
টরন্টোয় কোরবানি ঈদ মানেই এক অদ্ভুত এক অভিজ্ঞতা। দেশে থাকতে ঈদের আগের সপ্তাহ থেকেই গরুর হাটে ঘুরে বেড়ানো ছিল ঈদের অর্ধেক আনন্দ। কোন গরুর শিং বাঁকা, কোনটার চোখে মায়া বেশি, কোনটার হাঁটা “ভিআইপি স্টাইলে”—এসব নিয়ে কত গবেষণা! গরুর দাম শুনে মাথা ঘুরলেও শেষে গরুর গলায় হাত রেখে একটা আবেগ কাজ করত—“এইটাই আমাদের কোরবানি।”
কিন্তু টরন্টোয় এসে বুঝলাম, এখানে কোরবানির পশু অনেকটা মনের পশুর মতো—আছে, কিন্তু দেখা যায় না!
গত ১৬ বছরে আমি নিয়মিত কোরবানি করছি, গোস্তও খাচ্ছি, ফ্রিজও ভর্তি করছি, আত্মীয়-স্বজনকে দাওয়াতও দিচ্ছি—কিন্তু একদিনও জানলাম না গরুটা সাদা ছিল, কালো ছিল, নাকি ডোরাকাটা ছিল! এমনকি গরুটা হাসিখুশি স্বভাবের ছিল নাকি একটু বদমেজাজি—সেটাও অজানা।
এখানে পুরো ব্যাপারটা এতটাই “সিস্টেমেটিক” যে মাঝে মাঝে মনে হয়, আমি কোরবানি না করে অনলাইনে মোবাইল বিল পরিশোধ করছি। ব্যাস! না কোনো হাম্বা, না কোনো হাট, না কোনো দরদাম, না গরুর সাথে সেলফি!
দেশে হলে গরু বাসার সামনে এনে অন্তত পাঁচবার প্রতিবেশীদের দেখানো হতো। ছোটরা নাম দিত—“কালা মানিক”, “রাজা বাবু”, “টেরাম্প”। আর এখানে? এখানে গরুর নাম তো দূরের কথা, তার চেহারাটাও কল্পনা করে নিতে হয়।
টরন্টোয় অবশ্য সবকিছু নির্ধারিত নিয়ম ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে অনুমোদিত খামার বা হালাল স্লটারহাউসে সম্পন্ন হয়। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন, ঝামেলামুক্ত, পেশাদার ব্যবস্থা। ধর্মীয় বিধানও ঠিকভাবে মানা হয়। কিন্তু তারপরও মাঝে মাঝে মনে হয়, কোরবানির সাথে আমাদের আবেগের যে পুরনো সম্পর্ক ছিল, সেটা কোথায় যেন একটু হারিয়ে গেছে।
এখন ঈদের সবচেয়ে বড় উত্তেজনা হলো—“গোস্ত কখন ডেলিভারি দিবে?”
কেউ ফোন দিয়ে বলে, “ভাই, আপনার গোস্ত রেডি।”শুনে মনে হয় যেন অনলাইনে বিরিয়ানি অর্ডার করেছি!
তবুও ঈদ তো ঈদই। প্রবাসে এই অদেখা কোরবানিও আমাদের আনন্দ দেয়, স্মৃতির দরজা খুলে দেয়। আর মনে করিয়ে দেয়—মনের পশুকে যেমন সবসময় দেখা যায় না, টরন্টোর কোরবানির পশুকেও তেমন দেখা যায় না; শুধু ফলাফলটাই বাসায় এসে পৌঁছে যায়!
ছবি: এবার ঈদের দিন, বন্ধুদের সাথে। আলমগীর কবির ও তপনের বাসায়। সবাইকে ঈদ মুবারক।

