বিচারকের সিদ্ধান্তের সমালোচনায় ডাগ ফোর্ড

বিচারকের সিদ্ধান্তের সমালোচনায় ডাগ ফোর্ড - the Bengali Times
আদালতের এই অবস্থানে সবচেয়ে বেশি অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন অন্টারিওর প্রিমিয়ার ডাগ ফোর্ড

কানাডার অন্টারিও প্রদেশের কিচেনার শহরে গৃহহীনদের জন্য গড়ে ওঠা একটি তাঁবু নগরী ঘিরে আদালতের সাম্প্রতিক রায় নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। অন্টারিও কোর্ট অব জাস্টিসের বিচারক মাইকেল আর. গিবসনের দেওয়া এক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে ওয়াটারলু রিজিয়ন আপাতত ওই এলাকার গৃহহীন বাসিন্দাদের উচ্ছেদ করতে পারবে না। আদালতের এই অবস্থানে সবচেয়ে বেশি অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন অন্টারিওর প্রিমিয়ার ডাগ ফোর্ড।

শুক্রবার সল্ট সেন্ট মেরিতে এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকরা যখন এই রায় নিয়ে প্রশ্ন করেন, তখন ডাগ ফোর্ড স্পষ্ট ভাষায় ক্ষোভ উগরে দেন। তিনি আদালতের সিদ্ধান্তকে “তামাশা”, “উদ্ভট” এবং “তার দেখা সবচেয়ে হাস্যকর রুলিংগুলোর একটি” বলে মন্তব্য করেন। এমনকি তিনি ব্যঙ্গ করে বলেন, বিচারকের উচিত হলে এনক্যাম্পমেন্টের বাসিন্দাদের নিজের বাড়িতেই আশ্রয় দেওয়া।

- Advertisement -

বিচারক মাইকেল আর. গিবসনের ৮৮ পৃষ্ঠার দীর্ঘ রায়ে বলা হয়েছে, কিচেনারের ওই এনক্যাম্পমেন্ট বর্তমানে এমন একমাত্র জায়গা যেখানে গৃহহীন মানুষ বৈধভাবে তাঁবু খাটিয়ে থাকতে পারেন কিংবা শেষ আশ্রয় হিসেবে অস্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণ করতে পারেন। আদালত পর্যবেক্ষণ করেছে, ওয়াটারলু অঞ্চলে আশ্রয়কেন্দ্রের সংকট এবং ক্রমবর্ধমান গৃহহীনতার বাস্তবতায় এই তাঁবু নগরী বহু মানুষের জন্য “শেষ নিরাপদ আশ্রয়স্থল” হয়ে উঠেছে। ফলে বিকল্প ব্যবস্থা নিশ্চিত না করে উচ্ছেদ কার্যক্রম চালানো মানবিক ও সাংবিধানিক প্রশ্ন তৈরি করতে পারে। বিচারক আরও বলেন, ট্রানজিট হাব নির্মাণ নিঃসন্দেহে জনস্বার্থে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প। তবে প্রকল্প বাস্তবায়নের সঙ্গে সঙ্গে গৃহহীনদের অধিকার ও মর্যাদার বিষয়টিও সমান গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। তার মতে, ওয়াটারলু রিজিয়ন চাইলে বাসিন্দাদের সম্মান রক্ষা করেই প্রকল্প এগিয়ে নিতে পারে।

বিতর্কিত এনক্যাম্পমেন্টটি অবস্থিত কিচেনারের ডাউনটাউন এলাকায়, ভিক্টোরিয়া ও ওয়েবার স্ট্রিটের সংযোগস্থলে। জায়গিটির মালিক ওয়াটারলু রিজিয়ন। রিজিয়নের দাবি, এই জমি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কারণ এখানেই নির্মিত হওয়ার কথা বহু প্রতীক্ষিত “কিচেনার সেন্ট্রাল ট্রানজিট হাব”। প্রকল্পটি সম্পন্ন হলে গোটা অঞ্চলের গণপরিবহন ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রকল্পটির কাজ শেষ হওয়ার সম্ভাব্য সময় ২০২৯ সালের শেষভাগ অথবা ২০৩০ সালের শুরু। ইতোমধ্যেই সরকারি পরিবহন সংস্থা মেট্রোলিংক্সের নির্মাণকর্মীদের আগামী মাসে সেখানে রেললাইন নির্মাণের কাজ শুরু করার কথা রয়েছে। কিন্তু আদালতের রায়ের ফলে এখন পুরো প্রকল্পের সময়সূচি নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। কারণ এনক্যাম্পমেন্ট সরানো না গেলে জমি পুরোপুরি নির্মাণকাজের জন্য প্রস্তুত করা সম্ভব হবে না।

অন্টারিওসহ কানাডার বিভিন্ন শহরে গত কয়েক বছরে গৃহহীনতার সংকট দ্রুত বেড়েছে। বাড়িভাড়া বৃদ্ধি, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক সহায়তার ঘাটতি সব মিলিয়ে বহু মানুষ রাস্তায় বসবাস করতে বাধ্য হচ্ছেন। ফলে শহরের বিভিন্ন খালি জায়গা, পার্ক কিংবা সরকারি জমিতে গড়ে উঠছে অস্থায়ী তাঁবু নগরী। এসব এনক্যাম্পমেন্ট নিয়ে স্থানীয় প্রশাসন, আদালত এবং মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই টানাপোড়েন চলছে। এই রায়কে অনেকে গৃহহীন মানুষের মৌলিক অধিকার রক্ষার দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখছেন। আদালত কার্যত জানিয়ে দিয়েছে, শুধু উন্নয়ন প্রকল্পের স্বার্থে দুর্বল জনগোষ্ঠীকে সরিয়ে দেওয়া যাবে না, যদি না তাদের জন্য বাস্তবসম্মত বিকল্প আশ্রয়ের ব্যবস্থা থাকে। অন্যদিকে সমালোচকদের মতে, এ ধরনের রায় ভবিষ্যতের বড় অবকাঠামো প্রকল্পগুলোর জন্য জটিলতা তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে যখন সরকারি জমিতে দীর্ঘমেয়াদি এনক্যাম্পমেন্ট গড়ে ওঠে।

ডাগ ফোর্ডের বক্তব্য থেকে স্পষ্ট, তার সরকার এই রায়ে সন্তুষ্ট নয়। ফোর্ড দীর্ঘদিন ধরেই অন্টারিওতে অবৈধ এনক্যাম্পমেন্টের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের পক্ষে কথা বলে আসছেন। তার মতে, এসব তাঁবু নগরী জননিরাপত্তা, স্বাস্থ্য ও নগর ব্যবস্থাপনায় বড় সমস্যা তৈরি করছে। তবে মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, গৃহহীন মানুষদের অপরাধী হিসেবে দেখার বদলে সরকারকে সাশ্রয়ী আবাসন, আশ্রয়কেন্দ্র এবং সামাজিক সহায়তা বাড়াতে হবে। ফলে কিচেনারের এই মামলাটি এখন শুধু একটি স্থানীয় উচ্ছেদ বিতর্ক নয়; বরং কানাডাজুড়ে গৃহহীনতা, মানবাধিকার এবং উন্নয়ন রাজনীতির বৃহত্তর সংঘাতের প্রতীক হয়ে উঠেছে।

- Advertisement -

Related Articles

Latest Articles