
প্রযুক্তি, আর্থিক সেবা এবং ভোক্তাপণ্যের বিশ্ববাজারে কোন প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রভাব সবচেয়ে বেশি সেই প্রশ্নের উত্তর মিলেছে ২০২৬ সালের বৈশ্বিক ব্র্যান্ড মূল্যায়ন প্রতিবেদনে। ব্রিটিশ ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিস প্ল্যাটফর্ম ট্রেডিংপিডিয়ার প্রকাশিত গ্লোবাল পাওয়ার সার্ভে ২০২৬-এ আবারও বিশ্বের সবচেয়ে মূল্যবান ব্র্যান্ড হিসেবে নিজের অবস্থান ধরে রেখেছে অ্যাপল। একই সঙ্গে কানাডার সবচেয়ে মূল্যবান ব্র্যান্ড হিসেবে নির্বাচিত হয়েছে দেশটির অন্যতম বৃহৎ আর্থিক প্রতিষ্ঠান টিডি ব্যাংক। প্রতিবেদনটি ব্র্যান্ড ফাইন্যান্সের সংকলিত তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি করা হয়েছে। এতে বিভিন্ন দেশের শীর্ষ ব্র্যান্ডগুলোর বাজারে অবস্থান, ব্র্যান্ড মূল্য এবং বৈশ্বিক প্রভাব বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
রিপোর্ট অনুযায়ী, ৬০ হাজার ৭০০ কোটি মার্কিন ডলারের ব্র্যান্ড মূল্য নিয়ে বিশ্বের সবচেয়ে মূল্যবান ব্র্যান্ড হিসেবে আবারও প্রথম স্থান দখল করেছে অ্যাপল। প্রযুক্তিনির্ভর উদ্ভাবন, শক্তিশালী ইকোসিস্টেম, গ্রাহক আনুগত্য এবং বিশ্বব্যাপী বাজার বিস্তারের কারণে প্রতিষ্ঠানটি ধারাবাহিকভাবে এই অবস্থান ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। অ্যাপলের পরই রয়েছে প্রযুক্তি জায়ান্ট মাইক্রোসফট, যার ব্র্যান্ড মূল্য ৫৬ হাজার ৫২৫ কোটি ডলার। তালিকার তৃতীয় স্থানে রয়েছে গুগল, যার ব্র্যান্ড মূল্য ৪৩ হাজার ৩০৮ কোটি ডলার। চতুর্থ অবস্থানে রয়েছে বিশ্বের বৃহত্তম ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান অ্যামাজন, যার ব্র্যান্ড মূল্য দাঁড়িয়েছে ৩৬ হাজার ৯৮৮ কোটি ডলারে।
ট্রেডিংপিডিয়ার ডেটা সায়েন্টিস্ট মাইকেল ফিশার এক বিবৃতিতে বলেন, সর্বশেষ উপাত্ত স্পষ্টভাবে দেখাচ্ছে যে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে এখনও মার্কিন ব্র্যান্ডগুলোর প্রভাব সবচেয়ে বেশি। বিশ্বের শীর্ষ দশ মূল্যবান ব্র্যান্ডের মধ্যে সাতটিই যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠান। বিশ্লেষকদের মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ক্লাউড কম্পিউটিং, ডিজিটাল সেবা এবং বৈশ্বিক প্রযুক্তি বাজারে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বই এই আধিপত্যের অন্যতম কারণ।
কানাডার ক্ষেত্রে সবচেয়ে মূল্যবান ব্র্যান্ড হিসেবে নির্বাচিত হয়েছে টিডি ব্যাংক। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্যাংকটির ব্র্যান্ড মূল্য ২ হাজার ২২৫ কোটি মার্কিন ডলার, যা কানাডিয়ান মুদ্রায় প্রায় ৩ হাজার ১০০ কোটি ডলারের সমান। দীর্ঘদিনের গ্রাহক আস্থা, ডিজিটাল ব্যাংকিং সেবার সম্প্রসারণ এবং উত্তর আমেরিকার আর্থিক খাতে শক্তিশালী উপস্থিতির কারণে টিডি ব্যাংক এই অবস্থান ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্র্যান্ডগুলোর তালিকায়ও রয়েছে বেশ কয়েকটি পরিচিত নাম। চীনের সবচেয়ে মূল্যবান