
কানাডার টেলিযোগাযোগ খাতে দীর্ঘদিনের এক বিতর্কিত প্রথার অবসান ঘটাতে বড় ধরনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে দেশটির নিয়ন্ত্রক সংস্থা কানাডিয়ান রেডিও-টেলিভিশন অ্যান্ড টেলিকমিউনিকেশনস কমিশন (সিআরটিসি)। নতুন নীতিমালায় বলা হয়েছে, এখন থেকে গ্রাহকরা তাদের ইন্টারনেট বা মোবাইল প্ল্যান বাতিল, পরিবর্তন কিংবা নতুন করে চালু করতে গেলে টেলিকম কোম্পানিগুলো আর কোনো অতিরিক্ত ফি বা “অ্যাক্টিভেশন চার্জ” নিতে পারবে না।
বৃহস্পতিবার ঘোষিত এই সিদ্ধান্তকে কানাডার টেলিযোগাযোগ খাতে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। সিআরটিসি জানিয়েছে, এর মূল উদ্দেশ্য হলো গ্রাহকদের জন্য পরিষেবা পরিবর্তনের প্রক্রিয়াকে সহজ, স্বচ্ছ এবং ঝামেলামুক্ত করা। এতদিন প্ল্যান পরিবর্তন বা নতুন সংযোগ নেওয়ার সময় গ্রাহকদের প্রায় ৩০ থেকে ৪০ কানাডিয়ান ডলার পর্যন্ত অতিরিক্ত খরচ বহন করতে হতো। এই অতিরিক্ত ব্যয় অনেক ক্ষেত্রেই গ্রাহকদের ভালো অফার থাকা সত্ত্বেও নতুন কোম্পানিতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত থেকে বিরত রাখত। ফলে বাজারে প্রতিযোগিতা বাধাগ্রস্ত হচ্ছিল এবং বড় কোম্পানিগুলো গ্রাহক ধরে রাখার একটি অপ্রকাশ্য সুবিধা পেত।
ঘোষণা অনুযায়ী, আগামী ১২ জুন থেকে এই নতুন নিয়ম কার্যকর হবে। এটি দেশের সব মোবাইল অপারেটরের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে, বিশেষ করে ব্যক্তি পর্যায়ের গ্রাহক এবং ছোট ব্যবসায়ীদের জন্য। পাশাপাশি বড় টেলিকম সেবাদাতাদের হোম ইন্টারনেট ব্যবহারকারীরাও এই সুবিধার আওতায় আসবেন। এর ফলে গ্রাহকরা এখন আরও সহজে বিভিন্ন কোম্পানির অফার তুলনা করে নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী সেরা প্ল্যানটি বেছে নিতে পারবেন কোনো অতিরিক্ত খরচের চাপ ছাড়াই।
সিআরটিসির মতে, এতদিনের “অ্যাক্টিভেশন ফি” বাজারে একটি অদৃশ্য প্রতিবন্ধকতা হিসেবে কাজ করছিল। নতুন নিয়মের ফলে এই বাধা দূর হবে এবং টেলিকম কোম্পানিগুলোকে আরও প্রতিযোগিতামূলক মূল্য ও উন্নত পরিষেবা দিতে বাধ্য করবে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এর ফলে : গ্রাহকদের মধ্যে সচেতনতা বাড়বে, ছোট ও নতুন টেলিকম কোম্পানিগুলো বাজারে প্রতিযোগিতা করার সুযোগ পাবে এবং বড় কোম্পানিগুলোকে আরও স্বচ্ছ ও গ্রাহকবান্ধব হতে হবে।
সিআরটিসি জানিয়েছে, এটি কেবল শুরু। আগামী কয়েক মাসের মধ্যে আরও কিছু ভোক্তা সুরক্ষামূলক পদক্ষেপ ঘোষণা করা হতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে : পরিষেবা পরিবর্তনের আগে স্পষ্ট নোটিফিকেশন, ফি ও চার্জের স্বচ্ছতা বৃদ্ধি এবং সহজে প্ল্যান তুলনা করার সুযোগ। উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের শেষ দিকে এ বিষয়ে জনমত সংগ্রহ করে সিআরটিসি এবং বিভিন্ন প্রস্তাবনা নিয়ে আলোচনা করে। সেই প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতায় বর্তমান সিদ্ধান্তটি বাস্তবায়িত হচ্ছে।
ফেডারেল সরকার টেলিযোগাযোগ আইনে সংশোধন আনার পর সিআরটিসির এই পদক্ষেপ সামনে আসে। নতুন আইনে ভোক্তা সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দিয়ে বিভিন্ন বিধান যুক্ত করা হয়েছে, যা নিয়ন্ত্রক সংস্থাটিকে আরও কার্যকর ভূমিকা পালনের সুযোগ দিয়েছে। সিআরটিসি জানায়, “আমরা এমন পদক্ষেপ নিচ্ছি যাতে কানাডিয়ানরা তাদের ইন্টারনেট ও মোবাইল পরিষেবার ওপর আরও বেশি নিয়ন্ত্রণ পায়। গ্রাহকদের জন্য পরিষেবা বেছে নেওয়া সহজ হওয়া উচিত এবং তা যেন অপ্রত্যাশিত খরচের কারণে বাধাগ্রস্ত না হয়।”
এই সিদ্ধান্তকে কানাডার টেলিযোগাযোগ খাতে ভোক্তা অধিকার রক্ষার একটি বড় পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে সমালোচিত অতিরিক্ত ও গোপন ফি বাতিলের মাধ্যমে দেশটি একটি আরও উন্মুক্ত, স্বচ্ছ এবং প্রতিযোগিতামূলক বাজার গড়ে তোলার পথে এগিয়ে গেল। এই উদ্যোগ সফল হলে এটি অন্যান্য দেশগুলোর জন্যও একটি উদাহরণ হয়ে উঠতে পারে, যেখানে গ্রাহক স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে টেলিযোগাযোগ খাতকে আরও ন্যায্য ও প্রতিযোগিতামূলক করা সম্ভব।
সোহেলি আহমেদ সুইটি : লোকাল জার্নালিজম ইনিশিয়েটিভ রিপোর্টার

