
আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ব্যস্ততার আড়ালে লুকিয়ে রয়েছে ভয়ংকর এক চক্র। যাত্রীদের অজান্তেই তাদের লাগেজের পরিচয় ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক মাদক পাচার চালানো হচ্ছে আর এর খেসারত দিতে হচ্ছে সম্পূর্ণ নির্দোষ মানুষদের। এক চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এমনই উদ্বেগজনক তথ্য।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত এক বছরে অন্তত ১৭ জন নির্দোষ কানাডিয়ান বিমানযাত্রী বিদেশে গ্রেপ্তার হয়েছেন শুধুমাত্র তাদের ব্যাগের ট্যাগ মাদকভর্তি স্যুটকেসের সঙ্গে বদলে যাওয়ার কারণে। এসব ঘটনায় শেষ পর্যন্ত তাদের নির্দোষ প্রমাণিত হলেও, ততক্ষণে ভয়াবহ মানসিক ও শারীরিক হয়রানির শিকার হতে হয়েছে তাদের। বিদেশের মাটিতে হাতকড়া পরিয়ে গ্রেপ্তার, জিজ্ঞাসাবাদ এবং কারাগারে আটক থাকার অভিজ্ঞতা জীবনে গভীর দাগ ফেলেছে এসব যাত্রীর মনে।
ডব্লিউ৫ আদালতের নথি, সংবাদ বিজ্ঞপ্তি এবং পুলিশ সূত্র থেকে তথ্য সংগ্রহ করে জানিয়েছে, এসব ঘটনা ঘটেছে কানাডা থেকে ডোমিনিকান রিপাবলিক, ফ্রান্স, জার্মানি, মরক্কো, বারমুডা, ফিলিপাইন ও দক্ষিণ কোরিয়াগামী ফ্লাইটে। উদ্বেগের বিষয় হলো এই দেশগুলোর কয়েকটিতে মাদক পাচারের শাস্তি অত্যন্ত কঠোর, কোথাও কোথাও মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত রয়েছে।
তদন্তে উঠে এসেছে, পুরো প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত দ্রুত এবং কৌশলীভাবে সম্পন্ন করা হয়। বিমানবন্দরের কোনো অসাধু কর্মী বা চক্র প্রথমে নির্দোষ যাত্রীর লাগেজের ট্যাগ খুলে নেয়। এরপর সেই ট্যাগটি মাদকভর্তি অন্য একটি স্যুটকেসে লাগিয়ে দেওয়া হয়। ফলে স্ক্যানিং বা নিরাপত্তা তল্লাশির সময় ব্যাগটির মালিক হিসেবে নির্দোষ যাত্রীর নামই উঠে আসে।
বিমানবন্দরের নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোতে হাজার হাজার নিরাপত্তা ক্যামেরা থাকলেও কিছু ‘ব্লাইন্ড স্পট’ রয়েছে, যেখানে কোনো ক্যামেরা নজরদারি করতে পারে না। টরন্টোর পিয়ারসন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রায় তিন হাজার নিরাপত্তা ক্যামেরা থাকলেও ব্যাগের ট্যাগ বদলের মতো ঘটনা কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ঘটে যায় এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা ধরা পড়ে না।
এই চক্রের ভয়াবহতা আরও স্পষ্ট হয়েছে গত বছরের এক ঘটনায়। রয়্যাল কানাডিয়ান মাউন্টেড পুলিশ (আরসিএমপি) টরন্টো পিয়ারসন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ছয়জন ব্যাগেজ ও র্যাম্প কর্মীকে গ্রেপ্তার করে। অভিযোগ ছিল, তারা লাগেজ ট্যাগ বদলের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মাদক পাচারে জড়িত।
তবে তদন্তকারীদের আশঙ্কা, প্রকাশ্যে আসা ঘটনাগুলো কেবলমাত্র সেইসব ক্ষেত্রে যেখানে মাদক শনাক্ত হয়েছে। বাস্তবে কতজন যাত্রীর পরিচয় তাদের অজান্তে ব্যবহার করা হচ্ছে, তার সঠিক সংখ্যা জানা সম্ভব নয়। অর্থাৎ, বহু যাত্রী হয়তো না জেনেই আন্তর্জাতিক মাদক চক্রের ফাঁদে ব্যবহৃত হচ্ছেন।
আন্তর্জাতিক ভ্রমণের সময় যাত্রীদের আরও সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। কারণ একটি ছোট অসতর্কতা ভয়াবহ আইনি জটিলতায় ফেলতে পারে। তাই যাত্রীদের জন্য কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শও দেওয়া হয়েছে।
ভ্রমণের আগে নিজের লাগেজের পরিষ্কার ছবি তুলে রাখা উচিত। বিমানবন্দরে ব্যাগ জমা দেওয়ার সময় ব্যাগের ট্যাগ লাগানোর পুরো প্রক্রিয়ার ভিডিও করা নিরাপদ হতে পারে। ব্যাগের ওজন নেওয়ার সময়ও ছবি বা ভিডিও রাখলে তা পরে প্রমাণ হিসেবে কাজে আসতে পারে। পাশাপাশি লাগেজের রসিদ যত্নে সংরক্ষণ করা এবং ব্যাগ ট্যাগের আলাদা ছবি তুলে রাখা জরুরি। প্রযুক্তির সহায়তায় লাগেজ ট্র্যাকার ব্যবহার করাও নিরাপত্তা বাড়াতে পারে।
বিশ্বজুড়ে বিমানবন্দর নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও এই ঘটনা নতুন করে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। কারণ এখানে শুধু মাদক পাচার নয়, বরং নির্দোষ যাত্রীদের পরিচয়কে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। আর সেই কারণেই আন্তর্জাতিক ভ্রমণে এখন শুধু পাসপোর্ট বা টিকিট নয়, নিজের লাগেজের নিরাপত্তাও হয়ে উঠেছে সমান গুরুত্বপূর্ণ।

