
দীর্ঘ আইনি লড়াই, কৌশলী বিলম্ব এবং আন্তর্জাতিক মাদক পাচার চক্রের নাটকীয় সব ঘটনার পর অবশেষে কারাগারে যেতে হচ্ছে কানাডার আলোচিত অভিযুক্ত আলি লালজিকে। আন্তর্জাতিক কোকেন পাচারের একটি বহুল আলোচিত মামলায় দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর বছরের পর বছর কারাগারের বাইরে থাকতে সক্ষম হলেও শেষ পর্যন্ত অন্টারিওর আপিল আদালতে হেরে গেছেন তিনি।
৩৭ বছর বয়সী আলি লালজির বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, তিনি এমন একটি আন্তর্জাতিক মাদক চক্র পরিচালনায় জড়িত ছিলেন যেখানে টরন্টোভিত্তিক মিডিয়া প্রতিষ্ঠান ভাইস মিডিয়ার সঙ্গে যুক্ত তরুণ ইন্টার্ন, মডেল ও সংগীতশিল্পীদের ব্যবহার করা হতো কোকেন পাচারের বাহক হিসেবে। তদন্তকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, এই তরুণদের অনেকেই বুঝতেই পারেননি তারা একটি আন্তর্জাতিক মাদক চক্রের অংশ হয়ে উঠছেন। তাদেরকে অস্ট্রেলিয়ায় ভ্রমণের সুযোগ, বিলাসবহুল জীবনযাপন এবং নানা প্রলোভন দেখিয়ে নিয়োগ করা হয়েছিল।
তদন্তে উঠে আসে, পাচারকারীরা লাগেজের ভেতরে অত্যন্ত চতুর উপায়ে কোকেন লুকিয়ে অস্ট্রেলিয়ায় পাঠাত। বিভিন্ন ব্যাগ ও স্যুটকেসের গোপন অংশে কোকেন ভরে এমনভাবে তৈরি করা হতো যাতে সাধারণ স্ক্যানিংয়েও তা সহজে ধরা না পড়ে। তবে শেষ পর্যন্ত পুরো চক্রটি ধরা পড়ে সিডনি বিমানবন্দরে। সেখানে প্রায় ২ কোটি ২০ লাখ ডলার মূল্যের কোকেন উদ্ধার করে অস্ট্রেলিয়ার কর্তৃপক্ষ। এই ঘটনায় গ্রেপ্তার হন পাঁচজন বাহক যাদের মধ্যে চারজন কানাডিয়ান এবং একজন আমেরিকান নাগরিক ছিলেন। গ্রেপ্তারের পর তাদের বেশ কয়েক বছর অস্ট্রেলিয়ার কারাগারে কাটাতে হয়। এই ঘটনায় আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছিল, কারণ অভিযুক্তদের অনেকে ছিলেন মিডিয়া ও বিনোদন জগতের সঙ্গে যুক্ত তরুণ মুখ।
মামলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল, চক্রের সঙ্গে যুক্ত অন্যদের অনেকেই দ্রুত বিচারের মুখোমুখি হলেও আলি লালজি দীর্ঘ সময় কারাগারের বাইরে থাকতে সক্ষম হন। তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, আইনি জটিলতা, একের পর এক আপিল এবং বিচার প্রক্রিয়ার বিলম্বকে কাজে লাগিয়ে তিনি সাত বছরেরও বেশি সময় মুক্ত অবস্থায় ছিলেন। এমনকি তার এক সহযোগীকে অন্টারিওর কারাগারে বছরের পর বছর কাটাতে হলেও লালজিকে তখনও কারাগারে যেতে হয়নি। ২০২৩ সালে অন্টারিওতে অনুষ্ঠিত এক বিচারে তাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। আদালত তার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক মাদক পাচারের ষড়যন্ত্রে অংশ নেওয়ার অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে বলে রায় দেয় এবং তাকে ৯ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। কিন্তু সেই রায়ের বিরুদ্ধেও আপিল করেন লালজি। শেষ পর্যন্ত অন্টারিওর আপিল আদালত তার আবেদন খারিজ করে দেয়। আদালতের সিদ্ধান্তের আভাস পাওয়ার পর বুধবার সকালে তিনি আত্মসমর্পণ করেন।
বুধবারের এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে লালজির সামনে খোলা থাকা শেষ বড় আইনি পথও কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। এখন খুব শিগগিরই তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে সাজা কার্যকরের জন্য কারাগারে পাঠানো হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এদিকে বিষয়টি নিয়ে সংবাদমাধ্যম ন্যাশনাল পোস্ট লালজির আইনজীবী রবীন পিল্লাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান। তিনি বলেন, মক্কেলের সঙ্গে আলোচনা না করে তিনি এ বিষয়ে প্রকাশ্যে কিছু বলতে চান না।
এই মামলাটি আবারও দেখিয়ে দিল কীভাবে আন্তর্জাতিক মাদক চক্রগুলো তরুণদের টার্গেট করে এবং সামাজিক যোগাযোগ, মিডিয়া ও বিনোদন জগতের সম্পর্ক ব্যবহার করে বৈশ্বিক পাচার নেটওয়ার্ক তৈরি করে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আধুনিক মাদক চক্র এখন আর শুধুমাত্র পেশাদার অপরাধীদের ওপর নির্ভর করে না। বরং তারা সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য এবং সন্দেহের বাইরে থাকা তরুণদের ব্যবহার করছে, যাতে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও সীমান্ত নিরাপত্তা সহজে ফাঁকি দেওয়া যায়। আলি লালজির পতনের মধ্য দিয়ে বহু বছর ধরে আলোচিত এই মামলার একটি বড় অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটলেও আন্তর্জাতিক মাদক পাচারের জটিল নেটওয়ার্ক নিয়ে উদ্বেগ এখনো রয়ে গেছে।

