
সিজোফ্রেনিয়া এবং মেজর ডিপ্রেসিভ ডিসঅর্ডারের (বিষণ্ণতা) চিকিৎসায় ব্যবহৃত বহুল পরিচিত প্রেসক্রিপশন ওষুধ রেক্সালটি-কে ঘিরে কানাডায় হওয়া একটি বহুল আলোচিত জাতীয় ক্লাস অ্যাকশন মামলার ক্ষতিপূরণ দাবি করার সময় দ্রুত শেষ হয়ে আসছে। আদালত-অনুমোদিত ৪৭ লাখ ৫০ হাজার ডলারের (৪.৭৫ মিলিয়ন ডলার) সমঝোতা তহবিল থেকে ক্ষতিগ্রস্তরা আগামী ২৭ আগস্ট পর্যন্ত আবেদন জমা দিতে পারবেন। এই সমঝোতার আওতায় সেই সব কানাডিয়ান নাগরিক রয়েছেন, যাদের চিকিৎসক ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে রেক্সালটি প্রেসক্রাইব করেছিলেন এবং ওষুধ সেবনের পর তাদের মধ্যে ইমপালস কন্ট্রোল ডিজঅর্ডার বা আচরণগত নিয়ন্ত্রণ হারানোর মতো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দেয়।
রেক্সালটি মূলত একটি অ্যাটিপিক্যাল অ্যান্টিসাইকোটিক ওষুধ, যা সিজোফ্রেনিয়া এবং গুরুতর বিষণ্ণতার চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়। তবে অভিযোগে বলা হয়, ওষুধটি সেবনের পর কিছু রোগীর মধ্যে অস্বাভাবিক ও নিয়ন্ত্রণহীন আচরণের প্রবণতা তৈরি হয়। মামলায় উল্লেখ করা হয়, অনেক রোগী হঠাৎ করে অতিরিক্ত জুয়া খেলা, অনিয়ন্ত্রিত কেনাকাটা, অতিরিক্ত খাওয়ার প্রবণতা, যৌন আচরণে অস্বাভাবিক পরিবর্তন কিংবা অন্যান্য আকস্মিক ও নিয়ন্ত্রণহীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সমস্যায় ভুগতে শুরু করেন। এসব আচরণকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ইমপালস কন্ট্রোল ডিজঅর্ডার বলা হয়। অভিযোগ ছিল, ওষুধটির সম্ভাব্য এই ঝুঁকি সম্পর্কে পর্যাপ্ত সতর্কতা দেওয়া হয়নি এবং ক্ষতিগ্রস্ত রোগীরা যথাযথভাবে সম্ভাব্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সম্পর্কে অবগত ছিলেন না।
এই জাতীয় ক্লাস অ্যাকশন মামলায় বিবাদী করা হয়েছিল ওটসুকা কানাডা ফার্মাসিউটিক্যাল ইনকর্পোরেশন এবং লান্ডবেক কানাডা ইনকর্পোরেশন কে। কুইবেক সুপিরিয়র কোর্ট জাতীয় ক্লাস অ্যাকশন হিসেবে মামলাটির অনুমোদন দেওয়ার প্রায় এক বছর পর গত নভেম্বরে উভয় পক্ষের মধ্যে হওয়া সমঝোতা চুক্তিতে আদালতের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন দেয়।
ক্ষতিগ্রস্ত রোগী ও তাদের পরিবারের প্রতিনিধিত্বকারী আইনজীবীরা জানিয়েছেন, এই সমঝোতা চুক্তির মাধ্যমে কোম্পানিগুলো কোনো ধরনের দায় বা ভুল স্বীকার করেনি। অর্থাৎ, মামলার দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া এড়িয়ে উভয় পক্ষ একটি আর্থিক সমঝোতায় পৌঁছেছে। এ ধরনের ক্লাস অ্যাকশন মামলায় দায় স্বীকার ছাড়াই সমঝোতা হওয়া অস্বাভাবিক নয়। এতে একদিকে ক্ষতিগ্রস্তরা তুলনামূলক দ্রুত ক্ষতিপূরণ পাওয়ার সুযোগ পান, অন্যদিকে কোম্পানিগুলোও দীর্ঘমেয়াদি বিচারিক প্রক্রিয়া এড়িয়ে যেতে পারে।
সমঝোতা অনুযায়ী, যেসব ব্যক্তি ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারি বা তার পরে কানাডায় রেক্সালটির প্রেসক্রিপশন পেয়েছেন, ওষুধ সেবনের পর ইমপালস কন্ট্রোল ডিজঅর্ডার বা অনুরূপ গুরুতর আচরণগত সমস্যা দেখা দিয়েছে, এবং আদালতের নির্ধারিত যোগ্যতার শর্ত পূরণ করেন, তারা ক্ষতিপূরণের জন্য আবেদন করতে পারবেন।
সমঝোতা চুক্তি অনুযায়ী ক্ষতির মাত্রার ওপর ভিত্তি করে ক্ষতিপূরণের পরিমাণ নির্ধারণ করা হবে। যাদের সমস্যা তুলনামূলক মৃদু, তারা সর্বনিম্ন ৬ হাজার ৫০০ ডলার পর্যন্ত ক্ষতিপূরণ পাওয়ার যোগ্য হতে পারেন। আর যাদের ক্ষেত্রে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার প্রভাব গুরুতর, তারা এক লাখ ২ হাজার ডলারেরও বেশি ক্ষতিপূরণ পেতে পারেন। চূড়ান্ত অর্থের পরিমাণ আবেদনকারীর ক্ষতির ধরন, প্রমাণপত্র এবং আদালত অনুমোদিত ক্ষতিপূরণ বণ্টন প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করবে।
যোগ্য ব্যক্তিদের জন্য আবেদন জমা দেওয়ার শেষ সময় ২৭ আগস্ট। আইনজীবীরা জানিয়েছেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আবেদন না করলে পরবর্তীতে এই সমঝোতা তহবিল থেকে ক্ষতিপূরণ দাবি করার সুযোগ নাও থাকতে পারে।
এই মামলাটি শুধু ক্ষতিপূরণের বিষয় নয়; বরং প্রেসক্রিপশন ওষুধের সম্ভাব্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সম্পর্কে রোগীদের যথাযথভাবে অবহিত করার প্রয়োজনীয়তাকেও নতুন করে সামনে এনেছে। ওষুধের কার্যকারিতার পাশাপাশি সম্ভাব্য ঝুঁকি সম্পর্কে স্বচ্ছ তথ্য প্রদান রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
একই সঙ্গে এই ক্লাস অ্যাকশন মামলার মাধ্যমে প্রমাণ হয়েছে যে, কোনো ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত রোগীরা সম্মিলিতভাবে আইনি প্রতিকার চাইতে পারেন এবং আদালতের মাধ্যমে ক্ষতিপূরণ পাওয়ার সুযোগও তৈরি হতে পারে।

