তৈরি। ফলে স্টিয়ারিং, ব্রেক, অ্যাক্সিলারেটরসহ একাধিক ম্যানুয়াল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক বা প্রচলিত। কিন্তু সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় গাড়িতে যখন মানুষের চালানোর প্রয়োজনই নেই, তখন এই সরঞ্জামগুলি রাখার যৌক্তিকতা নিয়েই প্রশ্ন উঠছে। নতুন প্রজন্মের রোবোট্যাক্সি সেই ধারণাটিকেই বদলে দিতে চাইছে।
জুক্স গত বছর থেকেই লাস ভেগাস এবং সান ফ্রান্সিসকোতে বিনামূল্যে রোবোট্যাক্সি পরিষেবা দিয়ে আসছে। সেই পরিষেবার মাধ্যমে বাস্তব রাস্তায় যাত্রী পরিবহণ, গাড়ির স্বয়ংক্রিয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং বিভিন্ন পরিস্থিতিতে প্রযুক্তির কার্যকারিতা পরীক্ষা করার সুযোগ পেয়েছে সংস্থাটি। এখন অর্থের বিনিময়ে যাত্রী পরিবহণের অনুমতি পাওয়াকে তাই জুক্সের ব্যবসায়িক যাত্রায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক হিসেবে দেখা হচ্ছে। পরীক্ষামূলক পরিষেবা থেকে ধীরে ধীরে বাণিজ্যিক পরিষেবায় প্রবেশের দরজা খুলে গেল সংস্থাটির সামনে। জুক্স জানিয়েছে, ইতিমধ্যেই পাঁচ লক্ষেরও বেশি মানুষ তাদের স্বয়ংক্রিয় গাড়িতে ভ্রমণ করেছেন। ফলে সংস্থার দাবি, প্রযুক্তিটি শুধুমাত্র পরীক্ষাগারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বাস্তব পরিস্থিতিতেও বিপুল সংখ্যক যাত্রীর সঙ্গে এটি পরীক্ষা করা হয়েছে।
স্বয়ংক্রিয় গাড়িতে প্রথমবার ওঠার অভিজ্ঞতা যে অনেকের কাছেই অস্বস্তিকর হতে পারে, তার একটি বাস্তব উদাহরণ দিয়েছেন মিশিগানের অ্যান আরবারের বাসিন্দা ক্লো হু। জুক্সে ভ্রমণের পর তিনি জানান, শুরুতে অভিজ্ঞতাটি তাঁর কাছে কিছুটা ভয়ঙ্কর ছিল। কারণ গাড়িতে কোনও মানুষ চালকের আসনে নেই এই দৃশ্য এখনও অধিকাংশ যাত্রীর কাছে অস্বাভাবিক। তবে কিছুটা সময়ের মধ্যেই সেই ভয় কেটে যায় এবং অভিজ্ঞতাটি উপভোগ্য হয়ে ওঠে। গাড়ির ভিতরের পরিবেশও তাঁকে আকৃষ্ট করেছে। তাঁর ভালো লেগেছে গাড়িতে বাজতে থাকা গান এবং তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা। অর্থাৎ, রোবোট্যাক্সি শুধু চালককে সরিয়ে দেওয়ার প্রযুক্তি নয়; যাত্রীর অভিজ্ঞতাকে নতুনভাবে সাজানোর দিকেও নজর দেওয়া হচ্ছে। তবে সমস্যার জায়গাও রয়েছে। ক্লো হুর অভিজ্ঞতায় গাড়ির আনুমানিক অপেক্ষার সময় বারবার পরিবর্তিত হয়েছে। ফলে আগে থেকে যাত্রার পরিকল্পনা করা কিছুটা কঠিন হয়েছে। এই বিষয়টি দেখিয়ে দেয়, প্রযুক্তি যতই উন্নত হোক, বাস্তব পরিষেবায় পৌঁছনোর ক্ষেত্রে শুধু গাড়ির স্বয়ংক্রিয় চালনা নয় যাত্রী পরিষেবা, সময়ের নির্ভুলতা এবং অ্যাপভিত্তিক বুকিং ব্যবস্থার মতো বিষয়গুলিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
রোবোট্যাক্সির প্রসারকে আরও সহজ করতে মার্কিন ন্যাশনাল হাইওয়ে ট্রাফিক সেফটি অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বা এনএইচটিএসএ-ও নিজেদের নিয়ম আধুনিক করার পথে এগোচ্ছে। সংস্থাটি গত মাসে এমন একটি প্রস্তাব দিয়েছে, যার মাধ্যমে ব্রেক প্যাডেল বা প্রচলিত ম্যানুয়াল নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই তৈরি সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় গাড়িকে পরিচালনার অনুমতি দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে। যদিও সেই প্রস্তাবের চূড়ান্ত অনুমোদন এখনও হয়নি, তবু এর গুরুত্ব যথেষ্ট। কারণ, স্বয়ংক্রিয় গাড়ির প্রযুক্তি যে গতিতে এগোচ্ছে, তার সঙ্গে বহু পুরনো পরিবহণ-নিরাপত্তা বিধি সবসময় সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এত দিন ধরে গাড়ির নকশা তৈরি হয়েছে এই ধারণার ভিত্তিতে যে, প্রয়োজনে একজন মানুষ গাড়ির নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নিতে পারবেন। কিন্তু সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় গাড়ির ক্ষেত্রে সেই ধারণাটিই অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ছে। এনএইচটিএসএ-র প্রশাসক জোনাথন মরিসনের বক্তব্য, সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় গাড়ির প্রযুক্তির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নিয়মকানুনকে আধুনিক করা প্রয়োজন। অর্থাৎ, নিয়ন্ত্রক সংস্থার লক্ষ্য প্রযুক্তিকে আটকানো নয়; বরং নতুন প্রযুক্তির বাস্তবতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিরাপত্তা বিধি তৈরি করা।