ব্র্যান্ড হিসেবে রয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম টিকটক, যার ব্র্যান্ড মূল্য ১৫ হাজার ৩৫৪ কোটি ডলার। মেক্সিকোর শীর্ষ ব্র্যান্ড হলো বিশ্বখ্যাত বিয়ার কোম্পানি করোনা। প্রতিষ্ঠানটির ব্র্যান্ড মূল্য ১ হাজার ৩৩৬ কোটি ডলার। ফ্রান্সের সবচেয়ে মূল্যবান ব্র্যান্ড হিসেবে স্থান পেয়েছে বিলাসবহুল ফ্যাশন হাউস শ্যানেল। ব্র্যান্ডটির মূল্য ৩ হাজার ৪৩৪ কোটি ডলার। অন্যদিকে, সুইডেনের শীর্ষ ব্র্যান্ড হিসেবে রয়েছে আন্তর্জাতিক হোম ফার্নিচার প্রতিষ্ঠান আইকিয়া, যার ব্র্যান্ড মূল্য ১ হাজার ৩৪২ কোটি ডলার।
যুক্তরাজ্যের সবচেয়ে মূল্যবান ব্র্যান্ড হিসেবে নির্বাচিত হয়েছে জ্বালানি খাতের বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান শেল। প্রতিবেদনে কোম্পানিটির ব্র্যান্ড মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৪ হাজার ৫০০ কোটি মার্কিন ডলার। বিশ্বজুড়ে জ্বালানি খাতে দীর্ঘদিনের শক্তিশালী অবস্থান এবং বহুমুখী ব্যবসায়িক কার্যক্রম শেলের ব্র্যান্ড মূল্য ধরে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
মূল্যবান ব্র্যান্ডের পাশাপাশি জনপ্রিয়তার ক্ষেত্রেও আলাদা মূল্যায়ন করা হয়েছে প্রতিবেদনে। কানাডায় সবচেয়ে জনপ্রিয় ব্র্যান্ড হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে ভ্যানকুভারভিত্তিক অ্যাথলেটিক পোশাক প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান লুলুলেমন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্র্যান্ডটির শক্তিশালী উপস্থিতি রয়েছে। ইনস্টাগ্রামে প্রতিষ্ঠানটির অনুসারীর সংখ্যা প্রায় ৫৮ লাখ, আর ফেসবুকে রয়েছে প্রায় ৩৬ লাখ অনুসারী। ডিজিটাল মার্কেটিং, স্বাস্থ্যসচেতন জীবনধারার সঙ্গে ব্র্যান্ডের সংযোগ এবং তরুণ প্রজন্মের মধ্যে জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির ফলে লুলুলেমন এই স্বীকৃতি অর্জন করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
২০২৬ সালের এই ব্র্যান্ড মূল্যায়ন একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিচ্ছে। প্রযুক্তি, আর্থিক সেবা এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মনির্ভর প্রতিষ্ঠানগুলো এখনও বিশ্ব অর্থনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ক্লাউড প্রযুক্তি, অনলাইন সেবা এবং ডিজিটাল ইকোসিস্টেমে বিনিয়োগ বাড়ার ফলে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর ব্র্যান্ড মূল্য দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে।
একই সঙ্গে প্রতিটি দেশের শীর্ষ ব্র্যান্ড সেই দেশের অর্থনৈতিক শক্তি, ভোক্তাদের আস্থা এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় অবস্থানকেও প্রতিফলিত করে। ফলে ব্র্যান্ড মূল্য কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সক্ষমতার সূচক নয়, বরং বিশ্ববাজারে তার গ্রহণযোগ্যতা, ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবেরও গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