জুক্সের পিছনে রয়েছে বিশ্বের অন্যতম বড় প্রযুক্তি সংস্থা অ্যামাজন। স্বয়ংক্রিয় পরিবহণের বাজারে অ্যামাজনের লক্ষ্য শুধু পরীক্ষামূলক পরিষেবা চালানো নয়; বরং ভবিষ্যতে এই বাজারে বড় খেলোয়াড় হয়ে ওঠা। ওয়েমোর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নামতে সিলিকন ভ্যালির কাছে নিজেদের একটি কারখানায় বছরে প্রায় ১০ হাজার রোবোট্যাক্সি তৈরি করার পরিকল্পনা রয়েছে অ্যামাজনের। এর মাধ্যমে বোঝা যায়, সংস্থাটি রোবোট্যাক্সিকে দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসার একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে দেখছে। অ্যামাজন ১২০ কোটি ডলার ব্যয়ে স্বয়ংক্রিয় গাড়ি তৈরির স্টার্টআপ জুক্সকে অধিগ্রহণ করেছিল। সেই বিনিয়োগের পর এবার জুক্সের প্রযুক্তিকে পরীক্ষামূলক পর্যায় থেকে বড় পরিসরে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা শুরু হয়েছে। সংস্থার পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী দুই বছরের মধ্যে স্টিয়ারিং হুইলবিহীন প্রায় ২,৫০০টি গাড়ি রাস্তায় নামানো হতে পারে। এর অর্থ, আগামী কয়েক বছরেই শহরের পরিবহণ ব্যবস্থায় চালকবিহীন গাড়ির উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো বাড়তে পারে।
রোবোট্যাক্সি বাজারে অ্যামাজনের প্রধান লক্ষ্যগুলির একটি হল ওয়েমোর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করা। ওয়েমো ইতিমধ্যেই চালকবিহীন গাড়ির বাণিজ্যিক পরিষেবা নিয়ে যথেষ্ট এগিয়ে রয়েছে। ফলে অ্যামাজনের জন্য জুক্সকে দ্রুত বাণিজ্যিকভাবে কার্যকর করে তোলা গুরুত্বপূর্ণ। এখানে প্রতিযোগিতা শুধু কে বেশি গাড়ি রাস্তায় নামাতে পারবে তা নিয়ে নয়। নিরাপত্তা, যাত্রীর আস্থা, পরিষেবার নির্ভরযোগ্যতা, অপেক্ষার সময়, ভাড়া এবং কোন কোন শহরে পরিষেবা দেওয়া যাবে সবকিছুই ভবিষ্যতের রোবোট্যাক্সি বাজারে সাফল্যের মাপকাঠি হতে চলেছে।
রোবোট্যাক্সির প্রযুক্তিগত সাফল্যের পাশাপাশি সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ সম্ভবত মানুষের আস্থা অর্জন করা। গাড়ির ভিতরে বসে থাকা যাত্রীর সামনে যখন কোনও চালক নেই, তখন কোনও অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে গাড়িটি কী সিদ্ধান্ত নেবে এই প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই থাকবে। তাই নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলির জন্যও বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রযুক্তিকে অনুমতি দেওয়ার পাশাপাশি দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে দায়বদ্ধতা, নিরাপত্তার মান, সফটওয়্যারের নির্ভরযোগ্যতা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে গাড়ির আচরণ এই প্রতিটি বিষয়কে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করতে হবে।
তবে জুক্সের সাম্প্রতিক অগ্রগতি একটি বিষয় স্পষ্ট করে দিচ্ছে চালকবিহীন গাড়ি আর কেবল ভবিষ্যতের কল্পনা নয়। আমেরিকার কিছু শহরে তা ইতিমধ্যেই বাস্তব। এখন প্রশ্ন হল, পরীক্ষামূলক পরিষেবা থেকে কত দ্রুত তা নিয়মিত এবং লাভজনক গণপরিবহণ ব্যবস্থায় পরিণত করা যায়। অ্যামাজনের জুক্স সেই পরিবর্তনের অন্যতম বড় পরীক্ষামঞ্চ। স্টিয়ারিং হুইলবিহীন গাড়ি যখন ধীরে ধীরে রাস্তায় স্বাভাবিক দৃশ্যে পরিণত হবে, তখন শুধু গাড়ির প্রযুক্তিই বদলাবে না বদলাতে হবে পরিবহণের নিয়ম, ব্যবসার মডেল এবং সর্বোপরি মানুষের গাড়ি চালানো ও যাতায়াত সম্পর্কে দীর্ঘদিনের ধারণাও।

